ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গভীর সমুদ্রবন্দরসহ দেশের বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জাপান। আগামী পাঁচ বছরে দেশটি থেকে আসবে আরও প্রায় পৌনে ১ লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ। হাল আমলের এসব বিনিয়োগই নয়, স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে আসছে দেশটি। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে মাত্র ১ কোটি ৬ লাখ ডলার বা ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা (ডলারের তৎকালীন বিনিময়মূল্য ৮ টাকা ধরে) অনুদান দিয়ে শুরু করা দেশটির সহায়তা (ঋণ ও অনুদান মিলে) এখন ২ হাজার ৯৬৮ কোটি বা ৩ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকা (ডলারের বর্তমান বিনিময়মূল্য ১২৩ টাকা ৫৯ পয়সা টাকা ধরে)।
অবশ্য দিনবদলের পালায় কিছুটা কঠিন হয়েছে সহায়তার শর্ত। দেশটির আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) একসময় শূন্য দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণসহায়তা দিলেও এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশের ওপর। ফলে সরকারের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।
তবে ‘পরীক্ষিত বন্ধুর’ কাছ থেকে সহজ শর্তে সহায়তা অব্যাহত থাকার আশাও আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেটি হতে পারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে। সুদহার নিয়ে দুই দেশের সরকারপ্রধানের আলোচনায় মিলতে পারে সুফল।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে চার দিনের সরকারি সফরে গতকাল রবিবার রাতে জাপানের উদ্দেশে রওনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আজম আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘জাপান আমাদের দীর্ঘদিনের বন্ধু। এ দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে জাপানের ভূমিকা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এখন আমাদের আর্থসামাজিক অগ্রগতি হয়েছে। আমরা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। আমাদের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। ফলে সস্তা সুদের ঋণপ্রাপ্তি কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া জাপানের পার্লামেন্টেও জবাবদিহি করতে হয়। তখন সেখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের উন্নতি হলেও কম সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে কেন। এরকম নানা প্রতিবন্ধকতা তাদের দিক থেকেও আছে। এরপরও প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আলোচনার সুযোগ আছে। এ বিষয়ে জোরালো কথা হলে আশা করা যায় সুদের হার কমার বিষয়ে ইতিবাচক ফল আসবে।’ তিনি আরও বললেন, ‘সুদের হার কমানো গেলে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ পরিশোধের বোঝা কিছুটা হালকা হবে।’
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে বাংলাদেশকে দেওয়া জাপানের প্রথম অনুদান সহায়তা ছিল ১ কোটি ৬ লাখ মার্কিন ডলার। এটি মূলত যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের জন্য ‘পণ্য অনুদান সহায়তা’ হিসেবে দিয়েছিল দেশটি। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানের কাছ থেকে প্রথম ঋণ সহায়তা পায় ৯০ লাখ ডলার। এরপর থেকে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর পর্যন্ত জাপান মোট ৫৭৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার অর্থ ছাড় করেিছল। তবে প্রতিশ্রুতি ছিল আরও বেশি; ৬২৩ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের। ইআরডির সর্বশেষ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ সাল থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত জাপান বাংলাদেশকে অর্থছাড় করেছে ২ হাজার ৩৯৪ কোটি ৯২ লাখ ডলার। এ সময়ে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪২১ কোটি ডলার।
কোন উন্নয়ন সহযোগীর কত অবদান
ইআরডির প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের উন্নয়নে কোন সংস্থা বা দেশের কতটুকু অবদান সেই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সেটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। প্রথম অবস্থানে থাকা বিশ্বব্যাংকের অবদান ২৯ শতাংশ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ২৩ শতাংশ। এরপরই জাপানের ১৮ শতাংশ। অবশ্য একক দেশ হিসেবে জাপানই সবার ওপরে। দেশ হিসেবে জাপানের পরে আছে রাশিয়া ১১ শতাংশ, চীন ৭, ভারত ২, অন্যান্য ৭ শতাংশ।
জাপানের সহায়তায় উল্লেখযোগ্য প্রকল্প
