Image description

দলীয় মিছিলে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেবে কিনা, তা নিয়ে দুই মত দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতে (সিপিবি)। এক অংশ বলছেন, মুক্তিযুদ্ধের এই স্লোগান আগেও দিতেন। অন্য অংশ বলছেন, এই স্লোগান এখন প্রাসঙ্গিক নয়। এই প্রশ্নে পক্ষে-বিপক্ষে সোশ্যাল মিডিয়ায় মতামত জানাচ্ছেন দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

স্বাধীনতার পর দলীয় কর্মসূচিতে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন, যিনি ১৯৮৩ সাল থেকে দলটিতে যুক্ত।

সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট পার্টি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে। তবে ১৯৭২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সিপিবি দলীয় কোনো কর্মসূচি বা সমাবেশে এ স্লোগান দেয়নি।’

‘জয় বাংলা’ স্লোগান ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ বিভিন্ন অপকর্ম করেছে এমন দাবি করেন তিনি।
কেউ এ স্লোগান দিলেই তার ওপর হামলা চালানো, গণপিটুনি দেওয়া কিংবা কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে আক্রমণ করা গ্রহণযোগ্য নয়, মনে করেন তিনি।

ক্বাফী রতনের পোস্টের মন্তব্যের ঘরেই ভিন্ন মত দেন দলটির কেন্দ্রীয় সদস্য মিহির ঘোষ।

তিনি লেখেন, দলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক উপদেষ্টা মনজুরুল আহসান খান বিভিন্ন সমাবেশ ও আলোচনা সভায় বক্তব্যের শেষে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দিয়েছেন। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনেও সিপিবির নেতাকর্মীরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে।

এ নিয়ে ক্বাফী রতন আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এরশাদবিরোধী আন্দোলনসহ দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সিপিবির কোনো মিছিল বা কর্মসূচিতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দেখিনি। গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনে এই স্লোগান দেওয়া হয়েছিল। তবে সেটি ছিল নির্দলীয় আন্দোলন। সিপিবি দলীয় ব্যানার নিয়ে সেখানে অংশ নেয়নি। এখন কেউ কেউ দাবি করছেন, সিপিবি অসংখ্যবার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়েছে। আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাদের এই বক্তব্যের মিল নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ‘জয় বাংলার’ সঙ্গে ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান যুক্ত করেছে। ফলে অনেকের কাছে এখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানটি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে আওয়ামী লীগের শাসনামলে মানুষের ওপর দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতাও এই ধারণাকে প্রভাবিত করেছে।’

এমন পরিস্থিতিতে কমিউনিস্টদের উচিত নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট করা, আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে পুনরায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করা নয়, মন্তব্য করেন তিনি।

ক্বাফী রতনের ভাষ্য, যারা এখন ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছেন, তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতিকে আবার প্রাসঙ্গিক করে তোলার পথ সুগম করছেন বলে তিনি মনে করেন।

জয় বাংলার ইতিহাস তুলে ধরে সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান আগামীর সময়কে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আগে অসহযোগ আন্দোলনের সময় ‘জয় বাংলা’ স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এ স্লোগান দিতেন। তবে তখন কমিউনিস্ট পার্টির কেউ কেউ ‘জয় বাংলার পরিবর্তে ‘জয় সর্বহারা’ স্লোগান দিতেন।’

মনজুরুলের ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় দলের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি।

‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি আপত্তি করেছি। আমি বলেছি, জয় সর্বহারা আমরা দেব, কিন্তু জয় বাংলা দেওয়া হোক। কিন্তু কেউ রাজি হয়নি।’

এই বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পরও কমিউনিস্ট পার্টির কর্মসূচিতে নিয়মিত ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া হতো না। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে স্লোগানটি দেওয়া বন্ধ করেননি।

‘এটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহাধ্বনি। এই ধ্বনি দিয়ে আমরা যুদ্ধ করেছি। এই ধ্বনি দিতে গিয়ে আমাদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। আমি এই স্লোগান কোনো দিন বাদ দেব না।’

 

মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান জয় বাংলাকে দলীয় স্লোগান হিসেবে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আওয়ামী লীগের কার্যক্রম রয়েছে নিষিদ্ধ। এরপর জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মিছিলে নেমে গ্রেপ্তার হয়েছেন ও হচ্ছেন দলটির বহু নেতাকর্মী।

গত সোমবার ঢাকায় সংস্কৃতিকর্মীদের এক কর্মসূচিতে জয় বাংলা স্লোগান দেওয়া নিয়ে পুলিশের সঙ্গে বাদানুবাদের পর আটক হয়েছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীল। তরপরই সিপিবি পরিমণ্ডলে জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে নানা মতপ্রার্থক্য চলছে।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে স্লোগানটির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ যেমন আওয়ামী লীগের একক সম্পত্তি নয়, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের স্লোগানও কোনো একটি দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না। এটা দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পত্তি, জনগণের সম্পত্তি এবং শহীদদের সম্পত্তি। এটা আমরা রক্ষা করব।’

সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে জয় বাংলা স্লোগানের কোনো বিরোধ আছে কিনা? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোনো বিরোধ নাই।’ কিন্তু আওয়ামী লীগ বিরোধিতার মনোভাব থেকে কেউ কেউ বিরোধিতা করে থাকেন।

আওয়ামী লীগ আবার রাজনৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে কি না, সে প্রসঙ্গে মনজুরুল আহসান খান বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাস যতদিন থাকবে, আওয়ামী লীগও ততদিন ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে। দলটির ভুল-ত্রুটির পাশাপাশি সাফল্যের কথাও মানুষ স্মরণ করবে। কোনো রাজনৈতিক দল কখনো প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে, আবার কখনো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব হারায়। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও এমন পরিবর্তন ঘটেছে। ভবিষ্যতে দলটির অবস্থান কী হবে, তা সময়ই বলে দেবে।

কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামনে এলো বিতর্ক?

‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে সিপিবির ভেতরের মতপার্থক্য নতুন করে সামনে আসে গত সোমবার (২৬ অক্টোবর)। ওই দিন সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে রাজধানীর ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মানববন্ধনের কর্মসূচি নেওয়া হয়।

‘প্রতিবাদী শিল্পী জনতা’র ব্যানারে আয়োজিত ওই কর্মসূচিতে সংস্কৃতিকর্মী, ছাত্র ইউনিয়ন ও সিপিবির নেতাকর্মীরা অংশ নিতে যান। তবে সেখানে পুলিশ বাধা দেয়-দাবি আয়োজকদের।

এ সময় ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

দীপক শীলের মুক্তির পর রাতে সিপিবির নেতাকর্মীরা তাকে সঙ্গে নিয়ে পুরানা পল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তি ভবনের সামনে থেকে একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি পল্টন মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দেওয়া হয় বলে সিপিবির নেতাকর্মীরা জানান।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সময় যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানান। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। পরে সিপিবির দুজন নেতাকর্মীকে মারধর করার অভিযোগ ওঠে। প্রায় ঘণ্টাব্যাপী অবরুদ্ধ করে রাখা হয় দলটির কার্যালয়।