Image description
Shamim Anwar(শামীম আনোয়ার)
 
 
[গাজীপুরে মাদ্রাসার হুজুর কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীকে চু মু-কাণ্ড এবং তার প্রতিক্রিয়ায় বডিবিল্ডার অভিভাবক কর্তৃক দশাসই থাপ্পড় কষানোর পক্ষে-বিপক্ষের পোস্টে এখন ফেসবুক সয়লাব। এ সংক্রান্তে আপনাদের সবার আবেগের বিপরীতে ভীষণ অপ্রিয় কিছু কথা বলব বলব করছিলাম কয়েকদিন ধরেই। আজ বলে ফেলি, কেউ আমাকে বকা-টকা দিয়েন না।]
 
আমাদের দেশের মাদ্রাসাগুলো আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য শুধু শিক্ষার মাধ্যম না। ধর্মীয় এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার অবলম্বন। বহু কায়ক্লেশে জীবন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও তারা ছেলেটাকে মাদ্রাসায় দেয়। বুকের ধনটাকে হুজুরের কাছে দিয়ে আসে কোরানে হাফেজ বা আলেম বানানোর স্বপ্ন নিয়ে। উদ্দেশ্য- কষ্টের দুনিয়াবি জীবন শেষে আখেরাতে এই ছেলের উছিলায় তারা যেন জান্নাতে স্থান পান, আল্লাহ পাকের দিদার যেন নসিব হয়। অপ্রাপ্তিতে ভরা দুনিয়ার পর আখেরাতেও যেন সেই অপ্রাপ্তিতে থাকতে না হয়, তাদের চোখে সেই স্বপ্ন পূরণের পবিত্র অঙ্গন একেকটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসার আলেমদেরকেও তারা সেই স্বপ্নের সারথি হিসেবে ভীষণ শ্রদ্ধায়, গভীর ভালবাসায় সমাজে স্থান দেয়।
 
বলাৎকারকারী হুজুর, যারা তাদের চরম গর্হিত, চরম নিকৃষ্ট কাজের মাধ্যমে এই স্বপ্নগুলোর গায়ে কালি ছিটিয়ে দেয়, স্বপ্নগুলোর মৃত্যু ঘটায়, তাদেরকে শুধু একটি থাপ্পড় নয়, দু'চারটি কিল-ঘুষি নয়, এমনকি কয়বছরে জেলও নয়, আইনি বাঁধা দূর করে তাদেরকে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন।
 
আপনাদের তুলনায় আমার জ্ঞানগরিমা অনেক কম, প্রায় শুন্যের কোটায়। তবুও বলি- থাপ্পড়কে সমর্থন করতে গিয়ে, অন্যায়কারী হুজুরের আচরণের নিন্দা জানাতে গিয়ে আমরা যেন দেশের বিশাল সংখ্যক মাদ্রাসা শিক্ষক- শিক্ষার্থীর উপর অন্যায্যভাবে অপমানসূচক কথা, তুচ্ছতাচ্ছিল্য-ভরা আচরণ চাপিয়ে না দেই।
 
প্রধানত গরিব ঘরের এই লোকগুলো অতি অতি সাধারণ জীবনযাপন করে দ্বীনি জ্ঞান চর্চায় নিয়োজিত থাকে। আমি হাজার হাজার বার চাক্ষুষ দেখেছে, তাদের ৯৯% ই খুব বিনয়ী ভদ্র ও ইতিবাচক চিন্তাধারার অধিকারী (আমার কথা বিশ্বাস না হলে আপনারা মিশে দেখতে পারেন)। সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকা, নীতিনির্ধারকদের ভুল এবং আরো কিছু কারণে তাদের অতি ক্ষুদ্রাংশ লেবাসধারী অমানুষ ছাত্রদের উপর যৌন সহিংসতাসহ অন্যান্য অপকর্মে লিপ্ত হয় বা হওয়ার সাহস পায়।
 
একটি জনগোষ্ঠীর অতি ক্ষুদ্রাংশের আচরণকে শিখণ্ডী করে তাদের সবাইকে ধর্ষক, লুতি কাওম ইত্যাদি বলে অপপ্রচার চালিয়ে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, অপমানজনক ভাষায় আক্রমণ করা জায়েজ হলে তো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিসিএস ক্যাডার, ছাত্র, শিক্ষক সবাই-ই তো ধর্ষক, সবাই কওমে লুত!! ধর্ষণ, বলাৎকার কোথায় হয়নি, কোথায় হয় না!!! যদি এটা মেনে নিতে আমাদের কষ্ট লাগে তাহলে একই বিষয় দ্বীনের খেদমতগার এই লোকগুলোর ওপর আরোপ করা অন্যায় হচ্ছে কিনা, যদি আমরা একবার ভেবে দেখতাম!
 
টঙ্গীর ঘটনা ও থাপ্পড় কাণ্ডকে সমর্থন করতে গিয়ে গোটা মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই ঘৃণা ছড়ানোর বদলে রাষ্ট্রের কাছে আমরা কি এমন দাবি তুলতে পারতাম না যে, মাদ্রাসাগুলোকে যেন এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, সারা দুনিয়ায় ধর্ষণ, বলাৎকার হলেও সেখানে যেন কেউ তা কল্পনাও না করতে পারে। কলেজ, ভার্সিটি, ইংরেজি মিডিয়াম ইত্যাদিতে পড়ুয়াদের নিয়ে হাজার সংশয় থাকলেও মাদ্রাসা গ্রাজুয়েটদের ক্ষেত্রে যেন নীতির প্রশ্নে সবাই নিঃসংশয় থাকতে পারেন।
 
এমন ব্যবস্থা যেন তৈরি করা হয়, লেবাসধারী এসব কুকুর যেন মাদ্রাসার চাকরিতে ঢুকার সুযোগই না পায়। অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় মাদ্রাসায় সারভেইল্যান্স যেন কয়েকগুণ বেশি করা নিশ্চিত করা হয়। কঠোর স্বচ্ছতা, নিয়মশৃঙ্খলা, জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মাদ্রাসা ও এর শিক্ষক- শিক্ষার্থীদেরকে যেন দেশের সর্বোচ্চ সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হবার উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলা হয়!
কিন্তু সেটা করার বদলে আমরা কয়েকজনের দোষে গোটা ব্যবস্থাটিকে নিয়েই যে উপহাস, হাসাহাসিতে মেতে উঠলাম, ফেসবুকে- সমাজ মাধ্যমে গোটা আলেম সমাজকে ভিলিফাই করলাম, তাদের সবাইকে অন্যায্যভাবে সমাজের কাছে জঘন্য মানুষ হিসেবে তুলে ধরলাম।
 
মাদ্রাসা মানেই বলাৎকারের আস্তানা আর আলেম মানেই পায়ুযোদ্ধা, লুতি কাওম, বলাৎকারকারী ইত্যাদি সাব্যস্ত করে ফেসবুকে, অনলাইনে, অফলাইনে পোস্ট করে সীমাহীন অন্যায়ের বেসাতি করেলাম, মাদ্রাসা শিক্ষা তথা আলেমদের উপর মানুষের মন বিষিয়ে তুললাম, মাদ্রাসা শিক্ষা যেন এ দেশ থেকে উঠে যায়, নিজের অজান্তেই সেই জনমত তৈরি করায় যে ভূমিকা রাখলাম, সেজন্য আমরা অনুতপ্ত হব কি?
......................................................................
শামীম আনোয়ার
বিসিএস (পুলিশ)
এডিশনাল স্পেশাল এসপি ( সিআইডি)
সিআইডি হেডকোয়ার্টার্স, মালিবাগ, ঢাকা।