Image description

শিশু স্বাস্থ্যের সর্বোচ্চ বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট। নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার অভিযোগে আলোচনায় আসে রাজধানীর এই হাসপাতালটি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই হাসপাতাল পরিদর্শনের পর ফের আলোচনায় হাসপাতালটি। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ দেখে অসন্তোষ প্রকাশের পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধানের পরিদর্শনের পরও বদলায়নি চিত্র। শিশুদের ওয়ার্ডগুলো যেন তেলাপোকার আখড়া। রয়েছে ছারপোকাসহ নানা ধরনের কীট। হাসপাতালের সামনে আগের মতোই গড়ে উঠেছে দোকানপাট।

মঙ্গলবার সরজমিন শিশু হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের মূল ফটকের সামনেই অসংখ্য দোকানপাট বসানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে এসব দোকানপাট সরিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু গতকাল দুপুরে সেখানে বিভিন্ন খাবারের দোকান, পোশাক, জুতাসহ ব্যবহার্য নানা ধরনের সামগ্রীর খোলা দোকান গড়ে উঠেছে। মূল ফটকের দুই পাশেই একই চিত্র দেখা গেছে। শুধু শিশু হাসপাতাল নয়, এই চিত্র পাশে থাকা পঙ্গু হাসপাতাল ও বিপরীতে থাকা চক্ষু হাসপাতালেও দেখা গেছে। হাসপাতালের ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় যত্রতত্র পার্কিং করে রাখা হয়েছে এম্বুলেন্সসহ বিভিন্ন যানবাহন। তবে হাসপাতালের সামনে যেখানে যেখানে প্রধানমন্ত্রী নির্মাণসামগ্রী দেখে আপত্তি জানিয়েছেন সেখানে পরিচ্ছন্ন দেখা গেছে।

ওদিকে, অসুস্থ শিশুদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, তারা তেলাপোকাসহ বিভিন্ন পোকার অত্যাচারে অতিষ্ঠ। বিশেষ করে শয্যার আশপাশের দেয়ালে, বিভিন্ন আসবাবপত্রে অসংখ্য চায়না তেলাপোকার বিচরণ। তারা বলছেন, এসব চায়না তেলাপোকার যন্ত্রণায় রোগীদের খাবার রাখা যাচ্ছে না, তেলাপোকা বিচরণ করে খাবারে। এ ছাড়াও দুর্গন্ধ ছড়ায় এসব পোকা। অভিযোগ আছে, ছারপোকাসহ বিভিন্ন পোকাও দেখা যায় শয্যায়। ফলে হাসপাতালের পরিবেশ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলছেন রোগীর স্বজনরা।

হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডসহ একাধিক ওয়ার্ডে গিয়ে শিশুদের শয্যার পাশে অসংখ্য তেলাপোকার উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে। দেখা গেছে, রোগীদের ব্যবহৃত চৌকির পাশে হাফ-দেয়ালগুলোতে দৌড়াদৌড়ি করছে ছোট ছোট অসংখ্য তেলাপোকা। প্লাস্টিকের পাইপে বৈদ্যুতিক তারের কভারগুলোর আড়ালে জড়ো হয়ে থাকে এসব তেলাপোকা। ট্রেতে রাখা বিভিন্ন খাবার ও ওষুধ-পথ্যের উপরও তেলাপোকার বিচরণ দেখা গেছে।

