Image description

বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশের দাবিতে বড় আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন শিক্ষকরা। দাবি আদায় করতে সারা দেশ থেকে শিক্ষকদের ঢাকায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। 

বদলির দাবিতে আন্দোলনরত তিনটি শিক্ষক সংগঠনের একাধিক শিক্ষক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, বদলির ফল প্রকাশ ইস্যুতে কঠোর অবস্থানে রয়েছে সংগঠনগুলোর। আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বদলির ফল প্রকাশে কোনো অগ্রগতি না হলে ৪ নভেম্বর বৃহত্তর কর্মসূচি পালন করবেন তারা। 

শিক্ষক নেতাদের মতে, স্কুল-কলেজে প্রায় দেড় মাস আগে বদলি আবেদন নেওয়া হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষকরা ঢাকায় এসে হার্ড কপিতে আবেদন দিয়েছেন। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরও আবেদনগ্রহণ করেছে। তবুও তিন অধিদপ্তরের একটিও ফল প্রকাশের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো ভূমিকা রাখছে না। এ অবস্থায় আন্দোলনের মাধ্যমেই নিজেদের অধিকার আদায় করবেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশের দাবিতে আগামী ৪ নভেম্বর অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। প্রথমে মাদ্রাসা অধিদপ্তর এবং পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সামনে কর্মসূচি পালন করা হবে।’

শিক্ষকদের আন্দোলন নিয়ে কী ভাবছে মন্ত্রণালয়
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশের দাবিতে আন্দোলনের বিষয়টি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের মাধ্যমে অবগত হয়েছেন শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, ফল প্রকাশের বিষয়টি গুরুত্বে সাথে দেখা হচ্ছে। আন্দোলন না করে ধৈর্য ধরার আহবান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্কুল-কলেজে কর্মরত শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশে টেকনিক্যাল কিছু সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যাগুলো সমাধান করে দ্রুতই ফল প্রকাশের চেষ্টা করা হচ্ছে। এ ছাড়া কারিগরি শিক্ষকদের বদলির কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। মাদ্রাসায় কর্মরত শিক্ষকদের বদলি চালু হতে কিছুটা সময় লাগবে। এ অবস্থায় আন্দোলন না করে শিক্ষকদের ধৈর্য ধরার আহবান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘শিক্ষকদের বদলির ফল সময় হলেই প্রকাশ হবে। এটি নিয়ে আন্দোলনের কিছু নেই। কারিগরি কিছু বিষয় রয়েছে। এর সমাধান হলে ফল প্রকাশ করা হবে।’

শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশে একাধিক জটিলতা
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি আবেদন শেষ হয়েছে গত ১৩ সেপ্টেম্বর। আবেদন শেষ হওয়ার প্রায় দেড় মাস হতে চললেও এখনো ফলাফল প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনে শিক্ষামন্ত্রীর অসন্তোষ এবং একাধিক জটিলতার বিষয় সামনে এসেছে।

জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলির ফল না প্রকাশ করার নেপথ্যে সফটওয়্যার সংক্রান্ত কোনো জটিলতা নেই। জটিলতা তৈরি হয়েছে ঢাকা বদলি হতে চাওয়া শিক্ষকদের কারণে। এমপিওভুক্ত অনেক শিক্ষক ঢাকায় বদলি হয়ে আসতে চাচ্ছেন। তাদের পক্ষে বিএনপি সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তদবির করছেন। অধিকাংশ শিক্ষককে ঢাকায় বদলি করা হলে কাকে কোন প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে সেটি নিয়েও তদবির চলছে।

সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষকদের একটি অংশ বদলি আবেদন বাতিল করতে চায়। এজন্য তারা ডিলেট অপশন চালুর দাবিতে শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার কাছে আবেদন করেছেন। এই আবেদনের বিষয়গুলো ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে শিক্ষা প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা অবহিত করেছেন। যার বলে শিক্ষামন্ত্রী অনেকটাই অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষকদের আরেকটি পক্ষ বদলি আবেদনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পছন্দ করা থেকে শুরু করে নানা সমস্যা দেখিয়ে আবেদন এডিট করতে চাচ্ছেন। এজন্যও পৃথকভাবে আবেদন জমা পড়েছে। 

বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের আরেকটি পক্ষ শতবর্ষী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। শতবর্ষী প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের আওতায় আসার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এই মুহূর্তে বদলি হতে চাচ্ছেন না। এজন্য তারা জোর তদবির চালাচ্ছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, অনেকের স্বামী-স্ত্রীর বনিবনা হচ্ছে না, এজন্য তারাও বদলির সুযোগ চাচ্ছেন না। বর্তমান কর্মস্থলেই থাকার আগ্রহ প্রকাশ করছেন তারা। শিক্ষকদের একাধিক আবেদন, তদবির এবং চাপের কারণে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। এজন্য বদলি কার্যক্রম অনেকটাই থমকে গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘বদলির ফল প্রকাশের জন্য আমরা প্রস্তুত। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা পেলে সাত কার্যদিবসের মধ্যে বদলির ফল প্রকাশ করা হবে।’

মাদ্রাসার বদলি জানুয়ারি অথবা ফেব্রুয়ারিতে
বেসরকারি মাদ্রাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি সফটওয়্যার তৈরি নিয়ে একটি টেন্ডার হয়েছে। টেন্ডার হলেও ইভ্যালুয়েশন শেষ হয়নি। প্রথম টেন্ডারের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয়বার আরেকবার টেন্ডার হবে। এরপর সফটওয়্যার তৈরি হলে শিক্ষকদের বদলির আওতায় নিয়ে আসা হবে।

সম্প্রতি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসের সাথে আলাপকালে এসব কথা জানান মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন।

দুইবার টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কারণ জানতে চাইলে মহাপরিচালক জানান, ‘এটি সার্ভিস টেন্ডার; এজন্য দুইবার করতে হচ্ছে। তবে সব কার্যক্রম দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।’

মাদ্রাসা শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম কবে নাগাদ শুরু হতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে মুহাম্মদ শাহাদাত হোসাইন আরও বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম শুরু করতে আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি মাস লেগে যেতে পারে। এর আগে বদলি কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না।’ 

শিক্ষকদের বদলি কেন প্রয়োজন
এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বেতন সামান্য। নিজ বাড়ি থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে চাকরি করছেন। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবার ছেড়ে দূরে থাকতে হচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয়দের দ্বারা নানা ভাবে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। সামান্য বেতনের কারণে পরিবারকেও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছে না।

মো. রাশেদ মোশাররফ নামে এক শিক্ষক জানান, পুরুষদের চেয়ে নারী শিক্ষকদের বদলি বেশি দরকার। কেননা তারা স্বামী ছাড়া বা পরিবার ছাড়া থাকছেন। বদলির ফল প্রকাশ হলে নারীরা তাদের স্বামীর কর্মস্থল বা পরিবারের কাছে যেতে পারবেন। এজন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের বদলির ফল প্রকাশ করা দরকার।

শিউলি খাতুন নামে আরেক শিক্ষক বলেন, ‘বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর বদলি ব্যবস্থা না থাকা এবং পছন্দের প্রতিষ্ঠানে শূন্য পদের তীব্র সংকটের কারণে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী শিক্ষকরা। স্বামীর কর্মস্থল থেকে শত শত কিলোমিটার দূরে থাকা, সন্তান লালন-পালন এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি চাকরি বজায় রাখতে গিয়ে অনেকে মারাত্মক মানসিক, শারীরিক ও পারিবারিক সংকটে পড়ছেন। এমনকি এই দূরত্বের কারণে অনেকের বৈবাহিক জীবনে অশান্তি তৈরি হচ্ছে এবং সংসার ভেঙে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এ অবস্থায় আমরা দ্রুত বদলির ফল চাই।’