অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উত্তাল সময়ে এ কে ফজলুল হক অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলেছেন। তিনি শেরেবাংলা নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তিনি প্রবল শক্তি নিয়ে বাংলার রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। অল্প সময়ের মধ্যেই পান ‘শেরেবাংলা’ বা ‘বাংলার বাঘ’ উপাধি। রাজনৈতিক জীবনের বাকি সময়েও এই ধারা বজায় ছিল। তিনি প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন এবং এমন সব পথ বেছে নিয়েছেন, যে পথে চলার সাহস খুব কম মানুষেরই ছিল।
‘বাংলার কৃষকসমাজের অধিকার আদায়ের অগ্রনায়ক’ হিসেবে পরিচিত ফজলুল হক প্রথমে ছিলেন কলকাতার মেয়র। পরে ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সাল পর্যন্ত তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর।
ইতিহাসের এই উত্তাল সময়ে শেরেবাংলা আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। ১৯১৬ থেকে ১৯২১ সাল পর্যন্ত তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের (এআইএমএল) সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া ১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের (আইএনসি) সাধারণ সম্পাদক।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর বর্তমান বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলায় ফজলুল হকের জন্ম। শৈশবের শুরুতে তিনি বাড়িতেই পড়াশোনা করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন। এরপর আইন কলেজ থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
কৃষকের মুক্তির আন্দোলন
মুসলিম লীগের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ স্যার খাজা সলিমুল্লাহ ও সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরীর সহায়তায় এ কে ফজলুল হক রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তবে মুসলিম লীগে তাঁর মন সায় দিত না।
সামন্ততান্ত্রিক বাংলার প্রজাস্বত্বভোগী কৃষকদের অধিকার আদায়ের লড়াই করতে চেয়েছিলেন তিনি। একই চিন্তার অন্য নেতাদের সঙ্গে মিলে তিনি কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের সংগঠন ‘কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি)’ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দলটির পরিচয় দেওয়া হয়েছিল এভাবে: ‘এটি কোনো রাজনৈতিক দল নয়, বরং কৃষকের মুক্তি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।’
পুঁজিবাদী ধারার মুসলিম লীগের বিপরীতে ফজলুল হক ও কৃষক প্রজা পার্টি বাংলার মুসলিম কৃষকদের স্বার্থ তুলে ধরেছিল। ইতিহাসবিদ তারিক ওমর আলী বলেন, ‘১৯৩৭ সালের নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার পেছনে অন্তত আংশিকভাবে দায়ী ছিল কৃষক প্রজা পার্টির কৃষকবান্ধব জনতুষ্টিবাদী কর্মসূচি, মুসলিম লীগের সঙ্গে দলটির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দলটির নেতা এ কে ফজলুল হকের জ্বালাময়ী বক্তব্য।’
১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে ফজলুল হক তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী খাজা নাজিমুদ্দিনকে বিপুল ভোটে হারান। তিনি পান ৭০ শতাংশ ভোট।
নির্বাচনের পর এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত ব্রিটিশ বাংলার প্রধানমন্ত্রী হন। দুর্ভিক্ষের সময় প্রদেশের প্রশাসন চালাতে ফজলুল হক ব্যর্থ হচ্ছেন বলে মনে করতেন ব্রিটিশ গভর্নর জন আর্থার হারবার্ট। তাঁর মতে, ফজলুল হক প্রাদেশিক প্রশাসন ঠিকমতো চালাতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত গভর্নর হারবার্টের ‘কৌশলী প্রভাবের’ মুখে ফজলুল হক পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর জায়গায় দায়িত্ব নেন খাজা নাজিমুদ্দিন।
জ্বালাময়ী বক্তৃতায় দক্ষ ছিলেন হক
সময়টা ১৯৪৩ সাল। বাংলায় তখন দুর্ভিক্ষ চলছে। জনসমর্থন ও ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে ফজলুল হক নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই ভিত্তি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তিনি কৃষকদের অধিকার রক্ষা করতে পারেননি। ১৯৪৩ সালে আইনসভায় এক ভাষণে হক বলেছিলেন, ‘বাজেটের হিসাব দেখেই বোঝা যায়, দেশ কত বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দেশের এমন ভয়াবহ অবস্থা দেখে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।’
আরেকটি জ্বালাময়ী ভাষণে তিনি বর্ণনা করেন, ‘কীভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো কর্তৃত্বকে উপহাসের বিষয়ে পরিণত করেছে।’ তিনি গভর্নরের বিরুদ্ধে সংবিধানের প্রতি ‘চরম অবমাননা’র অভিযোগও আনেন।
তীব্র ও হৃদয়স্পর্শী বক্তৃতা দিতে হক খুবই দক্ষ ছিলেন। ইতিহাসবিদ ধরিত্রী ভট্টাচার্য বলেন, ‘১৯৪৩ সালে বাংলায় আঘাত হানা এবং লাখ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া দুর্ভিক্ষ নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নথিপত্র ঘেঁটে আমি যা জানতে পেরেছি, তা হলো নিয়ন্ত্রণহীন দুর্নীতিও দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। এর প্রধান কারণ ছিল, হক জনগণের সেবা করার পরিবর্তে নিজের জোটের মধ্যে ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যস্ত ছিলেন।’
রাজনৈতিক কৌশলে ফজলুল হককে হারিয়ে দেওয়া হলেও মূলত তিনি ছিলেন দূরদর্শী রাজনীতিবিদ। ভাষার ওপর তাঁর অসাধারণ দখল ছিল, যা দিয়ে তিনি সবসময় পরিস্থিতি সামাল দিতে পারতেন। ১৯৪০ সালে তিনি ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। এই প্রস্তাবেই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
এটি সত্য ঘটনা নাকি অনুমান, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে বলা হয়, হক যখন মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন করতালিতে তাঁকে স্বাগত জানানো হয়। সেই করতালির শব্দ মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর বক্তৃতার আওয়াজকেও ছাপিয়ে যায়। জিন্নাহ তাঁকে সাদরে স্বাগত জানিয়ে বলেছিলেন, ‘বাঘ যখন আসে, তখন মেষশাবকের অবশ্যই সরে দাঁড়ানো উচিত।’
১৯৪৬ সালের নির্বাচনে হক আগের চেয়ে কম আসন পান এবং আরেক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে হেরে যান। দেশভাগের পর তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্ব নেন এবং একই সঙ্গে সক্রিয়ভাবে রাজনীতিও করেন। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার পক্ষে তিনি জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন।
তবে ১৯৫৪ সালের আগে তিনি আর রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরতে পারেননি। নবগঠিত পাকিস্তানে পূর্ববঙ্গ আইনসভার নির্বাচন ছিল এ ধরনের প্রথম নির্বাচন। হকের কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি) তখন যুক্তফ্রন্টের অংশ। এই জোটে আওয়ামী লীগও ছিল। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের সাফল্য ছিল বিস্ময়কর। মুসলিম লীগের আসনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গুটিকয়েকে নেমে আসে।
ভট্টাচার্য আরও বলেন, হকের মূল আগ্রহ ছিল নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা। প্রকৃত শাসন পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ‘অযোগ্যতা ও অনিচ্ছার’ পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাব এতই বেশি ছিল যে, কথার সঙ্গে কাজের মিল না থাকলেও তাঁর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণ অটুট ছিল।
মাথা নত করতে অস্বীকৃতি
রাজনীতিতে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের সময় ফুরিয়ে আসছিল। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল। পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মাত্র কয়েক মাস দায়িত্ব পালনের পর তাঁকে আবারও বরখাস্ত করা হলো।
তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী বগুড়ায় বলেছিলেন, ‘প্রদেশের প্রশাসন কার্যত ভেঙে পড়েছিল।’ ফজলুল হককে নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও কঠোর ও বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণা চলে। ঢাকার দ্য মেইল পত্রিকা লিখেছিল, তাঁর বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে ‘শান্তি, স্বাধীনতা ও নৈতিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী প্রত্যেক সুস্থ বিবেকসম্পন্ন প্রকৃত পাকিস্তানি স্বাগত জানাবেন।’
