Image description

বিদেশ সফরের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও শ্রমবাজারকে প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া, চীন সফর থেকে জাপান পর্যন্ত একই কৌশল অনুসরণ করছেন তিনি। বিদেশ সফরে দেশ বাছাইয়ে কোন বিষয়কে প্রাধান্য দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—তার স্পষ্ট চিত্র মিলেছে তার প্রথম দুটি রাষ্ট্রীয় সফর এবং চলমান জাপান সফরের পরিকল্পনায়। এক এক করে দেশ নির্বাচন করছেন তার সফরের জন্য। তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন মূলত অর্থনৈতিক কূটনীতিকে।    

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ থেকে ২৬ জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এটি ছিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তার প্রথম বিদেশ সফর। পরিকল্পনা অনুযায়ী তিনি ২১ জুন কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করেন এবং সেখান থেকে ২২ জুন বিকালে চীনের উদ্দেশে রওনা হন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের বিদেশ সফরের দেশ নির্বাচনে মূলনীতি হিসেবে কাজ করছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বা বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি।

২০২৬ সালের জুনে তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়ার মধ্য দিয়ে এই নীতির প্রতিফলন দেখা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, দিল্লি বা বেইজিংয়ের বাইনারি সমীকরণে না গিয়ে একটি বাস্তববাদী ও প্র্যাগমেটিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছেন তিনি।

কেন প্রথমেই মালয়েশিয়া সফর

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-চীন বা আমেরিকা-চীন বাইনারিতে না জড়িয়ে একটি বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি দেখাতেই মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই করা হয়েছে। এটি দিল্লি বা বেইজিংয়ের পরিবর্তে তৃতীয় একটি দেশকে বেছে নিয়ে আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বিশেষ সতর্কতা ও ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মালয়েশিয়া সফরে যা প্রাধান্য পেয়েছিল

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, মালয়েশিয়া সফরের প্রথম পর্যায়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি এবং শ্রমবাজার সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, পেশাজীবী নিয়োগ, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।

এছাড়া আসিয়ানের ‘সেক্টোরাল ডায়ালগ পার্টনার’ হওয়ার আবেদন এবং আরসিইপি-তে বাংলাদেশের যোগদানের আকাঙ্ক্ষা—এই সফরে জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়াসহ আসিয়ান সদস্য দেশগুলো যাতে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, সে বিষয়েও আহ্বান জানানোর কথা জানিয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

চীন সফরে প্রাধান্য পেয়েছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে

দুই দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষে চার দিনের জন্য চীন যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে তিনি দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দেন। মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি চীন যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি বার্তা দেন, বাংলাদেশ আরসিইপির মতো বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য জোটে যোগ দিতে আগ্রহী। এছাড়া কৌশলগত সম্পর্কের উন্নতি ছাড়াও মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ১৩টি এবং বিডা-সহ মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে—যার মধ্যে বাণিজ্য-বিনিয়োগ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা তথা তিস্তা প্রকল্পে চীনের সক্ষমতা অনুযায়ী সহায়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাই দ্রুত করার সম্মতি, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভে যোগদান, প্রতিরক্ষা-কূটনীতিতে 2+2 সংলাপ, এবং চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর নিয়ে আলোচনা রয়েছে। বাস্তব অর্জন হিসেবে মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণে ৩৩৫.৭৮ মিলিয়ন ডলারের রেয়াতি ঋণ চুক্তি, চট্টগ্রামে চীন অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলের ভিত্তিপ্রস্তর, শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা সম্প্রসারণ এবং আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রতিশ্রুত ২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ/ঋণ/অনুদানের ধারাবাহিকতায় নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত হয়েছে।

তৃতীয় সফর জাপানেও একই ধারাবাহিকতা

একই কৌশলের ধারাবাহিকতায় দায়িত্ব নেওয়ার পর তৃতীয় বিদেশ সফর হিসেবে জাপানকে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে জাপানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

জাপান সফরেও জ্বালানি, জনশক্তি রফতানি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় ৩৫ মিটারের টহল জাহাজ অনুদান চুক্তি সই হয়েছে কোস্টগার্ডের জন্য, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তি কার্যকর হয়েছে, বিগ-বি উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ হিসেবে উন্নীত করা হয়েছে এবং আগামী ৫ বছরে ১ লাখ কোটি ইয়েন (৬.৬ বিলিয়ন ডলার) বেসরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশা করা হয়েছে। 

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া থেকে শ্রমবাজার, চীন থেকে বাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার কূটনীতি এবং জাপান থেকে বিনিয়োগ—এই তিনটি স্তম্ভকে সামনে রেখেই তারেক রহমান তার বিদেশ সফরের দিক নির্ধারণ করছেন। দেশ নির্বাচনে তিনি যেসব বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার মধ্যে প্রথমেই আছে অর্থনৈতিক কূটনীতি ও কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণ। তার প্রথম সফরের মূল লক্ষ্য ছিল—বাণিজ্য, শ্রম সহযোগিতা, বিনিয়োগ এবং বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্বে জোর দেওয়া। একে বলা হচ্ছে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতি’ এবং কৌশলগত বৈচিত্র্যকরণকে প্রাধান্য দেওয়া।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য ছিল শ্রমবাজার ও প্রবাসী কল্যাণ। মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, শ্রমবাজারের সুযোগ সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত সহযোগিতা গভীর করা। মালয়েশিয়া হচ্ছে বাংলাদেশি কর্মীদের অন্যতম বড় গন্তব্য। তাই নতুন কর্মী নিয়োগ, দক্ষ পেশাজীবীদের সুযোগ এবং প্রবাসীদের কল্যাণ নিশ্চিত করাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা হয়। 

তৃতীয় প্রাধান্য ছিল বাণিজ্য-বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। আলোচনায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, সেমিকন্ডাক্টর, হালাল অর্থনীতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগের মতো বিষয়গুলো ছিল। চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের গুরুত্বপূর্ণ উৎস, যা দেশের যুব কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জরুরি বলে দেখা হচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির এই অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছেন,‘‘আমরা জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত সরকার। আমাদের অগ্রাধিকার জাতীয় স্বার্থ। আমরা অন্যের নির্দেশে নয়, নিজেদের অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কোথায় সফর করবো, তা নির্ধারণ করবো।’’

জাপানের পর তুরস্ক যাওয়ার নেপথ্যে রয়েছে ‘জলবায়ু অর্থনীতি’। তুরস্কের আন্তালিয়ায় আসন্ন জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে কপ-৩১ নিয়ে মতবিনিময় হয়, যার মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়টিও ছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কপ সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে মিলিত হতে পারেন তারেক রহমান। বৈঠকে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে প্রতিরক্ষা শিল্প পার্কে তুরস্কের বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিরক্ষা শিল্প পার্কে বিনিয়োগ করা হলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

কূটনৈতিক সূত্রমতে, তুরস্কের পর প্রধানমন্ত্রীর সফর হতে পারে সৌদি আরবে। সৌদি আরব সফরও জ্বালানি, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে নির্ধারণ করা হচ্ছে। এছাড়া আলোচনায় আছে ভারত ও পাকিস্তান সফরও।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের ক্ষেত্রে দেশ নির্বাচন নিয়ে সাবেক একজন কূটনীতিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘কোনও দেশের সাথে সম্পর্ক কেবল রাজনৈতিক বা আবেগের খাতিরে না করে, সেই দেশ থেকে বাংলাদেশের কী কী বাস্তব সুবিধা বা প্রয়োজন মিটবে—তা বিবেচনা করাই একটি পরিপক্ব ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির লক্ষণ।’’