Image description

ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা কমার মধ্যে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে আরও বেশি হারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে পোশাক আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ। অর্থাৎ, ইউরোপের সামগ্রিক বাজার সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সেখানে বাংলাদেশের অবস্থানও চাপে পড়েছে।

এর মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আবাসন সংকট নিয়ে অসন্তোষ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিক্ষোভ ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোক্তাদের ব্যয় কমতে পারে। এতে পোশাকের চাহিদা এবং নতুন ক্রয়াদেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন বাংলাদেশের রফতানিকারকেরা।

তবে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমার পেছনে শুধু বিক্ষোভকে দায়ী করছেন না খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, ক্রেতাদের কাছ থেকে দাম কমানোর চাপ, প্রতিযোগী দেশগুলোর সক্ষমতা এবং দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে সুতা আমদানিতে সরকারি বিধিনিষেধ যুক্ত হওয়ায় কারখানাগুলোর ব্যয় ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ক্রয়াদেশ স্থগিতের ঘটনা

ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফ্রান্সের এক ক্রেতা বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানার ক্রয়াদেশ স্থগিত রাখতে বলেছেন। নারায়ণগঞ্জভিত্তিক নিট পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ফতুল্লা ফ্যাশন লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান এ তথ্য জানিয়েছেন।

তিনি জানান, ক্রয়াদেশটি নিয়ে আগে সমঝোতা হয়েছিল। পরে ফ্রান্সের ওই ক্রেতা সেটি স্থগিত রাখতে বলেন।

ফজলে শামীম এহসানের আশঙ্কা, ফ্রান্সে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেলে তৈরি পোশাকের চাহিদাও কমতে পারে।

তবে স্থগিত করা ক্রয়াদেশের পরিমাণ, মূল্য এবং সিদ্ধান্তের পেছনে বিক্ষোভের ভূমিকা কতটা—তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। একটি ক্রয়াদেশ স্থগিতের ঘটনা দিয়ে পুরো ইউরোপের বাজারে একই প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। তারপরও ক্রেতাদের এমন সিদ্ধান্ত রফতানিকারকদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

ডিবিএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জব্বার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশ এমনিতেই তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। সেখানে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি এবং তা দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’’

ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে পোশাক রফতানিকারক উর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফও একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন।

তবে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মনে করেন, পোশাকের ক্রয়াদেশ কমার পেছনে বিক্ষোভের চেয়ে ইউরোপের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রভাব বেশি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেও ক্রয়াদেশ কমছে। তবে ইউরোপের পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি খারাপ।

রফতানি কমেছে, দামও কমেছে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য কমে ৬০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। আগের বছরের একই সময়ে এ আমদানির পরিমাণ ছিল ৬২ দশমিক ৬৯ বিলিয়ন ইউরো।

একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক আমদানির মূল্য ১৩ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ইউরো থেকে কমে ১১ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ইউরো হয়েছে। অর্থাৎ, আট মাসে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের পরিমাণ কমেছে প্রায় ১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরো।

তবে রফতানির মূল্য কমার পাশাপাশি পোশাকের চালান ও গড় একক মূল্য—দুটিই কমেছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক সরবরাহের পরিমাণ কমেছে ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রতিকেজি পোশাকের গড় একক মূল্য ১৪ দশমিক ৮৭ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো হয়েছে, যা ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ কম।

অর্থাৎ, শুধু কম পরিমাণ পোশাক রফতানির কারণে আয় কমেনি; প্রতিকেজি পোশাকের গড় মূল্য কমারও প্রভাব রয়েছে। তবে গড় মূল্য কমে যাওয়ার পেছনে ক্রেতাদের দরকষাকষির পাশাপাশি রফতানি হওয়া পোশাকের ধরন ও মানের পরিবর্তনের মতো বিষয়ও ভূমিকা রাখতে পারে।

এদিকে, ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগী কয়েকটি দেশের রফতানি  বেড়েছে। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ে চীন থেকে ইইউতে পোশাক আমদানি ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ এবং ভিয়েতনাম থেকে আমদানি ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেড়েছে। ফলে বাজারের সামগ্রিক সংকোচনের মধ্যেও এসব দেশের রফতানি বাড়ার বিপরীতে বাংলাদেশের রফতানি কমে যাওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক রফতানি পরিসংখ্যানে কিছুটা ইতিবাচক চিত্রও রয়েছে। রফতানি  উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ বেড়ে ৪ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

মন্থর অর্থনীতি বাড়াচ্ছে অনিশ্চয়তা

ইউরোপের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও পোশাকের চাহিদার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

প্রবৃদ্ধির মন্থরতা ও মূল্যস্ফীতির চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং ব্যয়ের সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়তে পারে। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম ও আবাসনসংকট নিয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে এ পরিস্থিতি পোশাকের বাজারেও অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমলেই পোশাকের আমদানি একই হারে কমবে, এমন নয়। ভোক্তাদের আয়, খুচরা বিক্রেতাদের মজুত, পোশাকের দাম এবং আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনাও বাজারের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের রফতানিকারকদের জন্য তাই ইউরোপের বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক প্রভাবের পাশাপাশি ক্রেতাদের দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়পরিকল্পনা ও বাজারের চাহিদার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধে বাড়তি ব্যয়ের চাপ

ইউরোপের বাজারে চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির আরেকটি কারণ হিসেবে সুতা আমদানিতে সরকারি বিধিনিষেধের কথা বলছেন রফতানিকারকেরা।

দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দিতে নিট পোশাক তৈরিতে ব্যবহৃত ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতা আমদানিতে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রত্যাহার করেছে সরকার। নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের আমদানি করা সুতার মূল্যের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক গ্যারান্টি দিতে হবে। ওই সুতা দিয়ে তৈরি পোশাক রফতানি  এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পর গ্যারান্টি অবমুক্ত করা যাবে।

রফতানিকারকদের দাবি, নতুন ব্যবস্থায় আমদানির প্রক্রিয়া জটিল হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এতে তুলনামূলক বেশি দামের দেশীয় সুতা ব্যবহারের চাপ তৈরি হচ্ছে। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতারা যখন পোশাকের দাম বাড়াতে রাজি নন, তখন বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

ফকির ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, ‘‘আমদানি করা প্রতিকেজি ৩০ কাউন্টের কম্বড সুতার দাম ৩ দশমিক ১৫ ডলার। একই ধরনের সুতা দেশের বাজারে কিনতে খরচ হয় ৩ দশমিক ৭৫ ডলার।’’

তার হিসাবে, দেশীয় সুতা ব্যবহার করতে হলে প্রতি পোশাকের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১৫ সেন্ট বাড়তে পারে। অথচ ইউরোপের অধিকাংশ ক্রেতা এক সেন্টও বাড়তি দাম দিতে রাজি নন বলে তিনি জানান।

নাহিদ বলেন, ‘‘জ্বালানি সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সুবিধার পার্থক্য বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাকে আরও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।’’

দেশীয় বস্ত্রশিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও রফতানিমুখী কারখানার জন্য কাঁচামালের দাম ও সরবরাহের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকদের সক্ষমতা, মান, দাম এবং রফতানিকারকদের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে নীতি নির্ধারণের প্রয়োজন রয়েছে।

ক্রয়াদেশ চলে যেতে পারে প্রতিযোগী দেশে

ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের রফতানি কমার বিপরীতে চীন ও ভিয়েতনামের রফতানি বাড়ার তথ্য প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জকে আরও স্পষ্ট করেছে। এ ছাড়া ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গেও বাংলাদেশের রফতানিকারকদের প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে।

ফকির কামরুজ্জামান নাহিদ বলেন, ‘‘আগামী একমাস তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ের মধ্যে সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া না হলে বাংলাদেশে আসার সম্ভাবনা থাকা কিছু ক্রয়াদেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, ভারত ও পাকিস্তানের মতো দেশে চলে যেতে পারে।’’

এদিকে, পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও সামনে রয়েছে। মজুরি বাড়লে শ্রমিকদের আয় বাড়বে। তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দাম নিশ্চিত করা না গেলে কারখানাগুলোর ওপর আর্থিক চাপ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

সব মিলিয়ে ইউরোপের বাজারে চাহিদার অনিশ্চয়তা, বাংলাদেশের রফতানির গড় মূল্য কমে যাওয়া, প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি এবং দেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির চাপ তৈরি পোশাকশিল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। ইউরোপের বিক্ষোভ এই পরিস্থিতিতে নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যদিও রফতানি কমার প্রধান কারণ হিসেবে এর ভূমিকা এখনও নিশ্চিত নয়।

এ পরিস্থিতিতে ইউরোপের ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক ধরে রাখা, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, পণ্যের মান ও বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতামূলক দামে পোশাক সরবরাহের সক্ষমতা জোরদার করা জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।