২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পৌনে ৭টা। খুলনা নগরীর জিন্নাহপাড়া বউবাজারের সাত নম্বর গলিতে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে লুটিয়ে পড়েন গৃহবধূ খুশি বেগম (২৫)। দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলায় তার মৃত্যুতে নগর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক। তার আগে, একই দিন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে নগরীর মিস্ত্রিপাড়া বাজারের আনসার উদ্দিন লেনে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মো. তুষার (২৭) নামে এক যুবক নিহত হন।
শুধু খুশি বেগম ও মো. তুষারের হত্যাকাণ্ড নয়; একের পর এক খুন, প্রকাশ্যে গুলি, মসজিদের ভেতরে গুলি, আদালতের সামনে জোড়া হত্যাকাণ্ড, হত্যা মামলার বাদীকে খুন এবং সশস্ত্র হামলা-ছিনতাইয়ের ঘটনায় ক্রমেই বাড়ছে নগরবাসীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মহানগরীতে হত্যাকাণ্ড হয়েছে ৩৭টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানগরীতে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে ৩৩টি। এরপর ২২ অক্টোবর খুন হন আরও দুজন।
অন্যদিকে জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত ৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে খুলনা জেলায়। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন ৬৯ জন।
গত ৫ অক্টোবর রাতে রূপসা উপজেলার দুর্জনীমহল গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন আক্তার ঢালী। এর প্রায় দেড় মাস আগে খুন হন তার ছেলে জয় ঢালী। ছেলের হত্যা মামলার বাদী ছিলেন আক্তার ঢালী। অর্থাৎ ছেলে হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেই হত্যার শিকার হলেন তিনি।
এর আগে গত বছরের ৩০ নভেম্বর খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে প্রকাশ্যে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় ফজলে রাব্বি রাজন ও হাসিব হাওলাদারকে। একটি অস্ত্র মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে এসেছিলেন তারা। হাজিরা শেষে বের হওয়ার সময় কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা চালায়। ঘটনাস্থলেই মারা যান হাসিব। গুরুতর আহত রাজনকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
গত বছরের ১৬ নভেম্বর নগরীর লবণচরা এলাকায় একই পরিবারের দুই শিশু ও তাদের নানিকে হত্যা করা হয়। নিহত শিশু মুস্তাকিমের বয়স ছিল আট বছর, ফাতিহার সাত বছর। তাদের নানি মহিতুন্নেছার বয়স ছিল প্রায় ৫৫ বছর। এ ঘটনায় মামলা হওয়ার পর কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
চলতি বছরের ৪ মার্চ নগরীর ব্যস্ত ডাকবাংলো মোড়ে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় রূপসা উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি মাসুম বিল্লাহকে। হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে তিনি একটি শোরুমে আশ্রয় নিলেও সেখানে ঢুকে তাকে গুলি করা হয়।
গত ১৪ জুন দৌলতপুরের পশ্চিম কাশীপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র জামে মসজিদের ভেতর গুলিবিদ্ধ হন মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি লোকমান হাকিম। ফজরের নামাজ শেষে কোরআন তেলাওয়াতের সময় তার ওপর হামলা চালানো হয়।
গত ৯ অক্টোবর রাত আড়াইটার দিকে খুলনা কলেজিয়েট স্কুলের সামনে ছিনতাইকারীদের হামলায় গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম। বিশেষ অভিযান শেষে রিকশায় পুলিশ ক্লাবে যাওয়ার পথে তিন দুর্বৃত্ত তার পথরোধ করে টাকা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। বাধা দিলে ধারালো চাপাতি দিয়ে তার দুই হাতের কবজিতে গুরুতর জখম করা হয়।
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বললেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ভয়াবহ। খুনোখুনিতে অতীতের রেকর্ডও ছাড়িয়ে গেছে। মাদক নিয়ে বিরোধ এবং ৮ থেকে ১০টি সন্ত্রাসী গ্রুপের কাছে খুলনা জিম্মি।
তিনি আরও বলছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর খুলনা সফরকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেখানে আরও কঠোর এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার থাকার কথা, সেখানে দিনের শুরুতেই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী সফর শেষে ফিরে যাওয়ার সময় সন্ধ্যায়ও খুলনায় ঘটে আরেকটি হত্যাকাণ্ড। গুরুত্বপূর্ণ এই সফর ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থার মধ্যেও এমন ঘটনা নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
‘এমনকি দায়িত্ব পালন শেষে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশের এক পরিদর্শক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যও যেখানে নিরাপদ নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে’— বললেন তিনি।
এ ব্যাপারে বক্তব্য পেতে কেএমপি কমিশনারসহ একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু কেউ কথা বলতে রাজি হননি।