৮৫ লাখ টাকা দিয়েও মেলেনি ফ্ল্যাট। জমির মালিকানাও বুঝে পাননি হাবিবুর রহমান আজাদ। কথা ছিল, একটি শেয়ারের বিপরীতে পাবেন ১৪০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট। কিস্তিতে পুরো টাকাও পরিশোধ করেন। শেষে জানতে পারেন, একই ফ্ল্যাটের শেয়ার একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করা হয়েছে। ‘ডোম ইনো’ ইমপ্লিসিটো প্রকল্পে প্রতারণায় এখন আদালতে ঘুরছেন হাবিবুর। জমির মালিকানায়ও গলদ আছে। জমির উপর আদালতে মামলা চলছে। অন্যদিকে, ঢাকার পশ্চিম মেরুল বাড্ডায় ‘আমার বাড়ি আমার ঘর’ ডেভেলপার কোম্পানির প্রতারণার শিকার হয়ে ১৪৯ শেয়ার ক্রেতা আদালতে ঘুরছেন। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৬৫ ক্রেতা মামলা করেছেন। তবুও সুরাহা মিলছে না। একই কায়দায় আফতাবনগরে ‘শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোম’র বিরুদ্ধে শতাধিক গ্রাহকের কাছ থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। শুধু এই তিনটি ঘটনা নয়, জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার আশায় টাকা দিয়ে বিপাকে পড়েছেন আরও অনেকে।
কোথাও একই জমি একাধিকবার বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। কোথাও খাসজমিতে আবাসন প্রকল্প গড়ে তা বিক্রি করে সটকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। আবার কোথাও টাকা নিয়েও বছরের পর বছর ফ্ল্যাট বা প্লট বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে না। এতে ফ্ল্যাট ও জমি শেয়ার প্রতারণার অভিযোগ নিয়ে হাজার হাজার মানুষকে আদালতে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ফ্ল্যাট ও প্লট প্রতারণার ঘটনা ঘটছে ঢাকার আশপাশে গড়ে ওঠা নতুন নতুন আবাসন কোম্পানিতে। এর মধ্যে কেরানীগঞ্জ, আমিনবাজার, বছিলা, ঘাটারচর, রূপগঞ্জ, সাভার, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর ও সিংগাইয়ের আবাসন কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে জমির প্লট শেয়ার জালিয়াতি করে হাজার হাজার গ্রাহকের শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় ঢাকার আদালতে শেয়ার প্রতারণার মামলা বাড়ছে।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ১লা অক্টোবর পর্যন্ত দেশে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৯০৩টি মামলার বিচার চলছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর ও জেলা জজ আদালতে রয়েছে ৫ হাজার ৯৪৮টি। মুন্সীগঞ্জ জেলা জজ আদালতে ৫৩৮টি, নারায়ণগঞ্জের আদালতে ২৮৬টি, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা জজ আদালতে ৩৮৬টি, সিলেট মহানগর ও জেলা জজ আদালতে ২১৩টি মামলা রয়েছে। এসব মামলায় অন্তত ৪০ হাজার ক্রেতা আদালতে ঘুরছেন। কয়েকটি মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, প্রথমে একটি জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে জমির শেয়ার বিক্রির ক্রেতা আহ্বান করা হচ্ছে। পরে একটি রসিদ ধরিয়ে দিয়ে ৭ থেকে ১০ লাখের অধিক টাকা নেয়া হচ্ছে। পরে পুরো শেয়ার বিক্রি শেষে সাইনবোর্ড ফেলে টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন প্রতারক চক্র। মূলত কম টাকায় ফ্ল্যাটের মালিক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নেয়া হচ্ছে। পরে জমির মালিকানা ও প্রকল্পের অনুমোদন নিয়ে দেখা দিচ্ছে জটিলতা। কিছু এজাহারে দেখা গেছে, জমির পরিমাণের তুলনায় বেশি শেয়ার বিক্রি, মালিকানা নিয়ে জটিলতা এবং চুক্তি অনুযায়ী ফ্ল্যাট বুঝিয়ে না দেয়ার ঘটনা ঘটছে। শেয়ার বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া ডেভেলপার কোম্পানির কোনোটিই রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সদস্য নয়।
টাকা দিয়েও মেলেনি প্লট: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্লট বিক্রির নামে টাকা নিয়ে জমি বুঝিয়ে না দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের তথ্য বলছে, অন্তত ৩৭ জন গ্রাহকের কাছ থেকে ৭ কোটি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৪ টাকা নেয়ার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে বিভিন্ন মৌজায় প্লট বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে কিস্তিতে টাকা নেয়া হয়। পরে আর কাউকে প্লট বুঝিয়ে দেয়া হয়নি। অনেকে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেও টাকা বুঝে পায়নি। পরে মামলা করে সিআইডি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেপ্তার করেন।
প্লটের নামে ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ: রাজধানীর উত্তরায় রাজউকের পাঁচ কাঠার প্লট কিনে দেয়ার কথা বলে ক্রেতার কাছ থেকে ৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার এজাহার অনুযায়ী, প্লট কেনা ও নিবন্ধনের কথা বলে টাকা নেয়া হলেও জমি বুঝিয়ে দেয়া হয়নি বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়। ঘটনাটি শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পের নয়। তবে জমি দেয়ার প্রতিশ্রুতিতে টাকা নিয়ে মালিকানা বুঝিয়ে না দেয়ার অভিযোগের আরেকটি দৃষ্টান্ত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান মানবজমিনকে বলেন, জমির শেয়ার কেনার আগে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করতে হবে। জমির শেয়ার কিনেই ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া যায় না। আগে নিশ্চিত হতে হবে জমির মালিক কে? দলিল, খতিয়ান ও নামজারি ঠিক আছে কি না- তা যাচাই করতে হবে। দেখতে হবে প্রকল্পের অনুমোদনও। এবং আবাসন কোম্পানির ছাড়পত্র নিয়ে তারপর রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। এতে প্রতারণা হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
আইনজীবী এডভোকেট জাকির হোসাইন জুয়েল মানবজমিনকে বলেন, একই জমি আগে অন্য কারও কাছে বিক্রি বা বন্ধক রাখা হয়েছে কি না- সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
শুধু বিজ্ঞাপন, নকশা কিংবা কোম্পানির নিবন্ধন দেখে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। আইনজীবীকে দিয়ে পরীক্ষা করানো এবং টাকা লেনদেনের প্রমাণ রাখা প্রয়োজন। একটি ফ্ল্যাটের আশায় জীবনের সঞ্চয় তুলে দেন অনেক ক্রেতা। সেই টাকা হারালে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না, ভেঙে যায় মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের স্বপ্নও। তাই জমির মালিকানা ও প্রকল্পের অনুমোদন যাচাইয়ের পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায় নজরদারি বাড়ানো জরুরি। নইলে কম টাকায় ফ্ল্যাটের স্বপ্ন দেখিয়ে ক্রেতাদের সর্বস্ব হারানোর ঝুঁকি থেকেই যাবে।