রেল সিগন্যালের তোয়াক্কা নেই, গেটম্যানের উচ্চ চিৎকারেও ভ্রুক্ষেপ নেই। সাইরেনের শব্দকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে রেললাইনে উঠে পড়ছে একের পর এক সড়কযান। দেশের প্রায় ৮২ শতাংশ লেভেলক্রসিংই অরক্ষিত, গেটম্যানবিহীন। রেলে ১৪৬৮টি লেভেল ক্রসিং বৈধ। আর অবৈধ প্রায় ১৫০০টি। বৈধ কিংবা অবৈধ-ক্রসিংগুলোর বুক চিরে দেদার চলছে অটো, মোটরসাইকেল, বাস, ট্রাক, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার থেকে শুরু করে ভারী লরি। কয়েক মিনিট অপেক্ষা করার ধৈর্যটুকুও হারিয়ে ফেলছেন সড়কযান চালকরা। গেট পড়ার মুহূর্তেও নিচ দিয়ে যান পারাপার হচ্ছে। এমন অসচেতনতা ও পরোয়াহীন চলাচলই যে কোনো মুহূর্তে ডেকে আনছে বড় বিপর্যয়। বছরে ৩৫০ জনের বেশি প্রাণ যাচ্ছে লেভেল ক্রসিং দুর্ঘটনায়। তবু হুঁশ হচ্ছে না একদল বেপরোয়া চালকের। এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে আজ পালিত হচ্ছে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’।
১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনে স্পষ্ট-লাইনের উভয় পাশে মোট ২০ ফুট এলাকায় ২৪ ঘণ্টাই আইনত ১৪৪ ধারা জারি থাকে। লেভেলক্রসিংয়ের দুপাশ দেখে-শুনে নিজ দায়িত্বে সড়ক যান পারাপার করবে। লাইনের ২০ ফুট এলাকা এবং ক্রসিংয়ে কোনো প্রকার দুর্ঘটনা হলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কখনোই দায়ী থাকবে না। দুর্ঘটনার দায় নিচ্ছেও না রেলওয়ে। বছরে রেলে ২০০ থেকে ২৫০টির মতো দুর্ঘটনা ঘটে। রেলওয়ে পরিবহণ ও অপারেশন দপ্তর সূত্র বলছে, মোট দুর্ঘটনার ৮৫ থেকে ৮৯ শতাংশই ঘটে থাকে লেভেলক্রসিংগুলোতে। দুর্ঘটনায় সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, রেলেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। সাধারণ সময়ে কিংবা নিরাপদ সড়ক দিবসে সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে নানা আঙ্গিকে কথা হয়। কিন্তু নিরাপদ রেলপথ নিয়ে কোনো আলোচনাই হয় না। অথচ রেলে সড়কযানের জন্যই প্রায় ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নিরাপদ সড়কের সঙ্গে নিরাপদ রেলপথও নিশ্চিত করা জরুরি। ট্রেন কখনো লাইন ছেড়ে গিয়ে সড়কে উঠছে না, সড়কে উঠে দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে না। রেলে যে পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটে, তার অধিকাংশই লেভেলক্রসিংগুলোতে ঘটছে। অর্থাৎ সড়কযান বেপরোয়াভাবে লেভেলক্রসিংয়ে (রেলপথে) উঠে যাচ্ছে। একেকটি দুর্ঘটনায় ৩-৪ জন থেকে ১২-১৫ জন পর্যন্ত প্রাণ হারাচ্ছেন। নানা আঙ্গিকে রেলকে দায়ী করার চেষ্টাও হয়। কিন্তু এমন দুর্ঘটনায় রেল দায়ী নয়। রেল তার নির্ধারিত লাইন দিয়ে চলে। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, বৈধ ক্রসিংগুলোতে নিজ দায়িত্বে দেখে-শুনে সড়কযান পারাপার হবে এবং সড়কযান চালকরা শতভাগ নিশ্চিত হয়েই ক্রসিং পার হবেন। অনেক সময় গেট উঠিয়ে সাধারণ মানুষ ও সড়কযান পারাপার হতে দেখা যায়। ওই সময়ই বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করতে অসংখ্যবার সংশ্লিষ্টদের লিখিতভাবে বলা হয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা কানে তুলছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের অবকাঠামো দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, গত ৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে ২৩টি অবৈধ লেভেলক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন না যেতেই স্থানীয়রা সেগুলো পুনরায় চালু করেছেন। অবৈধ রেলক্রসিংগুলোর মধ্যে এলজিইডি ও ইউনিয়ন পরিষদ তৈরি করেছে অন্তত ১০০০টি, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন ১৭০টি, সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) ১২টি। রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্থানীয়রা রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বহুবার ঝগড়ায়ও লিপ্ত হয়েছেন। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা অবৈধ ক্রসিংগুলোর পক্ষে থাকায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো অবস্থাতেই অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করতে পারছে না।
রেলওয়ে প্রকৌশলী দপ্তর সূত্র বলছে, পুরাতন রেলপথ ধরে প্রায়ই অবৈধ লেভেলক্রসিং নির্মাণ হচ্ছে। আরও বেশি উদ্বেগের-নতুন তৈরি হওয়া রেলপথ ঘিরেও অবৈধভাবে লেভেলক্রসিং তৈরি হচ্ছে। অবৈধ লেভেলক্রসিংগুলোর বেশির ভাগেই গেটম্যান নেই।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. এম শামছুল হক যুগান্তরকে বলেন, সড়কের চেয়ে রেলপথ আলাদা হলেও, রেলপথজুড়ে সড়কপথের সম্পৃক্ততা রয়েছে। হাজার হাজার বৈধ কিংবা অবৈধ লেভেলক্রসিং রয়েছে। সড়কযানের সঙ্গে প্রায় ট্রেনের ধাক্কায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটছে। এতে অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু রেলপথ ও ক্রসিংগুলো সুরক্ষায় কারও নজর নেই।
লেভেলক্রসিংগুলোতে গেটম্যান নেই-এটা খুবই ভয়াবহ উল্লেখ করে ড. শামছুল হক আরও বলেন, দুর্ঘটনায় মানুষ মরছে, রেলেরও ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু সমাধান হচ্ছে না। দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে, নিশ্চয় রেলপথ ও লেভেলক্রসিংগুলো সুরক্ষার আওতায় আসবে।