Image description

হাতিরঝিলে বছরের পর বছর পয়োবর্জ্য জমে থাকা এবং বাস্তুতন্ত্র অবক্ষয়ের ফলে দুর্গন্ধের পাশাপাশি ক্ষতিকর গ্যাস উৎপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

ঢাকার নাগরিক জীবনে একসময় স্বস্তি, সৌন্দর্য আর স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক ছিল হাতিরঝিল। যানজট এড়িয়ে চলাচলের বিকল্প পথ, নৌযান চলাচল, নির্মল পরিবেশ আর দৃষ্টিনন্দন জলাধার—সব মিলিয়ে রাজধানীর অন্যতম সফল নগর উন্নয়ন প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল এটি। কিন্তু এক দশক পেরোতেই সে জলাধারের চিত্র পাল্টাতে শুরু করে। এখন কালচে ও দূষিত পানির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসহনীয় দুর্গন্ধ। লেকের পাড় ছাড়িয়ে আশপাশের আবাসিক এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়ছে সে গন্ধ। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বছরের পর বছর পয়োবর্জ্য জমে থাকায় লেকের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, একই সঙ্গে তৈরি হচ্ছে ক্ষতিকর গ্যাস।

প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হাতিরঝিলের এমন পরিণতির জন্য ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের অভিযোগ, লেকের দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের দেয়া সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। ফলে একসময়ের দৃষ্টিনন্দন জলাধারটি এখন নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে উঠেছে।

হাতিরঝিল ঘুরে গতকাল দেখা যায়, লেকের পানি কালচে ও ময়লাযুক্ত হয়ে পড়েছে। সোনারগাঁও, মগবাজার, রামপুরা ও মহানগর অংশে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র দুর্গন্ধ। লেকের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় অনেককে নাক-মুখ চেপে রাখতে দেখা যায়। দুর্গন্ধের কারণে লেকে আসা ও সেখানে সময় কাটানোর প্রবণতাও কমেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

মহানগর প্রজেক্টের বাসিন্দা আলমাস সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘একটা সময় নিয়মিত লেকে হাঁটতে আসতাম। এখন কালেভদ্রে আসি। তীব্র দুর্গন্ধে যেন জীবন বেরিয়ে আসার অবস্থা। আসলে এখানে আর হাঁটার বা অবস্থান করার কোনো পরিবেশ নেই।’

 

দুর্গন্ধের প্রভাব পড়ছে আশপাশের আবাসিক এলাকায়ও। মহানগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা তাসলিমা আক্তার বলেন, ‘হাতিরঝিলের দুর্গন্ধ এখন আর লেকের সীমানায় আটকে নেই। আমরা যারা আশপাশ এলাকায় বসবাস করছি, আমাদের বাসাবাড়িতেও দুর্গন্ধ চলে এসেছে। তীব্র এ দুর্গন্ধে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। যারা ভাড়া থাকেন, তাদের অনেকেই বাসা পাল্টে ফেলেছেন।’

উদ্বোধনের পর অর্থাৎ ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে হাতিরঝিলের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্পেশাল ওয়ার্কস অর্গানাইজেশন (এসডব্লিউও)। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন শেষ হলে হাতিরঝিলের স্থায়ী মালিক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রাজউককে পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। ওই বছরের জুলাই থেকে কার্যত দায়িত্বটি পালন করছে সংস্থাটি।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, রাজউকের তত্ত্বাবধানে যাওয়ার পর থেকেই ধীরে ধীরে হাতিরঝিলের পরিবেশের অবনতি ঘটতে থাকে। অথচ তার আগে পানির দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার এবং লেকের তলদেশে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে এসব ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়নি বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি আশপাশ এলাকা থেকে পয়োবর্জ্য লেকে প্রবেশ করায় দূষণ আরো বেড়েছে।

নগর বিশ্লেষকদের ভাষ্য, কয়েক বছর ধরে কেবল শীত মৌসুমে হাতিরঝিলের পানিতে দুর্গন্ধের তীব্রতা বাড়ত। তবে দুই বছর ধরে প্রায় সারা বছরই এ সমস্যা থাকছে। ফলে লেকের পাশ দিয়ে চলাচলকারী মানুষ থেকে শুরু করে আশপাশের বাসিন্দাদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

6

রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান ও বনানী লেকও মারাত্মক দূষণের শিকার। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব লেকের আশপাশে দুর্গন্ধ এখনো হাতিরঝিলের মতো অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেনি। হাতিরঝিলের বড় অংশজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় এর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

হাতিরঝিল নির্মাণ ও নকশা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিল স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান ‘ভিত্তি স্থপতি’। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইকবাল হাবিব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাতিরঝিল এখন ইউট্রোফিকেশন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। লেকের পানি মজে গিয়ে জলাধারটি নিজেই নিজের প্রাণ হারাচ্ছে। এর জন্য পুরোপুরি দায়ী রাজউক।’

তিনি জানান, প্রায় দেড় বছর আগে হাতিরঝিলের দূষণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় নির্ধারণের জন্য রাজউকে একটি বৈঠক হয়। সেখানে লেক নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত চাওয়া হয়েছিল। এরপর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা প্রায় দেড় মাস কাজ করে বিনা পারিশ্রমিকে বেশকিছু সুপারিশ জমা দেন। কিন্তু দেড় বছরেও সেগুলো বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

ইকবাল হাবিব বলেন, ‘আমাদের বড় সুপারিশ ছিল, লেকে যেন কোনোভাবেই পয়োবর্জ্য ফেলা না হয়। লেকের দুই পাশে থাকা বড় পাইপের মাধ্যমে এসব বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি লেকের পানি পরিশোধন ও বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কিছু সুনির্দিষ্ট করণীয়ও আমরা রাজউককে জানিয়েছিলাম। কিন্তু দেড় বছর ধরে সুপারিশগুলো ফাইলবন্দি হয়ে আছে। রাজউকও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, লেকে পয়োবর্জ্য প্রবেশ বন্ধ করা এবং জমে থাকা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া হাতিরঝিলের পরিবেশ পুনরুদ্ধার কঠিন। শুধু পানি পরিষ্কার করলেই চলবে না; দূষণের উৎস বন্ধের পাশাপাশি জলাধারের স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।

হাতিরঝিলে বছরের পর বছর পয়োবর্জ্য জমে থাকা এবং বাস্তুতন্ত্র অবক্ষয়ের ফলে দুর্গন্ধের পাশাপাশি ক্ষতিকর গ্যাস উৎপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাতিরঝিলের দূষণের অন্যতম উৎস পয়োবর্জ্য। বছরের পর বছর এসব বর্জ্য জমে থাকলে জৈব পদার্থের পচন থেকে মিথেনের মতো গ্যাস উৎপন্ন হতে পারে। এ ধরনের গ্যাস মানবস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।’

পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতিরঝিলের দূষণ এখন আর কেবল সৌন্দর্যহানি বা দুর্গন্ধের সমস্যা নয়। এটি নগরবাসীর জীবনযাত্রা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। দূষণের উৎস বন্ধ, পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

রাজধানীর জলাধার ও উন্মুক্ত পরিসর রক্ষার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিত হাতিরঝিলের বর্তমান পরিস্থিতি তাই নগর ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সুফল ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে তার দীর্ঘমেয়াদি উপযোগিতা ও পরিবেশগত গুরুত্ব দুটিই হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

হাতিরঝিলের দূষণ ও দুর্গন্ধের জন্য অবশ্য একে অন্যকে দায়ী করছে রাজউক ও ঢাকা ওয়াসা। রাজউকের দাবি, ওয়াসার অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্কের কারণে পান্থপথ, ধানমন্ডি, গ্রিন রোডসহ আশপাশ এলাকার পয়োবর্জ্য সরাসরি হাতিরঝিলে পড়ছে। অন্যদিকে ওয়াসার ভাষ্য, বর্জ্য শোধনাগারে পৌঁছে দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সংযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাজউকের। দুই সংস্থার এ পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে দূষণ বাড়ছে হাতিরঝিলে, ভোগান্তি পোহাচ্ছে নগরবাসী।

রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. মুজাফফর উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাতিরঝিল একটি সমন্বিত প্রকল্প। এখানে ওয়াসার কাজ হলো পয়োবর্জ্য যেন লেকে না যায়, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বৃষ্টির সময় হাতিরঝিলের দুই পাশে থাকা বিশেষ পয়োনিষ্কাশন পাইপের (এসএসডি) ধারণক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়। তখন পান্থপথ, ধানমন্ডিসহ আশপাশ এলাকার জলাবদ্ধতা কমাতে সরাসরি বর্জ্য ও পানি হাতিরঝিলে ছেড়ে দেয়া হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে লেকটি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়েছে, আর ভুক্তভোগী হচ্ছে মানুষ।’

হাতিরঝিলের দুর্গন্ধ কমাতে সাময়িক ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে মো. মুজাফফর উদ্দিন বলেন, ‘মঙ্গলবার বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। বৃষ্টি শেষ হলে জরুরি ভিত্তিতে রাসায়নিক প্রয়োগ করা হবে। এতে দুর্গন্ধ অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া ওয়াসাকে চিঠি দিয়ে পয়োনিষ্কাশন লাইনগুলোর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বুঝে নিতে বলা হয়েছে। ওয়াসাও সম্মতি দিয়েছে এবং পৃথক প্রকল্প নেয়ার কথা জানিয়েছে।’

ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কারণেও হাতিরঝিলের দূষণ বাড়ছে বলে জানায় রাজউক। সংস্থাটির কর্মকর্তাদের দাবি, এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কারণে ঝিলের সোনারগাঁও অংশের ডিফিউজারগুলো চালানো যাচ্ছে না। ফলে ওই অংশের পানিতে অক্সিজেন সরবরাহ ও পানি পরিশোধন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তবে হাতিরঝিল দূষণের দায় নিতে রাজি নয় ঢাকা ওয়াসা। তাদের দাবি, এ জলাধারে তাদের কোনো পয়োনিষ্কাশন নেটওয়ার্ক নেই। লেকের দুই পাশের এসএসডি নেটওয়ার্ক রাজউকের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। সংস্থাটির উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এসএসডি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পয়োবর্জ্য রামপুরা লিফটিং স্টেশন পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব রাজউকের। এরপর দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগারে নিয়ে পরিশোধন করে নদীতে ফেলার দায়িত্ব ওয়াসার। আমরা ধারণা করছি, রাজউকের এসএসডি লাইনের কোথাও লিকেজ আছে, সেখান থেকেই পয়োবর্জ্য লেকে ছড়িয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।’