‘তোরে কী কইছি, তোরে কী কইছি। তোরে মাইরা ফালামু!’ পরিবারের সদস্যদের সামনে স্ত্রী জুমরাতুন নেসা বর্ষাকে (২৪) মারধরের সময় এ কথা বলছিলেন নাবিদ হোসেন। যন্ত্রণায় কাতর বর্ষার চিৎকার ও আর্তনাদে ঘরের পরিবেশ তখন ভারি হয়ে ওঠে। ছোটাছুটি করতে থাকেন তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজন। এর মধ্যে সেই বাড়ির একজনকে বর্ষা অনুরোধ করে বলতে থাকেন, ‘ভাইয়া, আমার আব্বুরে একটা ফোন দেন, প্লিজ।’ বারবার বাবাকে ফোন দেওয়ার আকুতি জানালে স্ত্রীকে আবার মারতে শুরু করেন নাবিদ।
ঘটনাটি গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের মণিপুরিপাড়ার ‘বি’ ব্লকের ১৩/বি নম্বর বাসায় সেই রাতে বর্ষা তাঁর মাকে নিজের মোবাইল ফোন থেকে ফেসবুক মেসেঞ্জার অ্যাপে ভিডিও কল করে বাঁচার আকুতি জানান। সেই কলে বাবার সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। মা-বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় ছোট বোন মেঘা দেখেন, বর্ষার গলা দিয়ে রক্ত ঝরছে।
ভিডিও কল থেকে বড় বোনের রক্তভেজা শরীরের একটি স্ক্রিনশট নিয়ে রাখেন মেঘা। এমন দৃশ্য দেখে মঙ্গলবার রাতে লালবাগের আতশি খান লেনের বাসা থেকে মণিপুরিপাড়ার দিকে রওনা হন বর্ষার বাবা শেখ মানোয়ার হোসেন মান্না। রাত সোয়া ১২টার দিকে তিনি নাবিদের বাড়ির সামনে পৌঁছে অ্যাম্বুলেন্সে নিথর বর্ষাকে দেখেন। শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দিকে বর্ষাকে নিয়ে রওনা হন শ্বশুরবাড়ির লোকজন। রাতে হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।
পুলিশ বলছে, বর্ষার গলা, পিঠে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক তদন্তে এটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা তাদের। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে–এ অভিযোগে তেজগাঁও থানায় মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় নাবিদকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
তেজগাঁও থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে নাবিদের পরিবারের লোকজন দাবি করেছেন, বর্ষা আত্মহত্যা করেছেন। মরদেহে আঘাতের চিহ্ন ও পারিপার্শ্বিক আরও কিছু আলামত দেখে মনে হচ্ছে, এটি হত্যা। কেউ আত্মহত্যা করলে গলায় যে ধরনের আঘাতের চিহ্ন থাকে, বর্ষায় গলার চিহ্ন তার থেকে ভিন্ন। যৌতুকের দাবিতে এর আগে তাঁর ওপর কয়েক দফা নির্যাতন চালানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদেন পেলে মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
বর্ষার চাচা জাকির হোসেন জানান, তেজগাঁও কলেজে পড়ার সময় বর্ষার সঙ্গে পরিচয় হয় মণিপুরিপাড়ার বাসিন্দা নাবিদের। এরপর তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বছরখানেক আগে দুই পরিবারের সম্মতিতে পারিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাদের। বিয়ের কয়েক মাস পর থেকে বর্ষাকে নির্যাতন করতে থাকেন নাবিদ। মেয়ের সুখের কথা চিন্তা করে নাবিদকে মোটরসাইকেল ছাড়াও কয়েক দফায় নগদ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর পরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি।
জাকির হোসেন জানান, কয়েক মাস আগে পিটিয়ে বর্ষাকে গুরুতর জখম করা হয়। মাথা, চোখসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গা ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তখন বর্ষার পরিবার বিবাহ বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্ষাকে তাঁর শ্বশুরবাড়ি থেকে লালবাগের বাসায় এনে রাখা হয়। তবে দুই সপ্তাহ আগে বর্ষার শাশুড়ি সেই বাসায় যান। তাঁর ছেলে আর নির্যাতন করবে না– এমন প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। এরপর বর্ষাকে মণিপুরিপাড়ার বাসায় নিয়ে আসা হয়।
বর্ষার চাচা বলেন, নাবিদ রোজগার তেমন কিছু করত না। বিয়ের পর আমরা জানতে পারি, সে নেশাগ্রস্ত। বাবার চারতলা বাড়ি রয়েছে। বাড়ি ভাড়ার টাকায় তাদের সংসার চলে। একই ফ্ল্যাটে মা-বাবা, ভাই ও স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন নাবিদ। মঙ্গলবার রাতে স্বামী মারধর শুরু করলে মা-বাবাকে ফোন করে বাঁচানোর আকুতি জানান বর্ষা। তবে বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই সব শেষ হয়ে গেছে।
বর্ষার স্বজনরা জানান, তাঁর বাবা পুরান ঢাকায় বাড়ি কেনাবেচার কাজ করেন। তিন বোনের মধ্যে বর্ষা মেজ। পুরান ঢাকায় নিজেদের বাড়িতে তাঁর মা-বাবা ও বোনেরা বসবাস করেন। ময়নাতদন্ত শেষে আজিমপুর কবরস্থানে গতকাল বর্ষার মরদেহ দাফন করা হয়।
পুলিশে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর কল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের অভিযোগে কল এসেছিল ১৮ হাজার ৬২৬টি। ২০২৪ সালে অভিযোগ আসে ২৩ হাজার ৩৩টি। এর মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ ছিল ১১ হাজার ৪১৮টি। ২০২৩ সালে ২৬ হাজার ৭৯৮টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৯ হাজার ৯১৩টি। ২০২২ সালে ২১ হাজার ৭১২টি কলের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল ৬ হাজার ৫৬০টি। ২০২১ সালে ১২ হাজার ১৬৯টি অভিযোগের মধ্যে স্বামীর বিরুদ্ধে ছিল ৩ হাজার ৩৪৮টি।