Image description

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষত মুছতে সরকারি তহবিল থেকে বরাদ্দ ছিল প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অথচ দুর্যোগ পুনর্বাসনের নামে চলেছে নজিরবিহীন অনিয়ম ও লুটেরা সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য। রাজনৈতিক বিবেচনায় সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই তড়িঘড়ি অনুমোদিত ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন’ প্রকল্প রূপ নিয়েছে দুর্নীতির অভয়ারণ্যে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র। কাগজে-কলমে কাজ শতভাগ দেখিয়ে পুরো বিল তুলে চম্পট দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, বাস্তবে যার অর্ধেকও হয়নি। আবার কোথাও নির্মাণকাজ শেষ হতে না হতেই ভেঙে পড়েছে কোটি টাকার ব্রিজের গাইডওয়াল ও সড়কের প্রোটেকটিভ ওয়াল। ডিপিপি তোয়াক্কা না করে অননুমোদিতভাবে অতিরিক্ত প্রায় ৩২২ কোটি টাকার খরচের নজির মিলেছে পিরোজপুর ও বরিশাল অঞ্চলে। প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে মামলা ঠুকেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

জানা গেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় ২০২০ সালে ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্প’ নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। সরকারের পরিকল্পনা নীতিমালাতে রয়েছে, সাধারণত ৫০ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের নতুন প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই বা সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। তবে এ প্রকল্পটির ক্ষেত্রে সেই নিয়ম পুরোপুরি মানা বা প্রয়োগ করা হয়নি। সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণে দলীয় ঠিকাদারদের প্রাধান্য দিতে গিয়ে প্রকল্পের পদে পদে অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ ঘুরে

দেখেছেন কালবেলার প্রতিবেদকরা। এ সময় দুর্নীতির বাস্তব চিত্র দেখতে পান তারা। যেমন—গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মান্দুরা বাজার থেকে ভরতখালী পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার সড়কের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে কাগজে-কলমে। সেজন্য কাজের বিল বাবদ ঠিকাদারকে ৫২ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, মাত্র আধা কিলোমিটার কাজ করা হয়েছে।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ‘পূর্ব ছালুয়া মজিবর রহমানের বাড়ি হতে ওসমান মুন্সিরবাড়ির রাস্তায় ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৪ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ করা হলেও ব্রিজের গাইডওয়াল ভেঙে গেছে। ২০২৪ সালে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ির ইউনিয়নে ২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা দিয়ে ৩১ মিটার সেতুসহ দুই পাশের গাইডওয়াল মিলিয়ে ১১৫ মিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়। সেতু নির্মাণকাজ সম্পন্নের দুই মাস পরই দুই পাশের গাইডওয়াল ভেঙে পড়ে।

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দের অর্থ ছাড় ও প্রকৃত ব্যয়ের তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে শুরু হওয়া ‘ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন’ প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে মোট সংস্থান ৫ হাজার ৯০৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই প্রকল্পের আওতায় মোট ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ৬১ লাখ টাকা অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যার বিপরীতে মাঠপর্যায়ে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৪৭৯ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। প্রকল্পে ছয় বছরের বিপুল ব্যয়ের পেছনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠেছে। এরপরও প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। দেশের ৮ বিভাগের ৫৫ জেলার ৩৫৫টি উপজেলার আওতাধীন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়ন অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় যেসব এলাকায় কাজ করা হয়েছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ত্রুটি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এই প্রকল্পের আওতায় রাস্তার কার্পেটিং স্তরে প্রাক্কলিত পরিমাপের চেয়ে পাতলা এবং নিম্নমানের ইটের খোয়া ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। যথাযথ রোলার বা ভাইব্রেটর দিয়ে কম্প্যাকশন না করায় অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তার উপরিভাগের সিলকোট ও কার্পেটিং উঠে যাচ্ছে। ফলে রাস্তাটি পুনর্নির্মাণের কিছুদিন পরই বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত ও বিটুমিন ধসে পড়েছে। অথচ প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, পুনর্নির্মিত সড়ক ও ব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ন্যূনতম তিন বছর পর্যন্ত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার কথা। যদিও সেই নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সড়কে ভাঙন দেখা দিচ্ছে এবং ব্রিজের প্রোটেকশন বা গাইডওয়াল ধসে পড়ছে।

অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪টি অডিট আপত্তি অনিষ্পন্ন থাকা এবং ২২ শতাংশ স্কিমের বাস্তবায়নে বিলম্ব প্রকল্পের দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ প্রয়োজনের প্রেক্ষাপটে প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বিধায় কোনো সম্ভাব্যতা যাচাই পরিচালিত হয়নি। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৪৮৮টি স্কিমের কাজ (২২.৪৬%) এখনও শুরু হয়নি, যার মধ্যে ৪২.৮২% কালভার্ট (২০৯টি) এবং ৫৬.৭৬% সড়ক (২৭৭টি)। এ ছাড়া, ৭৩৭টি চলমান স্কিমের মধ্যে ২৫৫টি স্কিমের কাজ ৩০% সম্পন্ন হয়েছে, ১৫০টি স্কিমের কাজ ৩১%-৫০% সম্পন্ন হয়েছে, ২১৫টি স্কিমের কাজ ৫১%-৮০% সম্পন্ন হয়েছে এবং ১১৭টি স্কিমের কাজ ৮১%-৯৯% সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের বড় অংশ এখনো বাস্তবায়নের বাইরে রয়েছে, যা সময়মতো প্রকল্প সমাপ্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

আইএমইডির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে জানা গেছে—প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনায় অর্থছাড় ও ব্যয়ের ধীরগতি, বাস্তবায়নকালীন দীর্ঘসূত্রতা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি বা পিআইসি (লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪০% অর্জিত) এবং প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি বা পিএসসি (লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪০% অর্জিত) সভা নিয়মিত আয়োজন না করা এবং প্রায় ৩০ কোটি ১২ লাখ ৩২ হাজার টাকার অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তিকে এই প্রকল্প ব্যবস্থাপনার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

২০২০ সালের ২০ মে ঘূর্ণিঝড় আম্পানে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাস্তাঘাট, সেতু ও কালভার্ট। এগুলো মেরামতের দায়িত্ব পায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২০ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় প্রকল্পের সমাপ্তি টানা সম্ভব হয়নি, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়েছে। ধাপে ধাপে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ছে, আর অনিয়ম ও দুর্নীতিও বন্ধ হয়নি।

অডিট প্রতিবেদনের পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পের অগ্রগতি আশানুরূপ নয়। প্রকল্পের অন্যতম প্রধান কাজ সড়ক পুনর্বাসনে অগ্রগতি অনেকটা পিছিয়ে আছে। উপজেলা সড়ক পুনর্বাসনে অগ্রগতি ৬৪.১৯%, ইউনিয়ন সড়ক পুনর্বাসনে ৪৯.৪৫%, গ্রাম সড়ক পুনর্বাসনে ৬০.৯৬% এবং আরসিসি সড়ক পুনর্বাসনে অগ্রগতি মাত্র ৫০%। অন্যদিকে, ব্রিজ পুনর্বাসনে অগ্রগতি ৬৯.১৭% হলেও কালভার্ট নির্মাণে অগ্রগতি ৮০৪.৭ মিটার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত মাত্র ২৪৫ মিটার কাজ সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট ভৌতিক অগ্রগতির মাত্র ৩০.৪৫%। এটি প্রকল্প বাস্তবায়নে অব্যবস্থাপনা, মন্থর গতি ও পর্যাপ্ত তদারকির অভাবের ইঙ্গিত দেয়। প্রকল্পের সামগ্রিক গড় ভৌত অগ্রগতি ৬২.১৮% এবং আর্থিক অগ্রগতি ৫৮.৯২%, যা প্রকল্পের বাকি মেয়াদ বিবেচনায় বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা অসম্ভব।

জানা গেছে, এ প্রকল্পের পুরো অর্থ সরকারের নিজস্ব তহবিল (জিওবি) থেকে, কোনো বিদেশি ঋণ বা সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন নেই। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি। প্রকল্পের আওতায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজন হলে প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার যোগসাজশে শুরু হয়। নির্মাণকাজের চাহিদা তৈরি থেকে শুরু করে ঠিকাদার নিয়োগ ও বাস্তবায়ন—প্রতিটি ধাপে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। প্রয়োজন ছাড়া প্রকল্প অনুমোদন, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার কিংবা প্রাক্কলিত ব্যয় বাড়িয়ে ধরে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব অপচয় করা হচ্ছে।

প্রকল্পের এক কর্মকর্তা জানান, অনেক জায়গায় সেতুর প্রকৃত প্রয়োজন না থাকলেও কেবল বাজেট ছাড় ও ঠিকাদারি কাজ পাইয়ে দেওয়ার স্বার্থে কালভার্ট বা সেতুর প্রস্তাব পাঠানো হয়।

কুমিল্লা: কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে প্রায় দুই কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত রাখায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সামস ইঞ্জিনিয়ারিংকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে এলজিইডি। নির্ধারিত দেড় বছরের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রতিষ্ঠানটির দরপত্রও বাতিল করা হয়েছে। নাঙ্গলকোট উপজেলা প্রকৌশলী মো. অহিদুল ইসলাম বলেন, ব্রিজটির আগের ঠিকাদার নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করতে পারেননি। এ কারণে তাকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং তার দরপত্র বাতিল করা হয়। তিনি কাজ ফিরে পেতে হাইকোর্টে মামলা করেছেন। আদালতের নির্দেশনা পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বরিশাল: সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট থেকে চন্দ্রমোহন জিসি রোড পর্যন্ত ১ দশমিক ৭৫৮ কিলোমিটার সড়কের কাজের জন্য ২ কোটি ১৯ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়। তদন্তে জানা গেছে, প্রকল্পটিতে ভৌত অগ্রগতি ঠিক ৫০ শতাংশ দেখিয়ে এরই মধ্যে ঠিকাদারকে ৯৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু হয়ে ২০২৫ সালের মার্চে সম্পন্ন হওয়ার সময়সীমা নির্ধারিত থাকলেও, রহস্যজনকভাবে শেষ মুহূর্তে এসে কাজ বন্ধ ও বাতিল করা হয়। নির্মাণকাজ অসমাপ্ত রেখে ঠিকাদারের চলে যাওয়া এবং কর্তৃপক্ষের সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া চরম গাফিলতিরই প্রমাণ। তদুপরি, হস্তান্তরের আগেই নিম্নমানের নির্মাণশৈলীর কারণে নবনির্মিত সড়কটির একাংশ দেবে গেছে। অন্যদিকে তালুকদার হাট (খাজুরতলা), সফিপুর হয়ে চরকালেখান ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ব্যাপারীহাট পর্যন্ত ১ দশমিক ৬০ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ১ কোটি ২২ লাখ ৫২ হাজার টাকার কাজের জন্য ২০২৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি হয়। কাজ শেষ করার কথা ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট। এরই মধ্যে কাজের বিল বাবদ ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় অল্প কিছুদিনের মধ্যে সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে।

রংপুর: রংপুরের মিরবাগ কদমতলা থেকে হারাগাছ দুই দশমিক ৩২ কিলোমিটার সড়কের কাজ ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ শেষ হয়েছে। সড়কের কাজের বিল বাবদ ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। কাজের মান ছিল খুবই নিম্নমানের। যে কারণে এখনই সড়কের অবস্থা বেহাল। মিরবাগ গ্রামীণ ব্যাংকের সামনের সড়কের ৩০ থেকে ৪০ মিটার অংশের কার্পেটিং নষ্ট হয়ে গেছে। কাজ শতভাগ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে; কিন্তু সড়কটি এখনো ঠিক করা হয়নি। রংপুরের মিরবাগ বাজার থেকে সিংহের কুড়া ৪ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার রাস্তার কাজ ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর শুরু হলেও এখন পর্যন্ত শেষ হয়নি। ৩ কোটি ৬১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মধ্যে ১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ঠিকাদারকে পরিশোধ করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, সংশ্লিষ্ট সড়কের ডব্লিউবিএম বা ইটের খোয়ার স্তর বিছানোর কাজ সম্পন্ন হলেও এখনো কার্পেটিং শুরু করা হয়নি। অন্যদিকে, বিজলির ঘণ্টি থেকে বড় দরগাহ পর্যন্ত সড়কের ভৌত কাজ হয়েছে মাত্র ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। এর মাঝেই আবার পুকুরপাড়ে প্যালিসেডিং প্রতিরক্ষামূলক কাজসহ প্রায় ১০০ মিটার অংশে ঠিকাদার কোনো হাতই দেয়নি। এ ছাড়া দমদমা জাতীয় মহাসড়ক থেকে চড়কাবাড়ী পর্যন্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হয়েছে এবং পিচঢালাই রাস্তা ফেটে গেছে। একইভাবে পীরগঞ্জের ধাপেরহাট থেকে চতরা পর্যন্ত সড়কের প্রায় ১ কিলোমিটার অংশের অবস্থা অত্যন্ত বেহাল হয়ে পড়েছে।

গাইবান্ধা: গাইবান্ধায় আম্পান প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ শেষে তড়িঘড়ি করে বিল উত্তোলনের পর ঠিকাদার উধাও। গাইবান্ধা সাঘাটা উপজেলার মান্দুরা-ভারতখালীর উল্লাবাজার পর্যন্ত ১ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। শতভাগ কাজ শেষ দেখিয়ে ৫২ লাখ ২৬ হাজার টাকা বিল উত্তোলন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবে ঘুরে দেখা গেছে গ্রামীণ সড়ক সংস্কারের কাজ কাগজে-কলমে প্রায় দেড় কিলোমিটার সংস্কারের কথা থাকলেও সেখানে আধা কিলোমিটার সড়কের কাজ করা হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদ বলেন, এলাকার মানুষ মান্দুরা রাস্তা ব্যবহার করে উল্লাবাজারে যেতে পারছে না।

গাইবান্ধার সদরের নুরুলগঞ্জ থেকে ফকিরহাট পর্যন্ত ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৩৯ হাজার টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ৩০ জুন কাজ শেষ দেখানো হয়েছে। কিন্তু নিম্নমানের ইট, সিমেন্ট ও বালু ব্যবহার করায় কিছুদিন পর সড়কে ভাঙন দেখা দিয়েছে। পুকুরের পাশে প্যালিসেডিং না দেওয়ায় রাস্তায় ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রকল্পের অনিয়মের চিত্র মিলেছে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জেও। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারিতে দরবস্ত ইউনিয়ন পরিষদ ও বগুলাগাড়ি বাজার এলাকার ২৮.৪৫ মিটার গার্ডার ব্রিজের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে হস্তান্তরের পর বছর ঘুরতে না ঘুরতেই বর্তমানে ব্রিজটির মূল পিলারসহ বিভিন্ন অংশে ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে, যা ব্রিজের স্থায়িত্বকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলেছে। এ ছাড়া সুন্দরগঞ্জের রামডাকুয়া-শ্যামরায়ের পাড়া প্রাইমারি রোড এলাকায় ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ৪০০ মিটার থেকে ১৪৬০ মিটার পর্যন্ত সড়ক সংস্কার করা হলেও কাজের মান নিয়ে চরম প্রশ্ন উঠেছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী সড়কের পাশে প্রতিরক্ষামূলক গাইডওয়াল সঠিকভাবে স্থাপন না করায়, সংস্কারের অল্পদিনের মধ্যেই নবনির্মিত পিচঢালাই রাস্তায় দীর্ঘ ফাটল দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নের জোতগোবর্দ্ধন এলাকায় প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সেতুর সংযোগ সড়কের বিভিন্ন অংশের প্রতিরক্ষামূলক দেয়ালে ধস দেখা দিয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই সেতুর দুই পাশের সংযোগ সড়কের ব্লক দেবে গেছে, ভেঙে পড়েছে গাইডওয়াল। এতে সেতুর মূল অবকাঠামোও ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাইডওয়াল ভেঙে পড়ায় কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্মাণকাজের শুরু থেকেই বিভিন্ন ত্রুটি ছিল। পর্যাপ্ত সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়সারাভাবে কাজ শেষ করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, মূলত পানির তীব্র স্রোতের কারণে স্কাওয়ারিং (মাটি ক্ষয়) হয়ে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যে পাইলিংয়ের খুঁটি দিয়ে সড়কের প্রোটেকটিভ ওয়ার্ক (প্রতিরক্ষামূলক দেওয়াল) ফের স্থাপন করা হবে।

ডিপিপির ব্যয়ের চেয়ে অননুমোদিত অতিরিক্ত টাকা খরচ: পিরোজপুর জেলা পল্লি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পসহ বরিশাল বিভাগের সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম ও তছরুপের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অডিট নিরীক্ষায় দেখা যায়, ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১১৭.৭৩ কোটি টাকা, কিন্তু বরাদ্দ দেওয়া হয় ২১১.০৮২ কোটি টাকা। ফলে ডিপিপির চেয়ে ৯৩.৩৫ কোটি টাকা বেশি ব্যয় করা হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১৭.৭৩ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া ও ব্যয় করা হয় ১৪৮.৩৬ কোটি টাকা। এ বছরেই ডিপিপির অতিরিক্ত ৩০.১৮ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। দুই অর্থবছরে পরিকল্পনা কমিশনের নীতিমালা লঙ্ঘন করে কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়াই মোট ১২৪.৩৩ কোটি টাকা বিধিবহির্ভূতভাবে অতিরিক্ত ছাড় ও ব্যয় করা হয়েছে।

সাবেক প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা: এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসান ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের পরিচালক থাকাবস্থায় ২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। পিরোজপুর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা করেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রফিকুল হাসান ও তার স্ত্রী মোসাম্মৎ কানিজ ফাতেমার বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলার বিবরণীতে জানা যায়, রফিকুল হাসান রাজধানীর জাপান গার্ডেন সিটিতে ১ কোটি ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৬০০ টাকা দিয়ে ১ হাজার ৭৪০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। অথচ, সম্পদ বিবরণীতে ফ্ল্যাটের মূল্য দেখিয়েছেন ৪৩ লাখ ৪০ হাজার ৭৫০ টাকা। এ ছাড়া তার কাছে ১ কোটি ৩৭ লাখ ২ হাজার ৮৬৭ টাকা মূল্যের অসংগতিপূর্ণ সম্পদ রয়েছে। ফ্ল্যাটের মূল্য বাবদ তিনি যে অর্থ পরিশোধ করেছেন এবং এই অর্থের যে উৎস দেখিয়েছেন তা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। স্ত্রী কানিজ ফাতেমার স্থাবর-অস্থাবর ৩৮ লাখ ৯২ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদ আছে, যা তার স্বামী রফিকুল হাসানের ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে।

চুক্তি স্বাক্ষর ও কাজে অবহেলা: অডিট পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, বিভিন্ন নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের অধীনে ২৩টি কাজের বিপরীতে ৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী চুক্তি স্বাক্ষর থেকে ৭ দিনের মধ্যে কাজ শুরুর বাধ্যবাধকতা থাকলেও দীর্ঘদিন অতিবাহিত হওয়ার পরও ঠিকাদাররা কাজ শুরুর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। কার্য সম্পাদনে ব্যর্থ ঠিকাদারদের চুক্তি বাতিলপূর্বক কার্যসম্পাদন জামানত নগদায়ন করে সরকারি কোষাগারে জমা না করায় সরকারের আর্থিক ক্ষতি ৪ কোটি ২ লাখ টাকা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য: ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক আহসান কবির কালবেলাকে বলেন, অডিটে মূল কাজেই হচ্ছে আপত্তি দেওয়া। পরে আপত্তিগুলো নিষ্পত্তি হয়ে যায়। যেসব উন্নয়ন কাজে অডিট দেওয়ার প্রয়োজন নেই, সেখানেও অডিট দেন অডিট কর্মকর্তারা।

তিনি বলেন, অডিটে কোনো ত্রুটি বা আপত্তি বের করতে না পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় অডিট কর্মকর্তাদের। এমনকি অসাধু উপায়ে রফাদফা বা ম্যানেজ হয়ে যাওয়ার তকমাও জোটে তাদের কপালে। ফলে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ এবং প্রশাসনিক চাপ এড়াতেই বাধ্য হয়ে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় অডিট আপত্তি তোলেন কর্মকর্তারা।

প্রকল্পের মোট অগ্রগতি ৬৮ শতাংশ দাবি করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নিতে চলতি অর্থবছরের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বরাদ্দ পেয়েছি ৩৮০ কোটি টাকা, এরমধ্যে ১৬৩ কোটি টাকা বিভিন্ন জেলায় ছাড় হয়েছে। পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে ৫২৯টি কাজ চলমান, যার জন্য ১২শ কোটি টাকার প্রয়োজন। প্রকল্প পরিচালক বলেন, ঘূর্ণিঝড় আম্পানের পাশাপাশি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও সেতু নির্মাণের জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজে পিরোজপুরে দুর্নীতি হয়েছে। যার জন্য মামলাও হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক কালবেলাকে বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পল্লি সড়ক অবকাঠামো পুনর্বাসন প্রকল্পে যেসব দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, সেটি তদন্ত করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণে প্রকল্পের কর্মকর্তা-ঠিকাদারদের যোগসাজশ বরাবরেই দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ নিজের পকেটে নিতে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন তারা।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন কুমিল্লার মাসুক আলতাফ চৌধুরী, বরিশালের খান রুবেল, রংপুরের রেজওয়ান রনি, গাইবান্ধার সুমন মিয়া ও কুড়িগ্রামের সাইয়েদ আহমেদ বাবু)