২০২৭ শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন অংশে ৮৮ বার নৌকার ছবি ব্যবহারের ঘটনায় তীব্র প্রশ্নের মুখে পড়েছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা। বইয়ে একই প্রতীকের এমন ব্যবহার নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনসিসিসির সদস্যদের অনেকে।
রবিবার (২৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে অনুষ্ঠিত জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) রুদ্ধদ্বার সভায় বিষয়টি নিয়ে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মুখে পড়তে হয় বলে জানা গেছে। সভার আগে কিংবা পরে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি দুই মন্ত্রণালয় কিংবা এনসিটিবি। গণমাধ্যমের সঙ্গেও নাম প্রকাশের শর্তে কথা বলতে রাজি হননি কোনো কর্মকর্তা।
আমাইতে অনুষ্ঠিত এনসিসিসির সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব আবদুল খালেক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব জেসমিন নাহারসহ বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থিত ছিলেন এমন পাঁচজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বইয়ে অযাচিতভাবে একাধিকবার নৌকার ছবি প্রদর্শনের কারণ জানতে চাওয়া হয় এনসিটিবির কর্মকর্তাদের কাছে। এ সময় তারা নিজেদের মতো করে যুক্তি দেন। তবে সভায় এনসিটিবির বাইরের কর্মকর্তাদের অধিকাংশই একাধিকবার নৌকার ছবি ব্যবহারে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে বইগুলা থেকে নৌকার ছবি পরিবর্তন করা হবে কিনা সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বৈঠকে নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও পাঠ্যবই থেকে ছবিগুলো পরিবর্তন বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সভায় উপস্থিত একটি সংস্থার উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘একাধিকবার নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এগুলো পরিবর্তনের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।’
আরেক কর্মকর্তা জানান, ‘পাঠ্যবইয়ে একাধিকবার নৌকার ছবি ব্যবহারের বিষয়টি সিরিয়াসলি (গুরুত্বসহ) নেওয়া হয়েছে। কারা এর সাথে জড়িত, কী কারণে এমন হয়েছে, এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কিনা সেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
আরেক কর্মকর্তা জানান, বইগুলোয় আগেও নৌকার ছবি ছিল। এবারও সেটাই রাখা হয়েছে। যেহেতু ২০২৮ সালে নতুন বই আসছে, তাই মোটাদাগে বিবেচনা করলে আগের বইটিই প্রকাশ হচ্ছে এবার। তবে দাঁড়িপাল্লা বিতর্কের পর হঠাৎ নৌকা নিয়ে বিতর্ক শুরু হলো কিনা- এমন আলোচনাকে উড়িয়ে দিতে চাচ্ছেন না তারা।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চলতি বছরের প্রাথমিকের বাংলা বইগুলো বিশ্লেষণ করে ডেইলি ক্যাম্পাস দেখেছে, প্রাথমিকের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে সব মিলিয়ে মোট ৩৫টি পৃষ্ঠায় ৮৮টিরও বেশি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ের ১০টি পৃষ্ঠায় মোট ৩২টি নৌকার ছবি রয়েছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৮টি পৃষ্ঠায় রয়েছে ২৩টি ছবি। আর তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৯টি পৃষ্ঠায় ২৫টি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া চতুর্থ শ্রেণির ৩টি পৃষ্ঠায় ৩টি এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫টি পৃষ্ঠায় ৫টি নৌকার ছবি পাওয়া গেছে। বইগুলো চলতি বর্ষ তথা ২০২৬ সালেও পড়ানো হচ্ছে।
৭২ পৃষ্ঠার বইয়ে ৩২ বার নৌকার ছবি
২০২৭ বর্ষের জন্য প্রস্তুত করা নতুন বইগুলো ঘেঁটে দেখা গেছে, প্রথম শ্রেণির বাংলা বইয়ে নৌকার ছবি সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। এই বইয়ের ১০টি পৃষ্ঠায় মোট ৩২টি নৌকার ছবি রয়েছে। বইটিতে ‘ছ’ অক্ষরের ব্যবহারে ‘ছই’ বোঝাতেও একটি নৌকার ছবি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে এ-কার ও ঐ-কারের ব্যবহারে বৈঠার সাথেও রাখা হয়েছে নৌকা। বইটির ৪৭ ও ৪৮ পৃষ্ঠায় আষাঢ় মাসের বর্ণনা দিতে গিয়ে নদীতে নৌকার ছবি আঁকা হয়েছে। আবার ৫৪ পৃষ্ঠায় মেঘ, শৈবাল, ভোর ও নৌকার বাক্যেও একই ছবি রয়েছে। ৬০ পৃষ্ঠায় কবি কাজী নজরুলের ‘ভোর হলো’ কবিতায় ‘অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে’ নৌকা আনা হয়েছে। এছাড়া ইনার ও ৬৯ পৃষ্ঠায় একই ছবি হুবহু পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির বইয়েও একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৮টি পৃষ্ঠায় ২৩টি নৌকার ছবি দেওয়া হয়েছে। বইটির কাভার পেজে একটি স্পষ্ট নদীর দৃশ্যের সাথে নৌকা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে তৃতীয় শ্রেণির বইয়ের ৯টি পৃষ্ঠায় ২৫টি নৌকার ছবি রয়েছে। এই বইয়ের কাভার পেজেও নৌকার ছবি দেওয়া হয়েছে। বইটির ৩২ পৃষ্ঠায় ‘মাঝি’ শব্দ বোঝাতে এবং ৩৪ পৃষ্ঠায় রাজুর আঁকা ছবির অংশে তিনটি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যবইয়েও নৌকার ‘অতিরঞ্জিত’ উপস্থিতি দেখা গেছে। এর মধ্য চতুর্থ শ্রেণির বাংলা বইয়ের ৩টি পৃষ্ঠায় ৩টি নৌকার ছবি দেওয়া হয়েছে। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘দূরের পাল্লা’ কবিতায় এই ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। বইয়ের ৪৬ পৃষ্ঠায় অনুচ্ছেদ লেখার ছবিতে এবং ১০২ পৃষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথের ‘ইচ্ছামতী’ কবিতায় নদীর সাথে নৌকার ছবি যুক্ত করা হয়েছে। পঞ্চম শ্রেণির বইয়ে মোট ৫টি পৃষ্ঠায় ৫টি নৌকার ছবি পাওয়া গেছে। বইটির ইনার কাভারের পাশাপাশি ভেতরের একাধিক পাতাতেও নৌকার অহেতুক ব্যবহার রয়েছে। এছাড়াও একইভাবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য মুদ্রিত বিভিন্ন শ্রেণির বাংলা বইয়ে প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
A থেকে E— চার শব্দ গঠনে প্রাণীর ছবি, ভিন্ন শুধু B-তে Boat
দ্বিতীয় শ্রেণির ইংরেজি বই ‘English for Today’ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বইটির ৬ নম্বর পৃষ্ঠায় ‘B for Boat’ লেখার পাশাপাশি নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পাঠে A থেকে E পর্যন্ত পাঁচটি অক্ষর দিয়ে শব্দ গঠনের উদাহরণ হিসেবে চারটি প্রাণীর ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। A দিয়ে Ant (পিঁপড়া), C দিয়ে Crow (কাক), D দিয়ে Deer (হরিণ) এবং E দিয়ে Ear (কান)-এর প্রতীক হিসেবে হাতির ছবি দেওয়া হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু B দিয়ে Boat (নৌকা); যা কোনো প্রাণী নয়। ফলে বর্ণ শেখানোর এই অধ্যায়ে চারটি উদাহরণের (প্রাণীর ছবি) অমিল শুধু ‘B-তে Boat’ তথা নৌকার ছবি। একইভাবে ৭ নম্বর পৃষ্ঠাতেও ‘B for Boat’ তথা নৌকার ছবি রয়েছে। অথচ বর্ণটি শেখানোর জন্য ‘B for Ball’ শব্দটি বেশি উপযুক্ত বলেই মনে হচ্ছে।
এছাড়া ৮ নম্বর পৃষ্ঠাতেও ‘Boat’ শব্দ ও নৌকার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। এই পৃষ্ঠার একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, নৌকার ওপর দুটি হরিণ দাঁড়িয়ে আছে, আর তীরে থাকা একটি হাতি শুঁড় দিয়ে নৌকাটি টেনে ধরেছে। A থেকে E পর্যন্ত অক্ষর দিয়ে শব্দ শেখানোর ধারাবাহিকতায় ant, boat, crow, deer ও ear শব্দগুলো রাখা হয়েছে। তবে এখানে প্রাণীর ছবি দিয়ে শব্দ শেখানোর পাশাপাশি নৌকাকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে; যা পুরো দৃশ্যটিকে কিছুটা অস্বাভাবিক করে তুলেছে। বিশেষ করে, হরিণের নৌকায় চড়ে থাকা এবং হাতির শুঁড় দিয়ে সেটি টানার দৃশ্যটি শব্দ শেখানোর মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বইটির ১১ নম্বর পৃষ্ঠায়ও অপ্রয়োজনীয়ভাবে নৌকার ছবি যুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা ও সরবরাহের অগ্রগতি তুলনামূলক ভালো। তবে মাধ্যমিক স্তরে এ কাজ পিছিয়ে রয়েছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানিয়েছিলেন,‘বইগুলো পর্যালোচনা করে আমরা আলোচনা করব। আগামীকাল (আজ রবিবার) এ-সংক্রান্ত একটি সভা রয়েছে। সেখানে বইগুলোর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা পাওয়া যাবে। নির্দেশনা পাওয়ার পর পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।