ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাম্প্রতিক সময়ে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা ও তীব্র সামাজিক সহিংসতায় গভীর দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৫০ শতাংশই যায় এ অঞ্চলে। চলমান সংঘাত অব্যাহত থাকলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি পোশাকের চাহিদাও কমে যেতে পারে। তাই নতুন কার্যাদেশ (অর্ডার) কমে যাওয়া এবং রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।
রপ্তানিকারকরা বলছেন, দেশের তৈরি পোশাকের সিংহভাগ রপ্তানি হয় ইউরোপে। সেখানে সহিংসতা বা অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে তৈরি পোশাক শিল্পে। ইউরোপীয় ক্রেতারা এখন পোশাকের বাড়তি দাম দেয়ার পরিবর্তে দাম আরও কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন। অনেক ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে নতুন মৌসুমের অর্ডারের বিষয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তিনি জানান, এমনিতেই বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির কারণে পোশাক খাত একটি চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছে। এর মধ্যে ইউরোপের মূলধারার বাজারগুলোতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা তৈরি হওয়ায় সার্বিক রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকট দীর্ঘায়িত হলে নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খোঁজার পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পোশাক খাতের জন্য কৌশলগত প্রস্তুতি নেয়া জরুরি। তবে বিক্ষোভের কারণে কতোটা রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ইইউ বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম বৃহৎ বাজার। এই বাজারে রপ্তানি কমে গেলে দেশের সার্বিক পণ্য রপ্তানিতে প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের নিট পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে শামীম এহসান বলেন, ফ্রান্সের আমার একজন বড় ক্রেতা কয়েক দিন আগে একটি ক্রয়াদেশ আপাতত স্থগিত রাখতে বলেছেন, যদিও প্রাথমিকভাবে আমাদের মধ্যে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল। তিনি বলেন, ফরাসি ক্রেতার আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী বিক্ষোভের কারণে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমার পাশাপাশি তৈরি পোশাকের চাহিদাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএ জব্বার বলেন, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। তিনি বলেন, সেখানে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিলে এবং তা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে ইইউ’র পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১.২৯ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১২.৬৭ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানিতে অবশ্য কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ইপিবি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এ বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৪.৯০ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৩৩ শতাংশ বেশি। তবে ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারে রপ্তানি কমেছে।
এদিকে ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস (বিএভি)-এর তথ্য মতে, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি থেকে আয় এসেছে মাত্র ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৮ কোটি ইউরো। কমার হার ১১.৬৭ শতাংশ।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলো ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে, যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ৬ হাজার ২৬৯ কোটি ইউরো। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ইইউতে পোশাক আমদানি কমেছে ৩.৮৩ শতাংশ। একইসময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্যও কমেছে। গত বছর প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ছিল ১৯.৯১ ইউরো, যা চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৬৫ ইউরোতে। অর্থাৎ প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য কমেছে ১.২৯ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বলছে, কয়েকটি দেশে রপ্তানি বাড়লেও গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোতে দুর্বলতা অব্যাহত থাকলে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মহিউদ্দিন রুবেল জানান, উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও ইউরোপীয় ক্রেতারা পোশাকের বাড়তি দাম দিতে রাজি নন; বরং তারা আরও কম দামে পোশাক সরবরাহের চাপ দিচ্ছেন। এতে রপ্তানিকারকদের ব্যবসায়িক চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, আবাসন ব্যয় বহনের সক্ষমতা, শিক্ষা ও সরকারি সেবা নিয়ে অসন্তোষের জেরে ফ্রান্স, ইতালি, পর্তুগাল, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
মূলত উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, কাঁচামালের মূল্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ইউরোপে চাহিদা কমে গেলে ক্রেতারা আরও কম দামে পণ্য চাইতে পারেন। এতে একদিকে মুনাফার মার্জিন কমবে, অন্যদিকে শ্রমিকদের মজুরি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় সামাল দেয়া কঠিন হতে পারে। ফলে ইউরোপের অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের পোশাক খাত একইসঙ্গে দু’টি চাপের মুখে পড়তে পারে-একদিকে ক্রয়াদেশ কমার ঝুঁকি, অন্যদিকে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিযোগিতা।