Image description

ফিলিস্তিনের গাজার বাতাসে বারুদের গন্ধ। চারদিকে ধ্বংসস্তূপ, তার মাঝেই শোকার্ত মানুষের কান্না। একসময় সাজানো-গোছানো শহরটি আজ যুদ্ধের ভয়াবহতায় ক্ষতবিক্ষত। ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেছে মানবিক বিপর্যয়ের নির্মম চিত্র।

 

কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতি কি শুধু ভেঙে পড়া বাড়িঘর, প্রাণহানি আর আহত মানুষের যন্ত্রণায় সীমাবদ্ধ? যুদ্ধ থেমে গেলেও মানুষের মনের ভেতরে যে লড়াই চলতে থাকে, তার খবর কতটা রাখা হয়?

শুধু গাজা নয়, জেনেভা একাডেমির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ১১৪টিরও বেশি সশস্ত্র সংঘাত চলছে। এসব সংঘাতের ক্ষত শুধু ধ্বংসস্তূপ, আহত মানুষের আর্তনাদ কিংবা প্রাণহানির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও অনেকের জীবনে থেকে যায় আতঙ্ক, প্রিয়জন হারানোর শোক আর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার স্মৃতি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই মানসিক ক্ষত বয়ে বেড়াতে হয় বছরের পর বছর।

 

যুদ্ধাক্রান্ত মানুষের মধ্যে যেসব মানসিক পরিবর্তন আসতে পারে

 

যুদ্ধের কারণে মানুষের মধ্যে নানা ধরনের মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি), উদ্বেগ ও বিষণ্নতা। জীবনহানির আশঙ্কা তৈরি করে এমন ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করা কিংবা তার শিকার হওয়ার পর কারও কারও মধ্যে পিটিএসডি দেখা দিতে পারে। তাঁরা বারবার সেই ঘটনার স্মৃতি ফিরে আসতে দেখেন, দুঃস্বপ্নে ভোগেন কিংবা সব সময় মনে করেন, আবারও কোনো বিপদ ঘটতে যাচ্ছে। কারও কারও আচরণেও এমন পরিবর্তন আসে, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তোলে।

 

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর এক বছর পর ফিলিস্তিনি সাধারণ মানুষের মানসিক অবস্থা পরীক্ষা করা হয়। এতে অংশ নেওয়া ৪০৫ জনের মধ্যে ৮৫ শতাংশ পিটিএসডির মানদণ্ড পূরণ করেন। একই গবেষণায় ৭২ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে বিষণ্নতা এবং ৬৫ শতাংশের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের লক্ষণ পাওয়া যায়।

 

শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবীর কথা সব বিশ্বনেতারাই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেকক্ষেত্রেই বিপরীত। স্ট্রিম কোলাজ
শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবীর কথা সব বিশ্বনেতারাই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেকক্ষেত্রেই বিপরীত। স্ট্রিম কোলাজ

ইউক্রেনের পরিস্থিতিও একই রকম উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, দেশটির প্রতি ছয়জন সাধারণ মানুষের মধ্যে একজন পিটিএসডিতে আক্রান্ত হওয়ার মানদণ্ড পূরণ করেন। তাঁদের ৮৮ শতাংশের ঘুমের মানও ভাল ছিল না। কারণ রাতে বারবার ড্রোন ও রকেট হামলা হওয়ায় অনেক মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে রাত কাটাতে হয়। ফলে স্বাভাবিক ঘুমের সুযোগও কমে যায়।

 

ঘুমের সমস্যা ও মানসিক আঘাত একে অপরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। ভয়াবহ স্মৃতি ও দুঃস্বপ্নে ঘুম ভেঙে যায়। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে উঠতে পারে, কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়। পরদিনের স্বাভাবিক কাজ সামলানোর শক্তিও কমে যেতে পারে। এভাবে যুদ্ধের আতঙ্ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবিত করতে পারে।

 

যুদ্ধের ক্ষত এক প্রজন্মে থামে না

 

শিশুদের জন্য নিরাপদ পৃথিবীর কথা সব বিশ্বনেতারাই বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা অনেকক্ষেত্রেই বিপরীত।

 

যুদ্ধের মধ্যে সাধারণ মানুষের চেয়ে শিশুদের অবস্থা হয় আরও উদ্বেগজনক। যে বয়সে তাদের পরিবারের ভালবাসায় নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলার কথা, সেই বয়সেই অনেক শিশুকে দেখতে হচ্ছে স্বজনদের মৃত্যু, ধ্বংসযজ্ঞ। মৃত্যুঝুঁইকি নিয়ে চরম ভোগান্তিতে দিন কাটাতে হয় তাদের। এমন অভিজ্ঞতা শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি স্বাভাবিক বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব তাদের মধ্যে রাগ বাড়িয়ে দিতে পারে বা মেজাজ খিটখিটে করে তুলতে পারে। শুধু তাই নয়, য়েসব শিশুদের অন্য শিশুদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের অবস্থা হয় আরও উদ্বেগজনক। সংগৃহীত ছবি
যুদ্ধের মধ্যে শিশুদের অবস্থা হয় আরও উদ্বেগজনক। সংগৃহীত ছবি

যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার ৪৯২ জন শিশুকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৬০ শতাংশ শিশুর মধ্যে অন্তত একটি মানসিক সমস্যার সম্ভাব্য লক্ষণ ছিল। সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে পিটিএসডি। এরপর ছিল বিষণ্নতা ও উদ্বেগ। এই গবেষণা দেখায়, যুদ্ধের প্রভাব শুধু সেই মুহূর্তের ভয় বা কষ্টে থেমে থাকে না; শিশুদের বড় হয়ে ওঠার পথেও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। জাতিসংঘের তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালে জানায়, যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে বেড়ে ওঠা ফিলিস্তিনি শিশুদের মানসিক ক্ষত কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

 

যুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি বা আঘাত কখনো কখনো এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। একে বলা হয় ‘ইন্টারজেনারেশনাল ট্রমা’। অর্থাৎ কোনো প্রজন্মের ভয়, শোক ও কষ্ট সামলানোর ধরন পরবর্তী প্রজন্মের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। হলোদোমর দুর্ভিক্ষ ও হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়া পরিবারগুলোর ওপর করা গবেষণায় এমন প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। আরও বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ ধরনের প্রভাব দেখা গেছে।

 

পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের এই সহযোগিতা যুদ্ধের ধকল কিছুটা সামলাতে সাহায্য করে। কিন্তু শুধু একে অপরের পাশে দাঁড়ানোই মানসিক ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট নয়। যুদ্ধের পরও অনেক মানুষ দুঃস্বপ্ন, ভয়, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রয়োজন।

 

• সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে