পিরোজপুরে মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফন ও রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি উত্তেজনা তৈরি হয়। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতের সাবেক নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন মানিক পশারী। তাঁর মৃত্যুর পর গার্ড অব অনার প্রদান ও নিজ এলাকায় দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। পরিবারের অভিযোগ, নানা জটিলতার পর পুলিশি নিরাপত্তায় মৃত্যুর প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। তবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
মরদেহ দাফন, জানাজা ও কবর ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ, বাধা ও হামলার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। গত দেড় দশকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সংগঠনকে ঘিরে এমন নানা ঘটনা ঘটেছে। বেঙ্গল লেন্সের পর্যালোচনায় দেখা যায় সবচেয়ে বেশি কবরে বাধা, জানাযায় সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এসব ঘটনার কয়েকটিতে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সরাসরি বাধা, হামলা কিংবা বিক্ষোভের অভিযোগ রয়েছে। আবার কোনো কোনো ঘটনায় পুলিশি বাধা, মরদেহ হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা এবং পরিবারের সদস্যদের জানাজায় অংশ নিতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
ফাঁসির পর কাদের মোল্লার স্বজনদের জানাজায় অংশ নিতে না দেয়া
২০১৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের পর তাঁর দুই ছেলেসহ পরিবারের ১১ সদস্যকে আটক করে পুলিশ। ওইদিন রাত পৌনে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে, যার কারণে পরিবারের সদস্যরা কাদের মোল্লার জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। জানা যায়, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর এবং লাশ গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে পাঠানোর খবর শুনে তাঁর পরিবারের সদস্যরা গ্রামের বাড়ি যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন ক্যাডার মগবাজারে আব্দুল কাদের মোল্লার বাড়িতে আসেন এবং পরিবারের সদস্যদের মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে সেখানে পুলিশ আসে এবং ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডারদের সরিয়ে দিয়ে পরিবারের ১১ সদস্যকে আটক করে নিয়ে যায়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে কাদের মোল্লার দুই ছেলে হাসান জামিল ও হাসান মওদূদসহ তাঁর মেয়ের জামাই ছিলো।
পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে নিতে বাধা
২০১৪ সালের অক্টোবরে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিয়াস করিমের মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়। পিয়াস করিমকে ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তাঁর মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করার ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ ছাত্রলীগসহ (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সাতটি ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। এ লক্ষ্যে ১৭ অক্টোবর সকালে শহীদ মিনারে অবস্থান নেয় কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তাঁদের মধ্যে ছাত্রলীগ, গণজাগরণ মঞ্চের একাংশসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীরা ছিলেন। তাঁরা পিয়াস করিমের মরদেহ শহীদ মিনারে আনার উদ্যোগের প্রতিবাদে সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন। এদিকে মরদেহ শহীদ মিনারে নেওয়ার অনুমতি চেয়ে তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমেনা মহসীন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করলেও অনুমতি মেলেনি। পরে পরিবার শহীদ মিনারে মরদেহ নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
গোলাম আযমের জানাজায় বাধা, মরদেহবাহী গাড়িতে জুতা নিক্ষেপ
২০১৪ সালের ২৫ অক্টোবর জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় বিক্ষোভ ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানবতাবিরোধী অপরাধে ৯০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত গোলাম আযম ২৩ অক্টোবর রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
পরে ২৫ অক্টোবর দুপুরে মগবাজারের বাসা থেকে তাঁর মরদেহ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে নেওয়ার পথে আওয়ামী সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করেন। তাঁরা জাতীয় মসজিদে তাঁর জানাজা হতে দেওয়ার বিরোধিতা করেন এবং মরদেহবাহী গাড়ি আটকে দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে গাড়ির দিকে জুতা নিক্ষেপ করা হয়। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে বাংলাদেশ অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ফোরাম, গণজাগরণ মঞ্চ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা ছিলেন। পুলিশ তাঁদের পল্টন এলাকায় বাধা দিলে ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। জানাজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে পল্টন থেকে দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত সড়কে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
কামারুজ্জামানের জানাজা ও লাশ দাফনে বাধা