জাপানের ঋণ সহায়তার একটি বড় অংশ রয়েছে যোগাযোগ ও অবকাঠামো নির্মাণের মেগা প্রকল্পগুলোয়। এর মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিয়েছে জাপান। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাইকা ১৩ হাজার কোটি টাকার অর্থায়ন করছে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্পে ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকার মধ্যে জাইকার অর্থায়ন রয়েছে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল এমআরটি-৬ প্রকল্পে ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকার মধ্যে জাইকার ঋণ ১৬ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৮৩ হাজার ৮৪২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকার ঋণ ৬৭ হাজার ৫১৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হওয়া যমুনা নদীর ওপর যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকার মধ্যে জাইকার অর্থায়ন ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। আরও আছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে নির্মীয়মাণ জাপানিজ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্প।
সুদ বাড়িয়েছে জাইকা
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ছিল একসময় বাংলাদেশের উন্নয়নে অন্যতম সত্তা ঋণদাতা সংস্থা। শুরুর দিকে জাইকার দেওয়া ঋণে সুদহার ছিল শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৫ সাল থেকে বহাল ছিল এ হারই। এরপর ২০২২ সাল পর্যন্ত ছিল শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। বিভিন্ন সময় বাড়তে থাকে সুদহার। এভাবে গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত ছিল ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ। সর্বশেষ দফার বর্ধিত সুদহার কার্যকর চলতি বছরের ১৫ এপ্রিল থেকে। ফলে বর্তমানে সুদহার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে। এ ছাড়া পরামর্শক সেবা খাতে ঋণের সুদের হার শূন্য দশমিক ৭৫ থেকে ধাপে ধাপে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১ শতাংশ। যুক্ত করা হয়েছে অন্য আরও কিছু শর্ত। তবে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা ও রেয়াতকাল আছে আগের মতোই। এ বিষয়ে ইআরডির সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, জাইকা সাধারণত বছরে দুবার তাদের ঋণ পর্যালোচনাা করে থাকে। এক্ষেত্রে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং যে দেশকে ঋণ দেওয়া হয় সে দেশের অবস্থা বিবেচনা করে সুদহার নির্ধারণ করা হয়। আমরা শুরু থেকেই এই সুদহার বৃদ্ধির বিপক্ষে ছিলাম। বারবার জাইকার কাছে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা কোনো রেসপন্স করেনি।
সুদ বৃদ্ধি নিয়ে সরকারের মধ্যে উদ্বেগ
জাপানের ঋণে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের ব্যয় এবং সুদহার বৃদ্ধি নিয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ
করেছিলেন কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিব। ওই বৈঠকে রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণে জাপানের ঋণের দুটি সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ সময় ঋণ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বৈঠকে অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেছেন, ‘জাইকার ঋণগ্রহণ ক্রমেই ব্যয়বহুল হয়ে যাচ্ছে। তাই বিকল্প ঋণের উৎস অনুসন্ধান করতে হবে। এ ছাড়া জাপানের ঋণের শর্ত এমন থাকে যে, টেন্ডারে অন্য কোনো দেশ অংশ নিতে পারে না। জাইকার সুদহার বাড়া নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরলেন শিল্প, বস্ত্র ও পাট এবং বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও। এ ছাড়া অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের কণ্ঠেও ছিল অনেকটা একই সুর। তবে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু
মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘জাপানের সঙ্গে আমাদের ঋণচুক্তির বাইরেও অনেক দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ঋণের সুদের হার বেশি হলেও গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর এবং রি-পেমেন্ট মেয়াদ ৪০ বছর, যা
অনেক নমনীয়। এ ছাড়া জাপানের কাজের গুণগত মান অনেক ভালো। এসব দিক বিবেচনায় মেট্রোরেল প্রকল্পে ঋণচুক্তি বাতিল করা সমীচীন হবে না।’ শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্মতিতে প্রকল্প দুটির সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদন পায়।