Image description

‘পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি দল। সবার মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা। এসেই গুলি চালাল। এরপর স্লোগান দিতে দিতে চলে গেল—আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন হয়ে গেল।’ পাবনার আতাইকুলা থানার পুষ্পপাড়া গরুর হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে দুজনকে হত্যার ঘটনার বর্ণনা এভাবেই দিচ্ছিলেন এক প্রত্যক্ষদর্শী।

 

ঘটনাস্থলের পাশের একটি দোকানের ওই ব্যবসায়ীর দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর স্লোগান দিতে দিতে চলে যায় অস্ত্রধারীরা। ‘আজ পুষ্পপাড়া স্বাধীন’—হামলাকারীদের এই স্লোগানের অর্থ কী, কারা এবং কেন এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তা নিয়ে এলাকায় চলছে নানা আলোচনা ও জল্পনা।

 

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে পুষ্পপাড়া গরুর হাটের কার্যালয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

 

নিহত দুজন হলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ পাবনা সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের সাবেক আহ্বায়ক আব্দুস সালাম (৫৬) এবং তার ভাগনে রিপন হোসেন (৫০)। রিপন সদর উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক ও আতাইকুলা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ছিলেন। তারা দুজনই আতাইকুলা ইউনিয়নের ধর্মগ্রামের বাসিন্দা।

 

 

প্রায় ৩০ বছর ধরে পুষ্পপাড়া গরুর হাটের ইজারাদার ছিলেন আব্দুস সালাম। তার সঙ্গে প্রায়ই থাকতেন ভাগনে রিপন। ফলে হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধ, পূর্বশত্রুতা কিংবা চরমপন্থিদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

 

ঘটনাস্থলে রক্তের দাগ, বাড়িতে শোকের মাতম

 

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) দুপুরে পুষ্পপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, পাবনা-ঢাকা মহাসড়ক থেকে নেমে বাঁ পাশে পুষ্পপাড়া গরুর হাট। মহাসড়কের পাশেই হাটের কার্যালয়। সেখানেই গুলি করে হত্যা করা হয় দুজনকে। ঘটনার পরদিনও কার্যালয়ের মেঝেতে রক্তের দাগ দেখা যায়। ঘটনাস্থল দেখতে সেখানে ভিড় করেন বহু মানুষ।

পশ্চিম দিক থেকে হেঁটে আসছিল ছয়জন মুখোশধারী। ছবি : সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া
পশ্চিম দিক থেকে হেঁটে আসছিল ছয়জন মুখোশধারী। ছবি : সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে নেওয়া

 

হাটের পাশেই নিহত আব্দুস সালামের বাড়ি। বাড়ির সামনেও নারী-পুরুষের ভিড়। সামনে রাখা হয়েছে মরদেহ বহনের খাটিয়া। বাড়ির ভেতরে চলছে মরদেহ গোসল করানোর প্রস্তুতি। কয়েকজন প্রবীণ বড়ইপাতা দিয়ে পাতিলে পানি প্রস্তুত করে মরদেহের অপেক্ষায় ছিলেন। দ্বিতল বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসছিল শোকাতুর নারীদের আহাজারি।

 

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ফজলুল হক বলেন, ‘বেটাডা খুব ভালো ছিল। কয়েকবার হজ করেছে। দান-খয়রাত করত। কী কারণে যে বেটাডারে মারল, বুঝতে পারতেছি না।’

 

নিহতের আরেক প্রতিবেশী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই গরুর হাটের জন্যই মনে হয় এত কিছু। তবে আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না।’

 

আব্দুস সালামের ভাই আবুল কালাম আজাদ ওরফে কালো কালাম জানান, তার ভাই প্রায় ৩০ বছর ধরে পুষ্পপাড়া গরুর হাটের ইজারাদার ছিলেন। তিনি কোরআনের হাফেজ ছিলেন এবং কয়েকবার হজ করেছেন। হাট থেকে পাওয়া আয়ের অধিকাংশই মসজিদ-মাদ্রাসায় দান করতেন।

 

তিনি বলেন, ‘জানি না কী কারণে আমার ভাই ও ভাগনেকে হত্যা করা হয়েছে। তবে হাটের দখল নিতে এই হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বলে ধারণা করছি। আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। কারা এ ঘটনায় জড়িত, তা নিশ্চিত হলে মামলা করব।’

 

ইজারা বিরোধ ও চরমপন্থিদের দ্বন্দ্ব সামনে রেখে তদন্ত

 

আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হাটের ইজারা ও পূর্বশত্রুতা থাকতে পারে। আমরা দুটি বিষয় গুরুত্ব দিয়েই তদন্ত করছি। তবে এখনও কোনো মামলা হয়নি। এলাকার পরিবেশ শান্ত আছে। নিরাপত্তার জন্য সেখানে পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।’

 

পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ বলেন, নিহত আব্দুস সালামের ভাই আবুল কালাম চরমপন্থি নেতা ছিলেন। হাটের ইজারা অথবা চরমপন্থিদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

 

নিহত দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও আলোচনা

 

নিহত দুজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। আব্দুস সালামের শ্রমিক লীগের পদে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ পাবনা জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ কুমার। তিনি বলেন, আব্দুস সালাম পাবনা সদর উপজেলা শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক ছিলেন।

 

তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আব্দুস সালামকে অন্য দলের নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে দেখা গেছে। তিনি স্থানীয়ভাবে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

 

অন্যদিকে, রিপন হোসেন আতাইকুলা ইউনিয়ন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি ছিলেন বলে জানিয়েছেন পাবনা জেলা জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আবদুল গফুর।

 

পাবনা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আনিছুল হক বাবু বলেন, রিপন দলের জন্য নিবেদিত ছিলেন। দুই-তিন দিন আগে পানিসম্পদমন্ত্রী এ্যানি ভাইয়ের একটি অনুষ্ঠানে তিনি উৎসাহ-উদ্দীপনার সঙ্গে অংশ নিয়েছিলেন। এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে তিনি দ্রুত হত্যাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

 

একই বাজারে ১২ বছর আগে চার খুন

একই বাজারে আবারও প্রকাশ্যে জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের কাছে পুষ্পপাড়া বাজার যেন পুরোনো এক আতঙ্কের নাম।

 

এর আগে ২০১৪ সালের ৩০ মে সন্ধ্যায় এই বাজারেই প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে চারজনকে হত্যা করেছিল দুর্বৃত্তরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, চাঞ্চল্যকর ওই হত্যাকাণ্ডের রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি।