ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোনো শ্রমিক নেই। তবে আছে তাদের জন্য একটি তহবিল। নাম ওয়ার্কার্স প্রফিট পার্টিসিপেশন ফান্ড (ডব্লিউপিপিএফ)। সেখানে শেয়ারহোল্ডারদের অর্থের সুদ থেকে প্রতি বছর ৫ শতাংশ করে জমা হয়। সেই টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির উচ্চ বেতন-ভাতার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। গত ছয় বছরে নির্বিঘ্নে তুলে নিয়েছেন ৩২ কোটি টাকার বেশি। এ ব্যাপারে রহস্যজনক ‘নীরব দর্শক’-এর ভূমিকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। তারা মুখে কুলুপ এঁটেছেন। কোনো মন্তব্য করবেন না। তবে এমন কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত ও অনৈতিক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য— এই অনিয়ম দ্রুত নিরসন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। কারণ ব্যাংক, বীমা, লিজিংসহ অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রমিক না থাকায় এ ধরনের ফান্ড গঠন করা হয় না।
সূত্র জানাচ্ছে, ডিএসইতে ৩৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারী উচ্চ বেতন-ভাতা পেলেও তারা পরিচালনব্যয় মেটানোর মতো আয় করতে পারছেন না। অথচ ১৩ বছর আগে অনেক স্বপ্ন নিয়ে অলাভজনক থেকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছিল ডিএসই। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফার বড় ভরসা হয়ে উঠেছে শেয়ারহোল্ডারদের অর্থের ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট (এফডিআর) এবং বন্ডে বিনিয়োগ থেকে পাওয়া সুদ। অর্থাৎ, মূল ব্যবসায় লোকসান থাকলেও এই সুদের ওপর ভর করেই মুনাফা হচ্ছে। আর সেখান থেকে একটি অংশ নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কিন্তু শেয়ারহোল্ডাররা পাচ্ছেন নামমাত্র লভ্যাংশ।
ডিএসইর সাবেক প্রেসিডেন্ট শাকিল রিজভী আগামীর সময়কে বলেছেন, শ্রমিক নেই বলে ব্যাংকগুলো ডব্লিউপিপিএফ গঠন করেনি। অথচ ডিএসই উচ্চ বেতনে রাখা কর্মকর্তাদের এই ফান্ড দেয়। সেটি আবার মূল ব্যবসায় কর্মকর্তারা মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার পরও। এটি যৌক্তিক নয়। অথচ ডিএসইর শেয়ারহোল্ডাররা দুরবস্থার মধ্যে রয়েছেন।
আর ডিএসইর এক পরিচালক বললেন, ডিএসইর কর্মকর্তারা উচ্চ বেতনে চাকরি করেন। তারা বিনা সুদে গাড়ি ও বাড়ির ঋণসুবিধা পান। এ ছাড়া ড্রাইভার, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা পান। এরপরও তারা ডব্লিউপিপিএফের নামে ৫ শতাংশ বাগিয়ে নিচ্ছেন। সেটি আবার শেয়ারহোল্ডারদের অর্থ থেকে আসা সুদজনিত আয়ের ওপর। অথচ যারা ডিএসইর মালিক, সেই শেয়ারহোল্ডার— তারা চরম আর্থিক সংকটে ভুগছেন। এমনকি কর্মী ছাঁটাই ছাড়াও কিছু ব্রোকারেজ হাউজ বন্ধ হয়ে গেছে অর্থ সংকটে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল বুধবার সকালে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলামের মোবাইল ফোনে কল দেওয়া হয়। রিং হলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে একই নম্বরে মন্তব্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। কিন্তু রাত ১০টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব দেননি। তবে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করবেন না বলে ডিএসইর এক পরিচালকের মাধ্যমে এই প্রতিবেদককে অবহিত করেছেন।
এদিকে একই দিন রাতে মোবাইল ফোনে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুজহাত আনোয়ার আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমি কোনো মন্তব্য করব না।’
ডিএসইর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ছয় অর্থবছরে ডব্লিউপিপিএফ ফান্ড গঠন করে ডিএসই থেকে ৩২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ২ দশমিক ৬৫ কোটি, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৭ দশমিক ৮৩ কোটি, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯ দশমিক শূন্য ২ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৩৫ কোটি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪ দশমিক শূন্য ৬ কোটি ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৪২ কোটি টাকা গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম আগামীর সময়কে বলেছেন, ডব্লিউপিপিএফ গঠন করতে হয় পরিচালন মুনাফা হলে। পরিচালন মুনাফা ছাড়া সুদের ওপর এই ফান্ড গঠন করা আইনের ব্যত্যয়। সুদ আয়ের ওপর তো কর্মকর্তাদের কোনো ভূমিকা নেই। অতএব সেটার ওপর ওই ফান্ড গঠন করে কর্মকর্তাদের নেওয়া ঠিক নয়। এটি স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারহোল্ডারদের ভাবা উচিত।
জানা গেছে, ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকার ডব্লিউপিপিএফ ফান্ড গঠন করা হলেও ওই অর্থবছরে স্টক এক্সচেঞ্জটির পরিচালন লোকসান হয় ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ওই অর্থবছরে ডিএসইর ১০১ কোটি ৩ লাখ টাকা পরিচালন আয়ের বিপরীতে ১৫০ কোটি ৪৬ লাখ টাকা পরিচালন ব্যয় হয়েছিল।
তবে প্রতিষ্ঠানটির ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিচালনের বাইরে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিল থেকে সুদ আয় হয় ৯৪ কোটি ১১ লাখ টাকা। শেয়ারহোল্ডারদের অর্থে অর্জিত ওই সুদ আয়ের ওপর কর্মকর্তাদের জন্য ডব্লিউপিপিএফ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৩ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অথচ ওই সুদ আয় করতে ডিএসইর ৫৭৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার এফডিআর ও ট্রেজারি বিলে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ডে ২৩৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
সবশেষে ডিএসইর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিট মুনাফা হয়েছে ৩১ কোটি ১৯ লাখ টাকা। এতে শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ১৭ পয়সা। তবে এফডিআর ও ট্রেজারি বন্ড-বিলে বিনিয়োগ করার মতো অর্থ না থাকলে, লোকসান গুনতে হতো ডিএসইকে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালের ২৮ এপ্রিল। পরে ১৯৯৮ সালে স্বয়ংক্রিয় লেনদেনের ব্যবস্থা চালু করে ডিএসই। এরপর ২০১৩ সালে এক্সচেঞ্জেস ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন প্রণয়নের পর ওই বছরের ২১ নভেম্বর ডিএসই ডিমিউচুয়ালাইজড স্টক এক্সচেঞ্জে রূপান্তরিত হয়। এর মাধ্যমে মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও লেনদেনের সদস্যপদ পৃথক করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হয়। পরে ২০১৮ সালে চীনের শেনজেন স্টক এক্সচেঞ্জ ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত হয়।
ডিএসইর পরিশোধিত মূলধন ১ হাজার ৮০৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। এই স্টক এক্সচেঞ্জটি এ পর্যন্ত সুদ আয় সত্ত্বেও মাত্র ৭৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা মুনাফা জমাতে (রিটেইন আর্নিংস) পেরেছে। মূলত কর্মকর্তাদের ব্যর্থতার কারণেই এমন নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের ব্যবসায় শেয়ারহোল্ডারদের ১ দশমিক ৭০ শতাংশ বা শেয়ারপ্রতি ১৭ পয়সা লভ্যাংশ দিয়েছে।