Image description

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির এক অভূতপূর্ব ‘নীল ঢেউ’ বা বিশাল জয় এসেছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্য উল্টে দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি, সরকারের অনমনীয় অবস্থান এবং ভূরাজনৈতিক বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে ভোটারদের এই স্পষ্ট রায়কে যুক্তরাষ্ট্রের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যা অর্জনের পাশাপাশি বেশ কিছু লাল দুর্গ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অভাবনীয় জয় তুলে নিয়েছে। ১০০টি আসন বিশিষ্ট মার্কিন সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা ৫৪টি আসনে জয়লাভ করে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, যেখানে রিপাবলিকানরা ৪৪টি আসনে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বাকি ২টি আসন নির্দলীয় বা গণনার অপেক্ষায় রয়েছে।

অপরদিকে, ৪৩৫টি আসন বিশিষ্ট প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ২২৮টিরও বেশি আসন নিশ্চিত করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২১৮টির বাধা সহজেই অতিক্রম করেছে। বিপরীতে রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৩৯টির কিছু বেশি আসন। ৬৮টি আসনে এখনো ভোট গণনা চলছে। দেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার এই বিশাল পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে গভর্নর পদেও; ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে অনুষ্ঠিত মোট নির্বাচনে জয়সহ ডেমোক্র্যাটরা বর্তমানে দেশের ২৮টি অঙ্গরাজ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। আর রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে ২০টি অঙ্গরাজ্যের শাসনভার। এই ফলাফলের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার সমীকরণ পুরোপুরি বদলে দিয়ে উভয় কক্ষেই ডেমোক্র্যাটিক পার্টি তাদের শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন চিকিৎসক ও প্রগতিশীল রাজনীতিক আবদুল এল-সাইয়েদ। মিশিগান অঙ্গরাজ্যের বহুল আলোচিত সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করে এ ইতিহাস গড়েছেন তিনি।

ক্যানসাসে ১৯৩২ সালের পর প্রথম এবং টেক্সাসে প্রায় চার দশক পর প্রথম ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে জেমস তালারিকো সিনেট আসনে জয়লাভ করেছেন। টেক্সাসে গভর্নর পদে রিপাবলিকান কট্টরপন্থিদের হারিয়ে প্রথম লাতিনার গভর্নর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস তৈরি করেছেন জিনা হিনোজোসা। জর্জিয়ায়ও দেশের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন কিশা ল্যান্স বটমস।

এক্সিট পোল এবং ভোটার জনমতের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জীবনযাত্রার আকাশছোঁয়া খরচ, মূল্যস্ফীতি এবং গৃহস্থালি বাজেটের চড়া দাম ভোটারদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ট্রাম্পের বিতর্কিত ইরান সংঘাত ও নীতিহীন যুদ্ধপ্রবণতা, কঠোর অভিবাসন নীতি এবং নির্বাহী ক্ষমতার বেপরোয়া প্রয়োগ সাধারণ মানুষের বড় এক অংশকে ব্যালট বাক্সে রিপাবলিকান-বিরোধী অবস্থান নিতে বাধ্য করেছে।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একচ্ছত্র আধিপত্য এবং নীতি বাস্তবায়নের গতি পুরোপুরি থেমে গেছে। দুই কক্ষেই ক্ষমতা হারানোয় ট্রাম্প প্রশাসন কার্যত ক্ষমতা সংকুচিত অবস্থায় পড়েছে। বাজেট পাস, নতুন সরকারি আর্থিক বিল এবং বিচারক কিংবা প্রশাসনিক শীর্ষ পদের অনুমোদন আটকে দেওয়ার ক্ষমতা এখন পুরোপুরি ডেমোক্র্যাটদের হাতে।

আগামী জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব নেওয়া নতুন কংগ্রেস ইরান যুদ্ধ শুরুর যৌক্তিকতা, হোয়াইট হাউসের অনিয়ম, নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত সম্পত্তি বা ব্যবসার ওপর একের পর এক আইনি সমন ও তদন্ত শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এই বিশাল বিপর্যয়ের পর রিপাবলিকান পার্টির ভেতরে ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হওয়া সহ-প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কিংবা ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডেসান্টিসরা নিজেদের কৌশল ও ব্র্যান্ড পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক পার্টিতে উদীয়মান প্রগতিশীল ও বৈচিত্র্যময় নতুন নেতৃত্ব ২০২৮-এর দৌড়ে আরও মজবুত অবস্থানে চলে আসছে।

ওয়াশিংটনের এই নতুন শক্তির ভারসাম্য বৈশ্বিক কূটনৈতিক ময়দানে এক বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘায়িত যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালির জলসীমায় অস্থিরতার ওপর ভোটারদের যে তীব্র অনাস্থা প্রকাশ পেয়েছে, তাতে হোয়াইট হাউসকে তাদের সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল দ্রুত পরিবর্তন করতে হবে। ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের সামরিক বাজেট কাটের হুমকির মুখে ওয়াশিংটন হয়তো তড়িঘড়ি কোনো কূটনৈতিক চুক্তি বা যুদ্ধবিরতির রাস্তা খুঁজতে বাধ্য হতে পারে, যা আবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একক সিদ্ধান্ত ও কৌশলের ওপর বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে।

এ ছাড়া ট্রাম্পের একপক্ষীয় শুল্ক আরোপ ও ন্যাটো বিরোধিতার বিপরীতে ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে বহুপক্ষীয় জোট পুনর্গঠনে চাপ দেবে। বাণিজ্য নীতিতেও প্রেসিডেন্টকে আন্তর্জাতিক চুক্তি অমান্য করতে আইনি বাধা দেওয়া সম্ভব হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই বড় রাজনৈতিক ধাক্কা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ক্ষমতার সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তবে বৈশ্বিক সংঘাত আর পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থার এই সময়ে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের বাধা সত্ত্বেও হোয়াইট হাউস কীভাবে তাদের পরবর্তী অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চালগুলো পরিচালিত করে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোর বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা।