Image description

২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপাতে বিএইচএল পেপার মিলস লিমিটেড কোম্পানির কাগজ ক্রয় করে নিজের ছাপাখানায় নিয়ে আসেন মহানগর প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী গিয়াস উদ্দিন। কাগজগুলো ছিল এনসিটিবির স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী সঠিক মানের। কিন্তু ছাপাখানায় কাগজগুলো প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে খবর চলে যায় পাঠ্যবই ছাপানো ঘিরে গড়ে ওঠা ‘শক্তিশালী সিন্ডিকেটের’ মূল হোতার কাছে। তিনি আধাঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একটি টিমকে ঐ ছাপাখানায় পাঠিয়ে দেন। 

অভিযোগ উঠেছে—এনসিটিবির টিম কোনো ধরনের যাচাই না করেই ‘এই কাগজ পাঠ্যবই ছাপানোর অযোগ্য’ বলে জানিয়ে দেয়। ট্রাকে করে কাগজগুলো আবার ফেরত পাঠাতে বাধ্য হন গিয়াস উদ্দিন। পরে তিনি সিন্ডিকেটের মূল হোতার প্রতিষ্ঠান (কাগজ বিক্রয়ের এজেন্ট) থেকে আগের কাগজের চেয়ে নিম্নমানের কাগজ কিনে নিমেষেই অনুমোদন পেয়ে যান। আর এজন্য তাকে টনপ্রতি ২২ হাজার টাকা বেশি দিতে হয়েছে। এভাবে এনসিটিবির এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও ঐ সিন্ডিকেট মিলেমিশে পাবলিকেশনগুলোকে জিম্মি করে এবার ২৫ হাজার টন কাগজ বিভিন্ন ছাপাখানাকে কিনতে বাধ্য করেছে। সেই হিসাবে তাদের পকেটে ঢুকেছে বাড়তি প্রায় ৫৫ কোটি টাকা!

এনসিটিবির পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে উল্লিখিত ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে ইত্তেফাককে বলেন, গিয়াস উদ্দিন প্রথমে যে কাগজ কিনেছিলেন, তা পরীক্ষা করে সঠিক মান পাওয়া যায়। কিন্তু অজানা কারণে এনসিটিবি তা অনুমোদন দেয়নি। জানা গেছে, সিন্ডিকেটটি যে কাগজ সরবরাহ করছে, তার বাজারমূল্য ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। কিন্তু অনেক ছাপাখানাকে তা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকায় কিনতে হয়েছে। এদিকে পাঠ্যবই ছাপাতে প্রায় ৮০ হাজার টন কাগজ প্রতি বছর প্রয়োজন হয়। সিন্ডিকেটটি এবারও ৮০ হাজার টন কাগজই অনুমোদনে জিম্মি করতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছু ছাপাখানা মালিকের আবার সরকারের ওপরের মহলে যোগাযোগ ছিল, এ কারণে তাদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি।

শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপে ৯০০ টন কাগজ অনুমোদন করিয়ে নেয় একটি ছাপাখানা। জানা গেছে—ঐ ছাপাখানা মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ‘ফ্রেশ পেপার’-এর কাগজ অনুমোদনের আবেদন করেছিল। কাগজের মান ভালো হওয়ার পরও তা আটকে দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি ঐ ছাপাখানার মালিক শিক্ষামন্ত্রীকে অবহিত করেন। শিক্ষামন্ত্রী এনসিটিবি কর্মকর্তাদের ডেকে নির্দেশনা দেন যে, যদি কাগজের মান ঠিক থাকে, তাহলে যেন নির্বিঘ্নে অনুমোদন দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সিন্ডিকেট এই ৯০০ টন কাগজ থেকে ‘অনুমোদন বাণিজ্য’ করতে পারেনি। আবার কয়েকটি ছাপাখানা চীন থেকে উচ্চমানের কাগজ এনে পাঠ্যবই ছাপাচ্ছে।

এদিকে ছাপা হওয়া ২ লাখ পাঠ্যবইকে কাগজ-কলমে ‘আড়াই লাখ’ দেখিয়ে অনুমোদন দিতে রাজি না হওয়ায় এনসিটিবির এক ইন্সপেকশন এজেন্টের মালিকের চোখ উপড়ে ফেলার হুমকি দিয়েছে একটি ছাপাখানার লোকজন। 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঐ ইন্সপেকশন এজেন্টের মালিক ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির কাছে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ঐ ছাপাখানার লোক আমার বাসায় গিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে।’ বিষয়টি তিনি এনসিটিবির একজন সদস্যকে অবহিত করেছেন। সার্বিক বিষয়ে জানতে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলাকে একাধিক বার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

ডিসেম্বরে বই পাবে দেশের ৪ কোটি শিক্ষার্থী :নতুন বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তবে এবার তার আগেই শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দিতে চায় সরকার। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন শিক্ষার্থীদের হাতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের নতুন বই দেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আগামী ২৪ ডিসেম্বর নতুন পাঠ্যবই হাতে পাবে। মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদেরও ডিসম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে নতুন বই দেওয়া হবে। দেশের প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি।

সরেজমিনে মাতুয়াইলে ১০টি ছাপাখানায় গিয়ে দেখা যায়, বিরামহীনভাবে চলছে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ। মেশিনের খটখট শব্দ, কাগজ-কালির মিশ্র গন্ধে মুখর পুরো এলাকা। কোথাও বই ছাপার ব্যস্ততা, কোথাও কাটিং, বাঁধাই আর প্যাকেজিংয়ের ধুম। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) প্রতিবেদন অনুযায়ী—প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে ৯৭ দশমিক ৯৫ শতাংশ বই ছাপা শেষ হয়েছে। অন্যদিকে ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরে বই ছাপার অগ্রগতি ৭২ দশমিক ১৩ শতাংশ।

গতি বাড়াতে নজরদারি জোরদার :আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব বই উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এনসিটিবি। কাজের গতি বাড়াতে নজরদারি জোরদার করেছে সংস্থাটি। এনসিটিবির প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের কাজ পাওয়া ইনফিনিটি সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন (বিডি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. সিরাজীম মুনিরের দেওয়া গত বুধবারের তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-প্রাথমিকের শতভাগ বই ছাপা শেষ হয়েছে।

প্রথম শ্রেণির ৯৮ দশমিক ২২ শতাংশ, দ্বিতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, তৃতীয় শ্রেণির ৯৮ দশমিক ১৫ শতাংশ, চতুর্থ শ্রেণির ৯৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও পঞ্চম শ্রেণির ৯৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শেষ হয়েছে। এনসিটিবির মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবই ইন্সপেকশনের দায়িত্বে থাকা ইনডিপেনডেন্ট ইন্সপেকশন সার্ভিসেস বিডির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ বেলাল হোসাইন গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ইবতেদায়ির প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ৯৬ দশমিক ০৭ শতাংশ পাঠ্যবই ছাপার কাজ শেষ হয়েছে। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ শ্রেণির ৯২ দশমিক ১৮ শতাংশ, সপ্তম শ্রেণির ৯২ দশমিক ৩৭ শতাংশ, অষ্টম শ্রেণির ৬৬ দশমিক ৬২ শতাংশ, নবম-দশম শ্রেণির ২৯ দশমিক ৬৮ শতাংশ পাঠ্যবই ছাপানো শেষ হয়েছে। 

যে গতিতে পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ চলছে, তাতে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সব পাঠ্যবই ছাপানো শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ বেলাল হোসাইন বলেন, এবার পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এবার ভালো মানের পাঠ্যবই পাবে শিক্ষার্থীরা। প্রসঙ্গত, এবার কার্যাদেশ ও চুক্তি শেষ করে মাধ্যমিকের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ শুরু হয়েছিল প্রাথমিকের পাঠ্যবই ছাপানো শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর। এ কারণে প্রাথমিকের চেয়ে মাধ্যমিকে ছাপার অগ্রগতি কম।

৩২টি প্রেসকে তাগিদ : পাঠ্যবই ছাপার কাজের গতি ঠিক রাখতে ৩২টি প্রেসকে চিঠির মাধ্যমে তাগিদ দিয়েছে এনসিটিবি। বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এনসিটিবি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে ৫৩টি মনিটরিং টিম কাজ করছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, রোড ম্যাপ অনুযায়ী বই সরবরাহের কাজ চলছে।