করাচির দ্য মর্নিং নিউজ পত্রিকা আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। পত্রিকাটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে। তাদের মতে, কেন্দ্রের হাতে এমন পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকা দরকার, যাতে প্রদেশগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদ বা বিদ্রোহের প্রক্রিয়া থামানো যায়, যে পথে ভবিষ্যতে কোনো ‘ফজলুল হক’ এগিয়ে যেতে পারেন।
ফজলুল হককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবার খেলায় তিনি ছিলেন নিছক একটি ঘুঁটি। ভারতের সমর্থনে তিনি একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়েছিলেন। নিজের আদর্শের প্রতি তাঁর অবিচল বিশ্বাস এবং কৃষকসমাজকে ক্ষমতায়িত করার অঙ্গীকার তৎকালীন উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে উঠেছিল।
১৯৫৪ সালে কলকাতায় এক ভাষণে ফজলুল হক বলেছিলেন, ‘আমরা একটি অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য একসঙ্গে কাজ করছি। লক্ষ্য যদি অভিন্ন হয়, তাহলে কে বাঙালি, কে বিহারি, কে পাকিস্তানি আর কে অন্য কিছু, এমন ভাবনা নিছক। ভারত একটি অখণ্ড সত্তা। আমি মাতৃভূমির স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করব এবং তাঁদের সঙ্গে কাজ করব, যাঁরা ভারত, হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানকে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন।’
নতুন করে বিভক্ত এক বিশ্বে ঐক্যের জন্য এ কে ফজলুল হকের এই জোরালো ডাক অনেকের বিরক্তির কারণ হয়েছিল। বিশেষ করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তাঁর এই বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়। কর্তৃপক্ষের কাছে মাথা নত করতে তাঁর অস্বীকৃতি এবং পূর্ব পাকিস্তানের ক্রমে খারাপ হতে থাকা নিরাপত্তা পরিস্থিতি, এই দুইয়ের মিলেই তাঁর রাজনৈতিক পরিণতি ঠিক হয়ে যায়।
ফজলুল হক রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও তখন পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল খুবই অস্থিতিশীল। অবশেষে ১৯৫৬ সালে তাঁকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৫৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। অভ্যুত্থানের পর ফজলুল হক এবং তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা, সবাই বাঙালির রাজনীতি থেকে হারিয়ে যান।
রাজমোহন গান্ধী তাঁর লেখায় ফজলুল হকের পাশাপাশি আরও দুজন রাজনীতিবিদের কথা তুলে ধরেছেন, যাঁরা তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে ছিলেন। তাঁরা হলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাজিমুদ্দীন। এই তিন নেতাকে ঢাকায় তিন নেতার মাজারে পাশাপাশি সমাহিত করা হয়েছে।
রাজমোহন গান্ধী লিখেছেন, ‘তিনজনকেই পাশাপাশি সমাহিত করা হয়েছে ঢাকার হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে। ফজলুল হক ও তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সেখানে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে দুজনকে একসময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলা হতো। ফজলুল হককে কখনো সেই পরিচয়ে ডাকা হয়নি। কিন্তু একমাত্র তাঁকেই ‘‘রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার’’ বা ‘‘বাংলার বাঘ’’ বলা হতো।’
৮৮ বছর বয়সে ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এ কে ফজলুল হক। তিনি রেখে যান এক অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, যা আজও ইতিহাসে তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থানকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
• অন্তরা বড়ুয়া: ‘দ্য প্রিন্ট’-এর সংবাদদাতা, লেখক ও গবেষক
(দ্য প্রিন্ট থেকে অনুবাদ করেছেন কাজী নিশাত তাবাসসুম)
