Image description

মেট্রোরেলে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করেন ড. নাজিবুর রহমান (৬৪)। অস্বস্তি লাগায় তিনি বসার জন্য আশপাশের যাত্রীদের সাহায্য চান। কিন্তু তাকে কেউ বসার সুযোগ করে দেয়নি। এই অবস্থায়ই ট্রেনের মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। ড. নাজিবুরের এই মৃত্যুর ঘটনা মেট্রোরেলের যাত্রীদের মানবিক আচরণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনাটি গত শনিবারের। ড. নাজিবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য নাকিবুর রহমানের বাবা। বাবার মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দেন নাকিবুর। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় এটি।
শনিবার ঘটনার দিন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ফোরামের অনুষ্ঠান ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনুষ্ঠান শেষে দুপুরের পর শাহবাগ থেকে মেট্রোতে উঠেছিলেন তিনি।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাকিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, শাহবাগ পার হওয়ার পরই আব্বুর খারাপ লাগা শুরু হয়। সঙ্গে একজন সহকর্মী ছিলেন। ট্রেনে প্রচুর ভিড় থাকায় তিনি আব্বুর কাছ থেকে দূরে দাঁড়ান। আব্বুর যখন খারাপ লাগছিল, উনি তখন আশপাশে যারা ছিলেন, তাদের বলছিলেন যে ‘আমার খারাপ লাগছে, আপনারা একটু আমাকে বসতে দিবেন কিনা?’ অনেক ভিড় ছিল। কেউ তাকে বসতে দেননি। এমনকি সরেননি। তৎক্ষণাৎ স্ট্রোক করে পড়ে যান তিনি। পরে শোরগোল হলে আব্বুর সহকর্মী সেখানে আসেন। মোবাইল লক হওয়াতে কেউ আমাদের রিচ করতে পারেনি। পরে আব্বুর অফিসে কল দিয়ে অফিস থেকে আমাকে কল করা হয়।

তিনি আরও বলেন, একেবারে উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আব্বুকে ট্রেন থেকে বের করা হয়। অথচ এর মধ্যে কেউ আব্বুকে হাসপাতালে নিয়ে যায়নি। শেওড়াপাড়া স্টেশন থেকে উত্তরায় আসতে অনেক সময়ের প্রয়োজন। এর মধ্যে পথে কেউ হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো ভালো কিছু হতে পারতো। মেট্রোরেল স্টেশন থেকে ৯৯৯-এ কল দিয়ে এম্বুলেন্সে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। এর আগেই তিনি মারা যান। এর আগে যদি কোনো একজন একটু বসতে দিতেন একটু পানি দিতেন হয়তোবা ভালো লাগতো। কেউ আসলে এই দায়িত্ব নেননি। এমন পরিস্থিতি যে কারোর হতে পারে।

যাত্রীদের বরাত দিয়ে নিহতের ছেলে বলেন, আব্বু পড়ে গেছে, তখন আশপাশের লোকজন বলছিল ‘উনি বসতে চাইছে আপনারা কেন বসতে দিলেন না?’ আব্বুর যে খারাপ লাগছিল ৪-৫ মিনিট ধরে লোকজন বুঝতেছিল। উনি ঘামছিলেন। অনেকে বলছিলেন ‘মুরুব্বি আপনি বসেন’। আব্বু নিজেও বসতে চেয়েছেন। এসব লোকজনই আমাকে জানিয়েছে। আমি ফোন দিয়েছি কয়েকজনকে। তারাই জানিয়েছেন আমার বাবা বসতে চেয়েও বসতে পারেননি।
এই ঘটনাটি সামনে আসলে মেট্রোরেলে যাত্রীদের নিয়ে কড়া সমালোচনা চলছে। নিয়মিত যাত্রীদের অনেকেই বয়োজ্যেষ্ঠ, নারী কিংবা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের অধিকার নিয়ে কথা বলা শুরু করেন। চলাফেরার সময় বয়স্ক ও প্রবীণ নাগরিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও বন্ধুসুলভ আচরণের আহ্বান জানান নাকিবুরও। তার স্ট্যাটাসে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর মোহাম্মদ বিন কাশেম মন্তব্য করে বলেন, চাচা একজন আলেম এবং দক্ষ সংগঠক ছিলেন। আল্লাহ চাচাকে জান্নাতের উচ্চমাকাম দান করুন। তোমার (নকিব) আম্মু এবং তোমাদের সবাইকে আল্লাহ সাবরুন জামিল পালন করার তৌফিক দান করুন।

এই ঘটনা নজরে আসলে মাকসুদা আক্তার নামের এক যাত্রী বলেন, মানুষ মানুষের জন্য সহানুভূতি, সহমর্মিতা দিন দিন এতই লোপ পাচ্ছে যা দুঃখজনক। একজন মানুষ শারীরিক অসুস্থতার জন্য একটু বসার জায়গা পাননি। এটা কতোটা লজ্জাজনক তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মেট্রোতে এমন বিবেকবান মানুষ একজনও ছিলেন না। অথচ মেট্রোতে নির্দেশনা দেয়া আছে সিনিয়র সিটিজেনকে জায়গা ছেড়ে দেয়ার জন্য। সুমনা ইয়াসমিন নামের আরেক যাত্রী বলেন, আল্লাহ সবাইকে সুবুদ্ধি দিক। যুবক ছেলে-মেয়ে বয়স্কদের সামনেই সিটে বসে থাকে। যখন দৌড় দিয়ে গিয়ে আগে রিজার্ভ আসনে বসে। হাস্যকর লাগে আমার কাছে। এই দেশের এইসব শিক্ষা কবে আর দিতে হবে না? ‘ভালো আচরণের শিক্ষা দিতে হয় একদম শিশু বয়স থেকে।

প্রথমে পরিবার শেখাবে তারপরে স্কুল। ১০ বছরের পরে আর আচরণ শেখানোর কিছু নাই। আমরা সন্তানের সামনেই সিট নিয়ে আরেকজনের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত হই, বাচ্চা কোলে নিয়ে লাইন ভঙ্গ করে টিকিট কাটি! আমাদের সন্তানরা আর কি শিখবে!’- বললেন ফুয়াদ নামের আরেক যাত্রী।

এদিকে, সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া মেট্রোরেল স্টেশনের আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্টেশনে হুইলচেয়ারে থাকা এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির লিফটে ওঠার চেষ্টা করলেও পর্যাপ্ত জায়গা পাননি। সুস্থ ও সক্ষম যাত্রীদের ভিড়ে লিফটটি পূর্ণ থাকায় হুইলচেয়ারের যাত্রী লিফটে উঠতে পারেননি। ওই ভিডিওতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিকে লিফটের সামনে নিয়ে পাশে থাকা ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা কী অসুস্থ? আপনাদের একটু পরে গেলে অসুবিধা কী?’ জবাবে লিফটে থাকা ব্যক্তিদের বলতে শোনা যায়, ‘এক মিনিট লাগবে। এক মিনিট পরে আসেন না’। অথচ ওই লিফটে স্পষ্ট শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ, অসুস্থ কিংবা গর্ভবতী নারীদের আগে সুযোগ দেয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।