২৬ অক্টোবর, ২০২৬। ভোর ৬টা ২০ মিনিট। বাংলাদেশের উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের এক ছোট্ট গ্রামে তখন হেমন্তের সকাল। সবুজ ধানখেতে সোনালি আভা, উত্তরের হিমেল হাওয়ায় শীতের আগমনী বার্তা। দিগন্তজোড়া মাঠের ওপারে কয়েকটি বাড়ি। এমনই এক শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে হঠাৎ চোখে পড়ল অবিশ্বাস্য এক দৃশ্য—দূর দিগন্তে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট!
নেপাল ও তিব্বত সীমান্তের কাছে অবস্থিত এভারেস্ট থেকে বাংলাদেশের এই প্রান্তের দূরত্ব কয়েকশ’ কিলোমিটার। এত দূরের পর্বত বাংলাদেশের মাটি থেকে দেখা যাবে, একসময় তা কল্পনাতেও আসেনি। পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, সে অভিজ্ঞতা অনেকেরই জানা। কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা গেলে এভারেস্ট কেন দেখা যাবে না- এই প্রশ্নই গত আট বছর ধরে তাড়া করে বেড়িয়েছে এক অভিযাত্রীকে। ২০২২ সালেই এই সম্ভাবনা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলেন তিনি। এ বার সেই কৌতূহল যেন বাস্তবের রূপ পেলো।
পঞ্চগড় থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট দেখার ভিডিও এই লিংকে- https://www.facebook.com/reel/1808040410469923
গত কয়েক দিন ধরেই ভোরে বেরিয়ে আকাশ ও পাহাড়ের দিকে নজর রাখছিলেন ফিরোজ আল সাবাহ নামের ওই অভিযাত্রী। আবহাওয়া অনুকূল না থাকায় প্রতিবারই হতাশ হয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে। কিন্তু ২৬ অক্টোবরের সকালটা ছিল আলাদা। আগের দিনের আবহাওয়া দেখে আকাশ পরিষ্কার থাকার আশা করেছিলেন তিনি। হেমন্তের শুকনো বাতাস আর ঠোঁট ফাটিয়ে দেওয়া শীতও যেন তাঁকে আগাম ইঙ্গিত দিচ্ছিল দূরের পাহাড় দেখার জন্য পরিবেশ অনুকূল হতে পারে।
এ দিন আর ঘুমিয়ে পড়ার ঝুঁকি নিতে চাননি। রাতের কাজ শেষ করে ভোরের আগেই প্রস্তুতি সেরে ফেলেন। সঙ্গে ছিলেন তুষার নামে আর এক অভিযাত্রী। বাইকে চেপে কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে তাঁরা রওনা দেন নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে। চোখে ঘুমের রেশ থাকলেও মনে তখন একটাই প্রশ্ন-আজ কি সত্যিই দেখা মিলবে এভারেস্টের?
গন্তব্যে পৌঁছনোর কয়েক মিনিট আগে পূর্ব আকাশে রঙের খেলা শুরু হয়। চাঁদের মৃদু আলোয় তখনও স্পষ্ট কাঞ্চনজঙ্ঘা। বরফে ঢাকা পর্বতের চূড়ায় সূর্যের প্রথম সোনালি আলো পড়তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। কিন্তু সে দিনের অভিযাত্রীদের লক্ষ্য ছিল অন্য। কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ থাকলেও চোখ ছিল দিগন্তের দিকে এভারেস্ট আর মাকালু দেখা যায় কি না, সেই অপেক্ষায়।
সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মিনিট পর দিগন্তে অস্পষ্ট কিছু একটা চোখে পড়ে। ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে পর্বতের অবয়ব। উত্তেজনায় চিৎকার করে ওঠেন অভিযাত্রী ফিরোজ। তাঁর দাবি, সেটি মাউন্ট এভারেস্ট! বাংলাদেশের মাটি থেকে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ দেখার মুহূর্তটি যেন স্বপ্নের মতো। দ্রুত ক্যামেরা হাতে নিয়ে ছবি তুলতে শুরু করেন তিনি। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছিল, তবু সেই বিরল দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করার চেষ্টা চলতে থাকে।
অভিযাত্রীর বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের পর্বত এত পরিষ্কারভাবে দেখা এবং তার ছবি তোলা তাঁর কাছে ছিল অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা। একদিকে পাখির ডাক, অন্যদিকে ক্যামেরার শাটারের শব্দে ভোরের শান্ত গ্রামে তৈরি হয় এক অন্য রকম উত্তেজনা। তাঁর সঙ্গে থাকা তুষারও এই মুহূর্তের সাক্ষী হন।
তাঁর এই অভিজ্ঞতার ছবি ও ভিডিও প্রকাশের পর সমাজমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেকের মন্তব্যের উত্তর দেওয়া সম্ভব না হলেও পরে সময় করে সেগুলোর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, ছবিটি তিনি নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তুলেছেন এবং ছবির সত্যতা নিয়ে তিনি আত্মবিশ্বাসী।
পঞ্চগড় থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার অভিজ্ঞতা বহু পর্যটককে টানে। এ বার বাংলাদেশের মাটি থেকে এভারেস্ট ও মাকালুর দেখা পাওয়ার এই দাবি নতুন করে কৌতূহল তৈরি করেছে। তবে দূরবর্তী পর্বতশৃঙ্গের পরিচয় ও দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করতে ছবির অবস্থান, সময় এবং আবহাওয়াসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে নেওয়াই ভালো। হেমন্তের এক ভোরে পঞ্চগড়ের দিগন্তে ধরা পড়া এই দৃশ্য প্রকৃতিপ্রেমী ও পাহাড়প্রেমীদের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।