Image description

বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের কাকারবিল এলাকার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ইয়াসিনকে প্রতিদিন স্কুলে খাল পাড়ি দিয়ে ভিজে যেতে হয়। তাই স্কুলের পোশাকের সঙ্গে তাকে অতিরিক্ত পোশাক আনতে হয়। অনেক সময় পানি বেড়ে গেলে কিংবা খালে ওঠানামার সময় পা পিছলে পড়ে গেলে ভিজে যায় বই-খাতাও। অথচ চার মাস আগেই খালের ওপর ২৮ লাখ ২৯ হাজার ৮০১ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি কালভার্ট। কিন্তু কালভার্টে ওঠানামার জন্য নেই কোনো সংযোগ সড়ক।

শুধু কাকারবিল নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায় এমন শতাধিক সেতু-কালভার্টের সন্ধান মিলেছে; যেগুলো নির্মাণের পরও সংযোগ সড়কের অভাবে মানুষের কোনো কাজে আসছে না। কোথাও কয়েক মাস, কোথাও কয়েক বছর; আবার কোথাও তিন দশক ধরে দাঁড়িয়ে আছে এসব অবকাঠামো। অনুসন্ধানে এমন অসংখ্য সেতু-কালভার্টের খোঁজ পাওয়া গেছে, যেগুলো নির্মাণে ব্যয় হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকা। প্রশ্ন উঠেছে-কার স¦ার্থে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে এসব সেতু-কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে।

মৌলভীবাজার : মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের কান্দিগাঁও এলাকায় একটি ছোট ছড়ার ওপর প্রায় ২৯ বছর আগে নির্মাণ করা হয় সেতু। কিন্তু আজও হয়নি সংযোগ সড়ক। স্থানীয়দের দাবি, সেতুটি ব্যবহারযোগ্য হলে অন্তত চারটি ইউনিয়নের ৮ থেকে ১০টি গ্রামের মানুষ সরাসরি উপকৃত হতো। কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. সাইফুল আজম বলেন, ‘সেতুটির বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংযোগ সড়ক নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার বালাটারী গ্রামে মরা তিস্তা খালের ওপর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩০ মিটার দীর্ঘ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২২ সালে। তবে আজও হয়নি সংযোগ সড়ক। সেতুটি ব্যবহারযোগ্য না হওয়ায় স্থানীয়দের প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ ঘুরে চলাচল করতে হচ্ছে।

রাজারহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ঠিকাদারকে এখনো সম্পূর্ণ বিল দেওয়া হয়নি। চলতি মাসে সংযোগ সড়ক নির্মাণকাজ শেষ না হলে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে চুক্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ : সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৯ নম্বর কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের রামগাতী, বিয়ারাঘাট, ছোটপিয়ারি, বড়পিয়ারি, ঘোনাপাড়া, চরসাপড়িসহ আদিবাসী পল্লির কয়েক হাজার মানুষের চলাচলের জন্য প্রায় ৩০ বছর আগে একটি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আজও হয়নি সংযোগ সড়ক। গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে চলাচল করছে। এতে গর্ভবতী নারী, বয়স্ক মানুষ, শিশু ও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি সবচেয়ে বেশি।

গাইবান্ধা : সংযোগ সড়ক না থাকায় দুই বছরে চালু হয়নি গাইবান্ধার দুটি নতুন সেতু। ফলে ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সেতু দুটি অচল পড়ে আছে। গাইবান্ধা শহরের প্রবেশমুখে ঘাঘট নদের ওপর ৭৬ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের জুনে। একই সময়ে শহরের আরেক প্রবেশমুখ পুলবন্দী এলাকায় আলাই নদীর ওপর নির্মিত হয় ৯০ মিটার দীর্ঘ অন্য সেতুটি। গাইবান্ধা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী পিয়াস কুমার সেন বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ আটকে আছে। তবে দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে।’

মুন্সিগঞ্জ : মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ইমামপুর ইউনিয়নের বাঘাইয়াকান্দী-কালীপুরা এলাকায় সাড়ে ৩ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত ৫৬ মিটার দীর্ঘ সেতুতে উঠতে হচ্ছে বাঁশের সাঁকো দিয়ে। কার্যাদেশ অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো হয়নি সংযোগ সড়ক। গজারিয়া উপজেলা প্রকৌশলী সামিউল আরেফিন বলেন, ‘দ্রুত সংযোগ সড়ক নির্মাণ শেষ করার চেষ্টা চলছে।’

নারায়ণগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মনেহর ও বিনারচর এলাকার মাঝখানের খালে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পাশাপাশি দুটি ৬০ ফুট দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো হয়নি সংযোগ সড়ক। এলাকাবাসী মাটি ফেলে সেতু দুটিতে হেঁটে যাওয়ার মতো কোনোরকম একটি রাস্তা তৈরি করেছে। সেতু দুটি নির্মাণে ব্যয় হয় প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ টাকা। আড়াইহাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুর রহমান বলেন, সংযোগ সড়ক ছাড়া সেতু নির্মাণের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।

সিদ্ধিরগঞ্জ : নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) সিদ্ধিরগঞ্জের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সিআইখোলা এলাকায় ডিএনডি লেকের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি কালভার্ট। তবে এর সঙ্গে এখনো সংযোগ সড়ক নির্মাণ না হওয়ায় এটি পুরোপুরি কাজে আসছে না। নাসিকের সহকারী প্রকৌশলী মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘দাতা সংস্থার অর্থায়নে প্রকল্পটি করা হয়েছিল। দাতা সংস্থার অর্থায়নের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় কাজটি সম্পন্ন করা যায়নি। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে শিগগিরই কাজটি সম্পন্ন করা হবে।’

মেহেরপুর : মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ার দুই উপজেলার মানুষের যাতায়াতের জন্য নির্মিত সাড়ে ৭ কোটি টাকার একটি সেতু সংযোগ সড়কের অভাবে পাঁচ বছর ধরে কাজে আসছে না। মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর ৭৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটির নির্মাণকাজ শেষ হয় ২০২১ সালের শেষ দিকে। গাংনী উপজেলা প্রকৌশলী বলেন, ‘ভূমি অধিগ্রহণের কাগজপত্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়া গেছে। খুব শিগগিরই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করা হবে।’

রংপুর : রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চৈত্রকোল ইউনিয়নের সাল্টি পশ্চিমপাড়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের প্রকল্পের অধীনে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ৩৮ ফুট দীর্ঘ একটি সেতু নির্মাণ করা হয়। সংযোগ সড়ক না হওয়ায় ছয় বছরেও সেতুটি মানুষের কাজে আসেনি।’

গাজীপুর : সংযোগ সড়ক না থাকায় উদ্বোধনের তিন বছর পরও ব্যবহার করা যাচ্ছে না গাজীপুরের শ্রীপুরের বরমী বাজার এলাকায় ধাত্রী নদীর ওপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্মিত সেতুটি। অথচ বাহারি রঙের রেলিং, সড়কবাতি সব মিলিয়ে সেতু নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৯ কোটি টাকা। নির্মাণ শেষে ধুমধাম করে উদ্বোধনও করা হয়। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নুরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। বাকি কাজ দ্রুত শুরু হবে।’

পিরোজপুর : পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ও শারিকতলা ইউনিয়নের মানুষের যোগাযোগের জন্য কালিকাঠী খালের ওপর প্রায় আড়াই কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় একটি সেতু। এলজিইডির আওতাধীন সেতুটির নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ ১২ হাজার টাকা। ২০২২ সালের জুনে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও হয়েছে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ। সংযোগ সড়ক না থাকায় সেতুটিতে ওঠানামা করতে হচ্ছে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে।

বাগেরহাট : বাগেরহাটে ২১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সড়ক বিভাগের ১০টি এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) একটি সেতু-কালভার্টে ওঠার জন্য নেই সংযোগ সড়ক। সড়ক বিভাগের সাইনবোর্ড-মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা আঞ্চলিক মহাসড়কের বারুইখালী, নলবুনিয়া, তাফালবাড়ী ও শ্যামবাপারি খালের ওপর ৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত চারটি সেতুতে নেই সংযোগ সড়ক। বাগেরহাট-ডেমা-রামপাল-মোংলা সড়কে বিভিন্ন নদী ও খালের ওপর ১৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আটটি সেতুর মধ্যে ছয়টির নির্মাণকাজ শেষ হলেও সংযোগ সড়ক হয়নি। এতে গত তিন বছর চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে স্থানীয়রা।

বাগেরহাট সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, ‘ইউনূস সরকারের আমলে নির্মিত এসব সেতুর সংযোগ সড়কের জন্য ভূমি অধিগ্রহণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে ভূমি অধিগ্রহণের চেক প্রদান শুরু হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এসব সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হতে পারে।’ বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ বলেন, ‘আগামী এক মাসের মধ্যে কাকারবিল কালভার্টের সংযোগ সড়ক নির্মাণ না করলে ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করাসহ কালভার্ট নির্মাণের টাকা আটকে রাখা হবে।’