Image description
বিদেশে অর্থ পাচার

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের আমলে দেশের ব্যাংকগুলোয় নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। অর্থ লোপাট ও পাচারের মূল হোতা হিসেবে নাম উঠে এসেছে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল আলম মাসুদ, বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমান এবং আলোচিত প্রশান্ত কুমার হালদারসহ (পি কে হালদার) সংঘবদ্ধ একটি চক্রের। আর এই চক্রকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছেন অর্থ পাচার ঠেকানোর গেটকিপারখ্যাত বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস ও বিএফআইইউর কয়েকজন কর্মকর্তা। এই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে দেশ থেকে ২৪ হাজার কোটি ডলার বা ২৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি, দুদকের অনুসন্ধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের বিশেষ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনায় উঠে আসে, এই চক্রকে ঋণের নামে অর্থ লোপাটে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফজলে কবির, আব্দুর রউফ তালুকদার, সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও নীতি উপদেষ্টা আবু মো. নাছের, কাজী ছাইদুর রহমান। এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক পিএলসির এমডি মুহাম্মদ মনিরুল মওলা, সাবেক ডিএমডি মিফতাহ উদ্দীনসহ ডজনখানেক ব্যাংকের এমডি, ডিএমডিও পাচারের সঙ্গে যুক্ত।

দুদকের এক নথিতে বলা হয়, এনআরবি কমার্শিয়াল (এনআরবিসি) ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাটসহ আর্থিক অনিয়মের তদন্তের দায়িত্ব বিএফআইইউতে পাঠানো হলে মাসুদ বিশ্বাস গুরুতর অনিয়মকে গোয়েন্দা প্রতিবেদন হিসেবে দেখাননি। বরং তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে সাধারণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর অনুমতি দেন, যা পাচার এবং অনিয়মকে আশকারা দিয়েছে। একইভাবে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে রূপালী ব্যাংকের গ্রাহক ডলি কনস্ট্রাকশনকে একক গ্রাহক ঋণসীমা ভেঙে ৪০০ কোটি টাকার আর্থিক সুবিধা প্রদান, ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন ছাড়াই ব্যাংকটির চারটি শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সরানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করেন তিনি।

এদিকে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, সাদ মুসা গ্রুপ, সাজিদা ফাউন্ডেশন, পি কে হালদারসহ কয়েকটি গ্রুপের মাধ্যমে ২৪০ বিলিয়ন ডলার বা ২৪ হাজার কোটি ডলার বিভিন্ন দেশে পাচার হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। গড় হিসাবে প্রতিবছর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও আর্থিক খাতের গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউ অর্থ পাচার ঠেকাতে কোনো বাধা না দিয়ে বরং সহায়তা করেছে, যার দায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক খাতের এ দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থা এড়াতে পারে না।

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ব্র্যাক ব্যাংকের গ্রাহক সাজিদা ফাউন্ডেশন ২০২১ সালে ৮২ হাজার ৪১৬ ডলার বিদেশে পাচার করেছে। যমুনা ব্যাংকের ধানমন্ডি শাখার গ্রাহক শিরিন স্পিনিং মিলসের অনুকূলে কমপক্ষে ১০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স প্রেরণের ক্ষেত্রে অনিয়ম অবৈধভাবে প্রভাব বিস্তার করেন মাসুদ বিশ্বাস। একইভাবে এনআরবিসি ব্যাংকের গ্রাহক টাইগার আইটির নামে ১ হাজার কোটি টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।

জানতে চাইলে বিএফআইইউর প্রথম প্রধান ও সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবু হেনা মোহা. রাজী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘রাজনৈতিক ও ওপরমহলের চাপ ও বাধা ছিল। এটা করা যাবে না, ওটা ধরা যাবে না, সব দেখা যাবে না ইত্যাদি। এর ওপর আমাদের আইনি ও নীতিমালার দুর্বলতা ছিল, পলিসি দুর্বল ছিল। ইমপ্লিমেন্টেশনে দুর্বলতা ছিল। সেই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ও প্রভাব খাটিয়ে যে অর্থ পাচার করা হচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারছিলাম। ব্যাংকারদের সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। একসময় অনেক ব্যাংকে এ জন্য জনবলও ছিল না। যার সুযোগ নিয়ে ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও পাচার হয়েছে।’

দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, মাসুদ বিশ্বাস দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্কাই ক্যাপিটাল এয়ারলাইনসের বিমান কেনায় সন্দেহজনক অনিয়মের অভিযোগটি ঘুষের বিনিময়ে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে না পাঠিয়ে গুরুতর অপরাধ করেছেন। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান তমাল পারভেজ ব্যাংক থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা লুটপাটসহ আর্থিক অনিয়মের রিপোর্টকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা-২০১৯-এর আওতায় গোয়েন্দা প্রতিবেদন হিসেবে না পাঠিয়ে সাধারণ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন হিসেবে পাঠানোর অনুমতি দেন।

দুদকের মহাপরিচালক (প্রতিরোধ) ও মুখপাত্র মো. আক্তার হোসেন আজকের পত্রিকাকে বলেন, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ২ জানুয়ারি মাসুদ বিশ্বাসের বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। আর গত ১৮ জানুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রতিটি অভিযোগের তদন্ত চলমান। অভিযোগগুলোর প্রমাণ পেলে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বিএফআইইউর সাবেক প্রধান মাসুদ বিশ্বাস, সাবেক গভর্নর ফজলে কবির, আব্দুর রউফ তালুকদার, ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান এমডি মুহাম্মদ মনিরুল মওলা, ডিএমডি মিফতাহ উদ্দীন আহমেদ, আকিজ উদ্দিন আওয়ামী লীগ আমলে এস আলমের মালিকানাধীন ৫টি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ সরাতে সহায়তা করে পাচারের পথ ঝামেলামুক্ত করেন। একই ভূমিকা ছিল অন্য ৫টি ব্যাংকের এমডি, ডিএমডি, অর্থ পাচার প্রতিরোধের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সময় বিএফআইইউর সাবেক ডেপুটি প্রধান, পরিচালক, অতিরিক্ত পরিচালক, যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১, ২, বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা ট্রেজারি বিভাগ, বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ, বাংলাদেশ ব্যাংকের কয়েকজন সমন্বয়ক ও পর্যবেক্ষক, অফসাইট সুপারভিশন ও পরিদর্শন বিভাগের কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে ইচ্ছেমতো নীতিমালা করতেন এস আলম ও বেক্সিমকোর কর্ণধারের নেতৃত্বাধীন সংঘবদ্ধ চক্র। এমনকি অর্থ লুটের সহায়ক প্রজ্ঞাপনও করাতেন তাঁরা। ওই চক্রের ইশারায় গভর্নর, বিএফআইইউ প্রধান, ডেপুটি প্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন, পদোন্নতিও হতো। আর ব্যাংকগুলো পরিদর্শন এস আলমের নির্দেশে বাইরে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনো কর্মকর্তা এস আলমের অনিয়ম ধরতে গেলে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হতো, দেখানো হতো চাকরিচ্যুতির ভয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের চট্টগ্রাম অফিসের নির্বাহী পরিচালকদের দেওয়া হতো গাড়ি উপহার। এ ছাড়া কর্মকর্তাদের জন্য স্তরভেদে ছিল মূল্যবান উপঢৌকন।

অর্থনীতিবিদ ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম বলেন, অবৈধ অর্থের উৎস বন্ধ না হলে অর্থ পাচার চলতেই থাকবে। বাংলাদেশে অবৈধ অর্থের উৎস বেশি। তাই তাঁরা তাঁদের অবৈধ অর্থ দেশে না রেখে বিদেশে পাচার করে দেন। যেহেতু এই টাকা অবৈধ, তাই তাঁদের পরিবারের কেউই নিরাপদ নন। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন কৌশলে তাঁরা অর্থ পাচার করে দেন।

২০১৬ সালের ১১ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠক থেকে জানা গেছে, প্রতিবছর গড়ে ৫০০ কোটি টাকা করে পাচার হয়েছে। ওভার ইনভয়েস-আন্ডার ভয়েস করে টাকা পাচার হয়েছে। সেই পাচারের তথ্য জেনে নীরব ভূমিকা রেখেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অর্থ পাচারের জন্য সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএফআইইউর কর্মকর্তাদের ভূমিকাকে দুষেছেন। আইনি দুর্বলতার চেয়ে তাঁদের দায় বেশি ছিল। তা পাচার ও অনিয়ম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিলে পাচার উল্লেখযোগ্য হারে কমত।

বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসেন সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ব্যাংক খাতের দুর্দশার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়ী করে বলেন, খেলাপি হওয়া ঋণকে নিয়মিত দেখাতে পুনর্গঠন (রিস্ট্রাকচার), পুনঃ তফসিল (রিশিডিউল) করার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।