Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় ৯ মাস হতে চললেও প্রশাসনে অস্থিরতা কাটেনি। বরং সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন পর্যন্ত বদলি, পদায়ন, পদোন্নতি, বাধ্যতামূলক অবসর এবং গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ঘিরে অসন্তোষের অভিযোগ রয়েছে। সরকারের প্রথম আট মাসেই দুই হাজারের বেশি বদলি ও পদায়ন হয়েছে। পদোন্নতি পেয়েছেন এক হাজার ৫৫ জন কর্মকর্তা। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে ৩২ জনকে। প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত ব্যাপক পরিবর্তনের পরও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরছে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এরইমধ্যে সরকারি কাজে অবহেলা ও অসহযোগিতাকারীদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকার পরিবর্তনের পর প্রশাসনে রদবদল স্বাভাবিক। কিন্তু ঘন ঘন কর্মকর্তা পরিবর্তন, রাজনৈতিক পরিচয়ভিত্তিক মেরুকরণ এবং পদায়নে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের বারবার পরিবর্তন করা হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নীতিনির্ধারণ ও সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিকীকরণের সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারায় সরকার পরিবর্তনের পরও প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ফিরছে না। কেউ বলছেন, বিগত শাসনামলে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক কাঠামোয় যথেষ্ট পরিবর্তন না আসায় বর্তমান সরকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধার মুখে পড়ছে। ফলে শুধু বদলি ও পদায়নের সংখ্যা নয়, সেই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য, প্রক্রিয়া এবং কার্যকারিতাও এখন আলোচনার বিষয়।

প্রশাসনের ভেতরে বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগপন্থী হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের পৃথক বলয় থাকার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে। সরকার পরিবর্তনের পর বিএনপিঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে যাওয়ার তৎপরতা, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠা কর্মকর্তাদের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা এবং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সুবিধাজনক পদে থাকা কর্মকর্তাদের সতর্ক অবস্থান, এসব বিষয়ও আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে প্রশাসনের কেউই মুখ খুলতে রাজি হননি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম আট মাসে প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে সচিব থেকে সহকারী সচিব পর্যায়ে ৭৩৬টি বদলি ও পদায়ন হয়েছে। মাঠ প্রশাসনে এই সংখ্যা ৫৮৯টি। এ ছাড়া প্রেষণে আরও ৭০৩টি বদলি ও পদায়ন হয়েছে। এতে বদলি ও পদায়নের সংখ্যা দুই হাজার ছাড়িয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে একই কর্মকর্তা একাধিকবার বদলি হয়েছেন বলেও এই সংখ্যা বেড়ে যায়।

বদলি ও পদায়নের খতিয়ান

মন্ত্রণালয় ও বিভাগ পর্যায়ে বদলি পদায়নের তালিকায় রয়েছেন ৪৩ জন সিনিয়র সচিব ও সচিব, ১০০ জন অতিরিক্ত সচিব, ১০৩ জন যুগ্মসচিব, ১৮২ জন উপসচিব, ২৭৪ জন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং ৩৪ জন সহকারী সচিব। মাঠ প্রশাসনে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে ছয়জন বিভাগীয় কমিশনার, চারজন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, ৩৬ জন জেলা প্রশাসক, ১০৯ জন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, ৩০৮ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ৮২ জন সিনিয়র সহকারী কমিশনার এবং ৪৪ জন সহকারী কমিশনারকে। অন্যদিকে প্রেষণে বদলি ও পদায়ন করা হয়েছে ৫৭ জন অতিরিক্ত সচিব, ১১৫ জন যুগ্মসচিব, ২০৫ জন উপসচিব, ১৮২ জন সিনিয়র সহকারী সচিব এবং অন্যান্য পর্যায়ের ১৪৪ জন কর্মকর্তাকে।

বিভিন্ন পর্যায়ে পদোন্নতি

একই সময়ে প্রশাসনের এক হাজার ৫৫ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭৪৬ জনকে নিয়মিত পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় এবং ৩০৯ জনকে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের মাধ্যমে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ৫৮টি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অবসর

গত ১৪ অক্টোবরের তথ্য অনুযায়ী আট মাসে ৩২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর বাইরে বিভিন্ন পর্যায়ের আরও ১২০ কর্মকর্তার অবসরে যাওয়ার তথ্য রয়েছে। এরপরও প্রশাসনে নতুন করে বদলি ও পদায়নের আদেশ জারি হয়েছে। ফলে বর্তমান সময়ে মোট রদবদলের সংখ্যা আরও বেড়েছে। সর্বশেষৎ গত ১৮ অক্টোবর পৃথক ১০টি প্রজ্ঞাপনে সচিব ও সচিব পদমর্যাদার ১০ কর্মকর্তার দায়িত্বে পরিবর্তন আনা হয়।

এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরীকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াকে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনে পদায়ন করা হয়। একই সঙ্গে যুব ও ক্রীড়া, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব পর্যায়েও পরিবর্তন আনা হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সচিব পদে ঘন ঘন পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। কারণ একজন সচিব দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার পরিবর্তন করা হলে নতুন কর্মকর্তাকেও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তবে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বদলি কিংবা উপযুক্ত কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার জন্য রদবদল অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এসব পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও কাজের মূল্যায়নকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

রাজনৈতিকীকরণের পুরোনো সংকট

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. সাদিক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বাংলাদেশে প্রশাসনকে রাজনৈতিকীকরণের একটি দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় ফিরে আসার পর থেকে প্রায় প্রতিটি সরকারই প্রশাসনে নিজেদের অনুগত কর্মকর্তা খুঁজেছে। কে নিজের লোক, আর কে নয়, এই বিবেচনায় পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বর্তমান সরকারও সেই ধারা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ফলে প্রশাসনে বারবার রদবদল হলেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা ফিরে আসছে না।’’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তও প্রশাসনিক অস্থিরতার কারণ হিসেবে দেখছেন এই জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অবসরে যাওয়া অনেক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক কার্যক্রমের বাইরে থাকা এসব কর্মকর্তার অনেকে বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরিবর্তন, কাজের ধরন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে যথাযথভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারেননি। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রমে একধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারও যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিবর্তে কে নিজেদের ঘনিষ্ঠ, সেই বিবেচনা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারছে না। এটিও প্রশাসনে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ।’’

সমাধানের পথ সম্পর্কে অধ্যাপক সাদিক হাসান বলেন, ‘‘প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার কোনও বিকল্প নেই। সরকারকে বুঝতে হবে, আমলাতন্ত্র কোনও রাজনৈতিক দলের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান নয়। বরং সরকারের নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের একটি পেশাদার রাষ্ট্রীয় কাঠামো। কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মসম্পাদনকে প্রাধান্য দিতে হবে।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘‘প্রশাসনের পাশাপাশি শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও কৃষিবিদসহ বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীকেও রাজনৈতিকীকরণের বাইরে রাখতে হবে। তা না হলে প্রশাসনে স্থিতিশীলতা ও কার্যকর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।’’

শৃঙ্খলার সংকট ও দলীয় বিভাজন

আট মাসে দুই হাজারের বেশি বদলি ও পদায়নের পরও প্রশাসনে অস্থিরতা ও অসন্তোষের কারণ জানতে চাইলে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বদিউল আলম মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমাদের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে গেছে। আমরা বিশৃঙ্খল জাতি। সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা। সেই বিশৃঙ্খলার প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছি সবখানে।’’

প্রশাসনে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘‘যারা অপরাধ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কেউ হয়তো কোনও দলকে সমর্থন করছেন, শুধু সে কারণে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তো কোনও যৌক্তিক কারণ নেই। তা না হলে লোম বাচতে গিয়ে কম্বল উজাড় হয়ে যাবে। আমরা দলের ভিত্তিতে বিভাজন তৈরি করে ফেলেছি। সেটারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।’’

‘দুই হাজার কর্মকর্তার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়’