২০১৫ সালের ১২ এপ্রিল জামায়াত নেতা কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের পর শেরপুরে তাঁর লাশ দাফনে বাধা দেয় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা; মুক্তিযোদ্ধা ব্যানারে তাঁরা মানববন্ধন করে জেলা পরিষদে স্মারকলিপি দেয়। যুবলীগ নেতা ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ইউনিট কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু তখন গণমাধ্যম কে জানায়, শেরপুরের মাটিতে এই দাফন তাঁরা চান না এবং মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকে নকলা, নালিতাবাড়ীসহ শেরপুরে প্রবেশের চারটি পথে মুক্তিযোদ্ধারা অবস্থান নেবেন। কোন ভাবেই কামরুজ্জামানের লাশ তারা শেরপুরে দাফন করতে দিবেন না। তবে পরে জেলা প্রশাসনের অনুরোধে তাঁরা দাফন প্রতিরোধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন।
মৃত্যুর পর কামারুজ্জামানের জন্মভূমি বাজিতখিলা ইউনিয়নজুড়ে রাতভর শত শত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন ছিলো। জামায়াতের অভিযোগ, রাত তিনটার দিকে হ্যান্ডমাইকে জানাজার জন্য আসা লোকজনকে সসম্মানে চলে যেতে বলা হয়, তাঁরা যেতে না চাইলে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিপেটা শুরু করলে অনেকে দৌড়ে পাশের ধানের চাতালে আশ্রয় নেন; রাত সোয়া চারটার দিকে কফিন এতিমখানা চত্বরে পৌঁছালে নিকটাত্মীয় ও কিছু গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে নামাজে জানাজা হয় এবং সকাল ৫টা ৪০ মিনিটে উপস্থিত জনতার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বাধা দেয় ও মাঝখানে ব্যারিকেড থাকায় মাঠের পূর্ব অংশের অর্ধেক মানুষ জানাজায় শরিক হতে পারেননি। মাত্র শতাধিক মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণের সুযোগ পান।
সাকা চৌধুরীর লাশের গোসল ও দাফনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা, পরে হামলা কবরেও
২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর দিবাগত রাতে মানবতাবিরোধী অপরাধে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর (সাকা চৌধুরী) ফাঁসি কার্যকরের পর সকালে র্যাব, বিজিবি ও পুলিশের কঠোর নিরাপত্তায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে চট্টগ্রামের রাউজানের গহিরায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
এ সময় পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ পুনরায় গোসল করানোর জন্যে জোরাজুরি করলে পুলিশ লাশ বাসার সামনে নেওয়ার অনুমতি দেয়, তবে সেখানে অবস্থান করতে না দিয়ে সোজা মসজিদের সামনে নিয়ে গিয়ে দ্রুত জানাজা শেষ করতে বাধ্য করা হয়।
স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আগে দাফন প্রতিরোধের ঘোষণা দিলেও শেষ পর্যন্ত দাফনের সময় বড় ধরনের কোনো সংঘাত ঘটেনি, তবে দাফনের পর তাঁরা গহিরা বাজারে অবস্থান নিয়ে জানাজায় অংশ নেওয়া লোকজনকে হেনস্তা করেন।
৩ বছর পর ২০১৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বিকেল সোয়া ৪টার দিকে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা রাউজানে সালাউদ্দিন কাদেরের কবরে হামলা চালিয়ে কবরের নামফলক অপসারণ করে। সেসময় গোলাম রাব্বানী তার ফেসবুক আইডিতে নামফলক অপসারণের ভিডিও শেয়ার করে লিখেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, মানবতাবিরোধী অপরাধে প্রমাণিত, ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর কবরের ফলকে নামের পূর্বে লেখা ছিল ‘শহীদ’; বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আজ সেই লজ্জায় প্রলেপ দিয়েছে।’
রাজাকার কমান্ডার এস এম আমিন উদ্দীনের জানাজায় বাধা
২০১৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি কেশবপুরের এস এম আমিন উদ্দীনের জানাজা শহরের পাবলিক ময়দানে হতে দেননি মুক্তিযোদ্ধাসহ এলাকার আওয়ামীপন্থী সংগঠনগুলো। বাধার মুখে তাঁর সাহাপাড়ার বাড়ির পাশের কবরস্থানে জানাজা পড়িয়ে সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। রাজাকার কমান্ডার এস এম আমিন উদ্দীন ঢাকায় মারা গেলে তাঁর জানাজা কেশবপুর পাবলিক ময়দানে পরদিন জুমার নামাজের পর হবে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে রাতে মাইকিং করা হয়। এ ঘোষণার পর মুক্তিযোদ্ধাসহ কেশবপুরের আওয়ামীপন্থী সংগঠনগুলো ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়ে প্রশাসনের কাছে ওই মাঠে জানাজা না করার দাবি জানায়। পরে তাদের বাধার মুখে জানাযা বাড়ির পাশে করতে বাধ্য হয় পরিবার।
যুবদল নেতার কবরের ওপর আওয়ামী লীগের লাঠিপেটা
২০১৮ সালের ১৪ এপ্রিল পাবনার ফরিদপুর উপজেলার সাভার গ্রামের একটি কবরস্থানে যুবদলের সাবেক নেতা সাইফুল ইসলাম লিটনের কবরের ওপর লাঠিপেটা এবং তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের কবরের নামফলক অপসারণের অভিযোগ ওঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার বিরুদ্ধে। কবরস্থান পরিষ্কারের নামে লিটনের কবরসহ তাঁর পরিবারের সদস্যদের কবর থেকে নামফলক ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয়। কবরের বাঁশের ঘেরা ও সিমেন্টের খুঁটিও উপড়ে ফেলা হয়। লিটন ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি নিজ বাড়ির কাছে তাঁর মেয়ের সামনে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নিহত হন। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, হত্যার আসামিরা স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতার ইন্ধনে কবরস্থানে এ ঘটনা ঘটায়।
শহীদ মিনার যাওয়া হয়নি আল মাহমুদের, নিজ গ্রামে সমাধি
কবি আল মাহমুদের জানাযা শহীদ মিনার প্রাঙ্গনে হতে দেয়নি তৎকালীন আওয়ামি সরকার। মৃত্যুর পর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে সর্বস্তরের মানুষ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আল মাহমুদের মরদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মৌড়াইলের উদ্দ্যেশে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই মাহমুদকে সমাহিত করা হয়। শ্রদ্ধা জানানোর এই অনুষ্ঠানটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে করার ইচ্ছা থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন কবির পরিবারের সদস্যরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল সমাধি কিংবা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের অনুমতি চেয়েও তা পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামে জামায়াত নেতার জানাজায় ছাত্রলীগের হামলা
২০১৯ সালের ২৩ জুন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা মুমিনুল হক চৌধুরীর জানাজায় হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে জানাজায় অংশ নেওয়া এক শিক্ষানবিশ আইনজীবীসহ পাঁচজন আহত হন। এদিন শনিবার বাদ জোহর নগরীর চট্টগ্রাম কলেজ মাঠে (প্যারেড মাঠ) বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানা গেছে, মুমিনুল হকের জানাজায় শরিক হতে সাধারণ মানুষ ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা বেলা দেড়টার দিকে প্যারেড মাঠে জড়ো হন। জানাজা শুরুর আগমুহূর্তে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে ছাত্রলীগের একটি মিছিল নিয়ে জানাজার দিকে এগোতে থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় জানাজায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লিদের লক্ষ্য করে ছাত্রলীগ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এ সময় জানাজায় অংশগ্রহণকারীরাও পাল্টা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এতে শিক্ষানবিশ আইনজীবী মোহাম্মদ জোবায়েরসহ পাঁচজন আহত হন।
সেনা কর্মকর্তা মাজেদের কবরে জুতা ও ঝাড়ু প্রদর্শন
২০২০ সালের ১২ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল মাজেদের মরদেহ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার শম্ভুপুরা ইউনিয়নের হোসেনপুরে তাঁর শ্বশুরবাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে গোপনে দাফন করা হয়। সকালে দাফনের খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ জানান। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে জারি করা লকডাউনের মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হয়ে মিছিল করেন। একপর্যায়ে মাজেদের কবরে জুতা, লাঠি ও ঝাড়ু প্রদর্শন করেন তাঁরা। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিএনপি কর্মীর জানাজার জন্য লাশ দেয়নি পুলিশ
২০২৩ সালের ১৮ জুলাই লক্ষ্মীপুরে বিএনপির পদযাত্রা কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে কৃষক দলের কর্মী মো. সজীব হোসেন নিহত হন। পরদিন বুধবার দুপুরে পুলিশ ও র্যাবের পাঁচ থেকে ছয়টি গাড়ির পাহারায় লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, পুলিশ মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর না করায় তাঁরা শহরে জানাজার আয়োজন করতে পারেননি। কেন্দ্রীয় বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কৃষক দলের কর্মী সজীবের জানাজার জন্য শহরে পূর্বপ্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তাঁর লাশ হাসপাতাল থেকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাই দ্রুত গ্রামের বাড়িতে লাশ পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।
সাঈদীর মৃত্যুর পর সারাদেশে গায়েবানা জানাজায় হামলা, একজনের মৃত্যু
২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর তাঁর জানাজা ও দাফনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে গায়েবানা জানাজা পড়তে আসা লোকজনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ১৫ আগস্ট রাজধানীর শাহবাগ ও বায়তুল মোকাররম এলাকায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। চট্টগ্রামের দামপাড়া জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ এলাকায় গায়েবানা জানাজাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে এবং পুলিশ লাঠিপেটা করে। এ সময় জানাজায় আগত জামায়াত-শিবিরের ৩০ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। কক্সবাজারের চকরিয়ায় গায়েবানা জানাজায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হলে ফোরকানুল ইসলাম (৬০) নামে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। এ ছাড়া সারাদেশে গায়েবানা জানাজায় বাধা দেওয়া, হামলা ও আটকের ঘটনা ঘটে।
চট্টগ্রামে জাসদের প্রয়াত সংসদ সদস্যের কবরে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সাবেক কার্যকরী সভাপতি ও সংসদ সদস্য মইন উদ্দীন খান বাদলের কবরে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এদিন বেলা দুইটার দিকে চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলীর গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনা লিখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন তাঁর স্ত্রী সেলিনা খান। পাশাপাশি তিনি থানায় অভিযোগ করেন।
রাজবাড়ীতে কবর থেকে মৃতদেহ তুলে আগুনে পোড়ানো
২০২৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে 'তৌহিদি জনতা' পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে 'নুরাল পাগলা' এর কবর, বাড়ি ও দরবার শরিফে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এমনকি মরদেহ কবর থেকে তুলে মহাসড়কের পদ্মার মোড় এলাকায় নিয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে হামলাকারীরা। হামলার এই ঘটনায় আহতদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয় পুলিশ নিশ্চিত করেছে।