রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি ও সংস্কারের অভাবে বিশ্ব স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন জাতীয় সংসদ ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা। বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ছে ভবনের বিভিন্ন স্থানে।
এ পরিস্থিতিতে সংসদ ভবনের অবকাঠামোগত সংস্কার, সৌরবিদ্যুতের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং সংসদীয় কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তর—বর্তমানে এই তিন বিষয়ে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ ভবন ও এর প্রাঙ্গণের পরিচ্ছন্নতা, সবুজায়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সূত্র মতে, প্রায় ৪৫ বছরের পুরনো সংসদ ভবনের মূল স্থাপনা ছাড়াও দক্ষিণ প্লাজা, ভিআইপি বাংলো, মিনিস্টার্স হোস্টেল, পুরনো সংসদ সদস্য হোস্টেল ও সচিব হোস্টেলের বিভিন্ন আবাসিক ও অনাবাসিক ভবনের ভেতর পানি পড়ার সমস্যা রয়েছে।
এদিকে সংসদ ভবনের প্রবেশপথে জলাবদ্ধতার সমস্যা রয়েছে। মানিক মিয়া এভিনিউয়ের বকুলতলা গেট সামান্য বৃষ্টিতে ডুবে যায়। এ পথটি সংসদ ভবনে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ। ফলে বৃষ্টির সময় চলাচল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় বাড়তি ভোগান্তি তৈরি হয়। এমনকি বৃষ্টি হলেই সংসদ ভবনের ছাদ থেকে বিভিন্ন স্থানে পানি পড়ে। বিষয়টি গত সংসদ অধিবেশনে তুলে ধরেন সরকারদলীয় সংসদ সদস্য হুইপ জি কে গউছ। স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, ‘সংসদের মসজিদের সামনে সারি
সারি বালতি রাখতে হচ্ছে। কারণ, ছাদ ফেটে অনবরত বৃষ্টির পানি ভেতরে পড়ছে।’
এরপর অধিবেশনে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদ ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ার বিষয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, সংসদ ভবন এলাকার নিজের বাসায়ও ছাদ থেকে পানি পড়লে বাটি দিয়ে রাখতে হয়।
পরে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বিষয়টি গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন উল্লেখ করে এক সপ্তাহের মধ্যে সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তবে সেই সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান হয়নি।
এমএমপির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান জানান, বৃষ্টির পানি থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষায় দক্ষিণ প্লাজার ছাদের নিচে প্রতিটি যন্ত্রের ওপর টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়, সাময়িক ব্যবস্থা।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, গত ১৫ অক্টোবর সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিদর্শন করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওই সময় তিনি সংসদ ভবন প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখা, সবুজায়ন এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব নাজমুল হক জানান, পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভবন প্রাঙ্গণের মাঠ, বাগান ও বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। তিনি এলাকার সার্বিক পরিবেশ, অবকাঠামোগত অবস্থা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সংসদ প্লাজার সৌন্দর্য ও পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে নিয়মিত পরিচর্যা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। মাঠ ও বাগান পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি গাছপালার পরিচর্যা এবং সবুজায়ন কার্যক্রম বাড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি সংসদ ভবন প্লাজা ও আশপাশের যেসব স্থানে সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কাজ শেষ করারও নির্দেশনা দেন। সংসদ ভবনের স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক পরিবেশ বজায় রাখতে নিয়মিত তদারকির ওপরও গুরুত্ব দেন।
শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নাহিদ পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-আন্দোলনের সময় সংসদ ভবন এলাকায় ভাঙচুর ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর সংস্কারকাজ চলছে। সংসদ ভবনে পানি পড়া ঠেকাতে গ্লাস ব্রিকসের সংযোগস্থলগুলো মেরামত করা হচ্ছে। বিভিন্ন ভবনের ছাদও পানি প্রতিরোধী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতায় সব কাজ একসঙ্গে সম্পন্ন করা কঠিন। সংসদ ভবনের সব সমস্যার সমাধানে সমন্বিত প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই : সংসদ ভবনে বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো, সিস্টেম লস হ্রাস এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছে এসংক্রান্ত কমিটি। গত ১৫ অক্টোবর কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কমিটির আহ্বায়ক ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সভায় সংসদ ভবন ও সংসদ এলাকায় মোট বিদ্যুতের চাহিদা নিরূপণ, বিদ্যুতের ব্যবহার কমানো ও সৌর প্যানেল স্থাপনের উপযোগী ফাঁকা জায়গা চিহ্নিত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সম্ভাব্য স্থানগুলো চিহ্নিত করে মানচিত্র তৈরি এবং প্রস্তাবিত স্থানে সৌর প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনার ত্রিমাত্রিক অ্যানিমেশন তৈরি করে পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) অথবা অন্য কোনো স্বনামখ্যাত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়। এ জন্য তিন সদস্যের একটি উপকমিটিও গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্যরা হলেন—মো. আশরাফ উদ্দিন, লুত্ফুল্লাহেল মাজেদ ও মারদিয়া মমতাজ। উপকমিটির কার্যক্রমে সংসদ সচিবালয়, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি), স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা যুক্ত থাকবেন। সভায় সংসদ ভবনের মূল স্থাপত্যশৈলী এবং লুই আই কানের নকশার কোনো ব্যত্যয় না ঘটানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পরিবেশের ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাব্য প্রভাব পরীক্ষা করে দেখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া অধিবেশন ছাড়া অন্য সময়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ রাখলে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সে বিষয়ে ১৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ই-পার্লামেন্ট প্রকল্পে ১০ সদস্যের কমিটি : এদিকে সংসদীয় কার্যক্রমকে আরো আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে ইউএনডিপির প্রণীত ‘ই-জাতীয় সংসদ প্রকল্প’ বাস্তবায়নে ১০ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে সভাপতি করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন—সংসদ সদস্য এ বি এম আশরাফ উদ্দিন (নিজান), নায়াব ইউসুফ আহমেদ, মীর আহমাদ বিন কাসেম, সাঈদ আল নোমান, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান, আখতার হোসেন, লুত্ফুল্লাহেল মাজেদ ও আন্না মিনজ। মহাপরিচালক (বিঅ্যান্ডআইটি) কমিটির সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এই কমিটি ইউএনডিপি প্রণীত ই-জাতীয় সংসদ প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে বলে জানান সংসদ সদস্য আন্না মিনজ। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও নিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখতে সংসদ ভবনের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এরই মধ্যে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার ওপর।’