তবে প্রশাসনের চলমান সংকটের কারণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তার মতে, গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যে মাত্রায় রাজনৈতিকীকরণ হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দুই হাজার কর্মকর্তার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া সীমিত পরিসরে পরিবর্তন আনার কারণেও সংকট তৈরি হতে পারে।

বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘‘একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ আমলা ও কর্মকর্তা প্রয়োজন, সেই তুলনায় দুই হাজার কর্মকর্তা খুব বড় সংখ্যা নয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ে হাজার হাজার আমলা ও সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা রয়েছেন। গত ১৫ বছরে আমলাতন্ত্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক নিয়োগ থেকে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব পর্যন্ত সর্বক্ষেত্রে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে। সেই ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার জন্য দুই হাজার কর্মকর্তার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। বরং এই সীমিত পরিবর্তন আরও সংকট তৈরি করছে।’’

তার মতে, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে কিছু পরিবর্তন হলেও পুরো কাঠামোয় বিগত সরকারের সময়ের সুবিধাভোগী কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থেকে গেলে নতুন সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে অসহযোগিতার আশঙ্কা থাকতে পারে।

অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘আমি রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বের পর্যায়ের কথা বলছি। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেক কর্মকর্তা আগের শাসনামলে নিয়োগ পেয়েছেন এবং অনেকে সেই শাসনামলের সুবিধাভোগী ছিলেন। এখন তাঁদের কেউ কেউ অনৈতিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এতে তাঁরা নতুন সরকারকে উৎসাহের সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাইবেন না। বরং আগের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার সুবিধা ফিরিয়ে আনা এবং বর্তমান সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করতে পারেন।’’

সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরে অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘‘দেখা যাচ্ছে, সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, কিন্তু সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। এমনকি নিয়মিত দাফতরিক কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রেও সরকারকে নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এসব কাজের জন্য সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। তাদের অনেকেই আগের শাসনামলে নিয়োগ পেয়েছেন, সেই শাসনামলের সুবিধাভোগী ছিলেন কিংবা অনেকে বেআইনিভাবে নিয়োগ পেয়েছেন। ফলে তারা বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করবেন কি না, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।’’

প্রশাসনে আরও বিস্তৃত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘‘শুধু দুই হাজার কর্মকর্তার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। পুলিশ বাহিনী ও আমলাতন্ত্রে ন্যায়সংগত এবং যথাযথ প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সংস্কার দরকার। পুরো প্রশাসনিক কাঠামোয় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে নতুন সরকার তার নির্বাচনি ইশতেহার, পরিকল্পনা ও লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে পারে। অন্তত মধ্যম পর্যায় পর্যন্ত এমন জনবল ও নেতৃত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যারা সরকারের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।’’ একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রাথমিক নিয়োগ স্বচ্ছ ও ন্যায্য হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন এই রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

সংসদীয় কমিটিতেও কাজের ধীরগতি নিয়ে উদ্বেগ

প্রশাসনের কার্যকারিতা নিয়ে জাতীয় সংসদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। গত ১৪ অক্টোবর কমিটির প্রথম বৈঠকে সরকারি কাজে অসহযোগিতা ও অবহেলাকারীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অধীন যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়নে ধীরগতি রয়েছে, সেগুলোর কারণ অনুসন্ধানেরও সুপারিশ করে কমিটি। বৈঠকে কমিটির সভাপতি সাঈদ আহমেদ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোনও আইনগত, প্রশাসনিক বা বাস্তব প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা স্পষ্টভাবে উপস্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেন। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সমন্বয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারা কোনও দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নন। তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। এ বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন সংসদীয় কমিটির সভাপতি।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রশাসনের চলমান অস্থিরতার আরেকটি আলোচিত দিক পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন নিয়ে অসন্তোষ। একজন কর্মকর্তা উচ্চতর পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরও উপযুক্ত দায়িত্ব না পেলে তার দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ সীমিত হতে পারে। আবার গুরুত্বপূর্ণ পদে বারবার পরিবর্তন হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।