সম্প্রতি রাজশাহীতে একটি জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অভিযোগ করেছেন, ‘‘সরকারের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আছে—পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দল আঁতাত করেছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে, আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।’’ দেশের সরকার-প্রধানের এমন বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিশ্লেষণ চলছে। অনেকে বলছেন, রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর মুখে এ ধরনের বক্তব্য হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
বিষয়টিকে একেকজন একেকভাবে মূল্যায়ন করছেন। কেউ বলছেন, আওয়ামী লীগ-জামায়াতের বোঝাপড়া আগেও ছিল। সুতরাং রাজনৈতিক প্রয়োজনে এখন হতে পারে না, এটা বলা যাবে না। ক্ষমতাসীন দলের নেতারাও তা-ই মনে করেন। তাদের দৃষ্টিতে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত ক্ষমতার জন্য সবই করতে পারে।
অবশ্য জামায়াতের দাবি, এ ধরনের অভিযোগের কোনও ভিত্তি নেই। তবে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখতে চায় আরেকটি পক্ষ। তাদের দাবি, রাজনৈতিক দলের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারি করা আইনসম্মত নয়। এটি গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অতীতে আওয়ামী লীগও এমনটি করেছে। সত্যিই যদি কেউ দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র করেই থাকেন, তবে সেটা খতিয়ে দেখা সরকারের দায়িত্ব।
জামায়াত ও আওয়ামী লীগের অতীতের বোঝাপড়া
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্যমতে, ‘‘ভারতে থাকা আওয়ামী লীগ ও দেশে থাকা বিরোধী দলের আঁতাত স্পষ্ট। তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে। দুই শক্তি মিলেই দেশে অস্থিরতা করতে চায়।’’ তার এ বক্তব্যের বাস্তবতা কতটুকু? এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা। তবে সরকার-প্রধানের এ ধরনের বক্তব্য ফেলে দেওয়ার মতো নয় বলে মনে করেন তারা। কারণ অতীতে তো দুই দলের মধ্যে রাজপথে আন্দোলনের নজির রয়েছে। অবশ্য কোনও রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে গোয়েন্দা নজরদারি করা যায় কিনা, সে প্রশ্ন তুলছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল্লাহ আল ক্বাফী (রতন) বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আওয়ামী লীগ ও জামায়াত নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কীসের ভিত্তিতে ইঙ্গিত করেছেন, তা তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে তার ধারণা একেবারেই অমূলকও বলা যাবে না। কারণ রাজনৈতিক স্বার্থে এই দুই দলের মধ্যে এক ধরনের বোঝাপড়া সব সময়ই ছিল। অতীতে তারা একসঙ্গে আন্দোলন করেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের একটি অংশের ভোট পেয়েছে জামায়াত। না হলে তো তারা দুই কোটির বেশি ভোট পাওয়ার কথা নয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলের প্রতি গোয়েন্দা নজরদারির বিষয়টিও সমর্থনযোগ্য নয়। যা অতীতে আওয়ামী লীগও করেছে। এতে একটি দলের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে—যা গণতন্ত্রেরে জন্য অশনিসংকেত।’’
কী ধরনের ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন ক্ষমতাসীনরা
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী দল দেশের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছে, এ নিয়ে সুস্পষ্ট তথ্য দিয়েছেন সরকার-প্রধান। একই কথা বলেছেন ক্ষমতাসীন দল বিএনপির নেতারাও।
এ বিষয়ে রাজশাহীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, দেশের কয়েকটি জায়গায় ও কয়েকটি কলকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছে। এ বিষয়ে আমি পরিষ্কার করে হাজারও মানুষের সামনে একটি কথা বলতে চাই। পরিষ্কার গোয়েন্দা তথ্য আছে, যে স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে তারা সেখানে অর্থ সরবরাহ করছে। অর্থ সরবরাহ করে কাদের সাহায্য করছে। এই যে কিছু লোক আছে, যারা ভ্রান্তি ছড়ায় দেশে, যারা বিভিন্ন টিকিট বিক্রির চেষ্টা করেছিল নির্বাচনের আগে মিথ্যা কথা বলে। এই দুইপক্ষ এক হয়েছে। একজন পয়সা দিচ্ছে সীমান্তের ওপার থেকে। আরেকজন এখানে বসে অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা করছে। এদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের বক্তব্য কতটুকু সত্য এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরই দেশের মানুষের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী রাত-দিন পরিশ্রম করছেন। কিন্তু আমাদের প্রধান বিরোধী দল বিভিন্ন স্থানে হাঙ্গামা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তারা অহেতুক দাবি নিয়ে রাজপথে বিশৃঙ্খলা করতে চায়। অপরদিকে পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের নেতারাও ভারতে বসে দেশবিরোধী নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। আমরা মনে করি, এই দুই শক্তির কর্মকাণ্ডের সাদৃশ্য রয়েছে। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তবে বিরোধী দল স্বৈরাচারের ফাঁদে পা দিলে নিজেরাও বিপদে পরতে পারে।''
বক্তব্য দিয়েই কি দায় শেষ?
দুই রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে খোদ সরকার-প্রধানের পক্ষ থেকে ষড়যন্ত্র ও আঁতাত করার অভিযোগকে উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছেন অনেকে। তারা বলেন, সত্যিই যদি কোনও দল বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সম্মিলিত ষড়যন্ত্রের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তো শুধু বক্তব্য দিয়েই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। বরং এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা খোলাসা করা উচিত।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘‘পতিত স্বৈরাচার ও বিরোধী দলের আঁতাতের যে অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী করেছেন, তা খুবই উদ্বেগজনক।’’
তিনি বলেন,‘‘আমরা মনে করি, সরকার-প্রধানের এই বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। রাষ্ট্রের কাছে তথ্য থাকার পরও শুধু জনসভায় বক্তব্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। বরং তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হয়। কারণ জাতি আর কোনোভাবেই পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন দেখতে চায় না।’’ তিনি জানতে চান, প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে।
গণঅধিকার পরিষদের সিনিয়র সহ-সভাপতি ফারুক হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয়ই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন। তাই অবশ্যই ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’’
গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন বিরোধী দলের
সরকার-প্রধান বলছেন, তাদের কাছে ষড়যন্ত্রের সুস্পষ্ট প্রমাণ আছে। তবে এ ধরনের বক্তব্যকে এক ধরনের স্ট্যান্টবাজি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বিরোধীদলীয় নেতারা। তাদের অভিযোগ, সরকারের কাছে যদি গোয়েন্দা তথ্য থেকেই থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে আওয়ামী লীগ মিছিল করে কীভাবে? নিশ্চয়ই গোয়েন্দা ব্যর্থতা আছে। অথবা তারা সরকারের ভেতরে ঘাপটি মেরে থেকেই ফ্যাসিবাদী শক্তির পক্ষে কাজ করছে।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য সত্য হলে প্রশ্ন হলো, গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? আর বক্তব্যের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি না থাকলে এমন স্পর্শকাতর অভিযোগ তুলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা কেন? তিনি গোয়েন্দা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়েও তোলেন।’’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং দলটির প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহছানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। মূলত বিরোধী দলের যৌক্তিক আন্দোলনকে বিতর্কিত করতেই তিনি এ ধরনের কথা বলছেন। জামায়াত নয়, বরং বিএনপিই আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘কারণ খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকা গুলশানে বড় ধরনের শোডাউন দিয়েছে পতিত আওয়ামী লীগ। তারা কোনও ধরনের বাধার সম্মুখীন না হওয়ার কারণ হলো—প্রশাসনে এখনও ফ্যাসিবাদী শক্তির শক্তিশালী অবস্থান আছে। অথচ সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের ব্যবস্থা না নিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপাচ্ছে।’’ জামায়াতের এই নেতা আরও বলেন, ‘‘এ ধরনের আচরণ অব্যাহত রাখলে সামনের দিকে সরকারকে বড় ধরনের খেসারত দিতে হবে।’’