হাসপাতালের এ ব্লক সার্জারি ওয়ার্ডের বাইরে অসুস্থ শিশু নিয়ে বসেছিলেন হাবিব। মাথায় অস্ত্রোপচার হয়েছে শিশুর। তিনি মানবজমিনকে বলেন, ওয়ার্ডে নজর দিলেই দেখবেন হাজার হাজার তেলাপোকা। খাবার রাখা যায় না, কিছু রাখা যায় না তেলাপোকার যন্ত্রণায়। কম দামে একটু ভালো পরিবেশে আর ভালো চিকিৎসার জন্য এখানে আসা। কিন্তু আমার শিশুদের নিরাপত্তা কোথায়? ৫ মাস বয়সী বাচ্চাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করিয়েছেন পিতা পারভেজ। তিনি ওয়ার্ডে শয্যার পাশে তেলাপোকা দেখিয়ে বলেন, কী করবো, এসব নিয়েই থাকতে হচ্ছে। আমরা হাসপাতালের খাবার খাচ্ছি না, বাসা থেকে রান্না করে এনে ঢেকে রাখছি। এরপর প্রয়োজনে ঢাকনা খুলে খাচ্ছি।

কেবিনে শিশুকে রেখেছেন সাহিদা (ছদ্মনাম)। বাচ্চার ফুসফুসে অপারেশন করিয়েছেন। তিনি বলেন, আমি দেড় মাস কেবিনে বাচ্চা নিয়ে আছি। এর আগে ২ দিন ওয়ার্ডে থেকেছি। তেলাপোকার যন্ত্রণা আর ঘেন্নায় অবস্থা খারাপ। সবাই তো প্রতিদিন ৩ হাজার টাকা দিয়ে কবিনে থাকতে পারবে না। পরিষ্কারের বিষয়টি ভালোভাবে নজরে আনতে হবে। ১০ নম্বর ওয়ার্ড-এর আরেকটি শিশুর স্বজন বলেন, আগে চারতলায় (সার্জারি ওয়ার্ড) ছিলাম। ওখানেও তেলাপোকা, দোতলায় নামিয়ে দেয়ার পরও একই অবস্থা। বাসাবাড়িতে একটা তেলাপোকা থাকলে সেখানে আর বসি না, অথচ এখানে রোগী নিয়ে তেলাপোকা নিয়ে থাকতে হচ্ছে। যেসব ড্রয়ারে খাবার রাখবো সেখানে তেলাপোকার কারখানা যেন!

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আহমাদ হাবিবুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, শিশুদের বিষয়টি স্পর্শকাতর। অসুস্থ শিশুদের রাখার স্থানে তেলাপোকা বা অন্যান্য পোকামাকড় শিশুদের ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কারণ এসব পোকামাকড় বিভিন্ন নালা-নর্দমাসহ অবর্জনার পরিবেশে যায়, আবার বিভিন্ন খাবার থেকে শুরু করে রোগীদের শরীরেও আসে। ফলে এরা বিভিন্ন জীবাণু বহন করে। এই চিকিৎসক বলেন, বাংলাদেশ তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংকট অনেক। অনেকদিন ধরেই পর্যাপ্ত নিয়োগ হয় না তাদের। ফলে আউটসোর্সিংয়ে যারা কাজ করেন তারাও ওইসব আনাচে-কানাচে পরিষ্কার করেন না। ফলে ওইসব স্থানে বিভিন্ন পোকামাকড় বাসা বাঁধে। কিন্তু এসব স্থান প্রতিনিয়ত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হয়।
হাসপাতালে অবস্থান নিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের কর্মচারীরা সার্বক্ষণিক পরিচ্ছন্নতায় ব্যস্ত ছিলেন। যা আগে ছিল না বলে তারাও স্বীকার করেছেন। বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধোয়া-মোছা থেকে শুরু করে হাসপাতালের বাইরের বিভিন্ন অবকাঠামো পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর আপত্তি জানানো টয়লেটের অবকাঠামো আগের চেয়ে ভালো করেছে কর্তৃপক্ষ।

সুমি নামের পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলেন, এখন তো কাজের জন্য সময়ই পাচ্ছি না। গতকাল খাবার নিয়ে এসেছি, সেগুলো পচিয়ে ফেলে দিয়েছি খেতে পারিনি। এতো পরিমাণ ব্যস্ততা বেড়েছে। আব্দুর রশিদ নামের নিরাপত্তাকর্মী বলেন, এখন আগের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি সচেতন আমরা। কয়েক মিনিট পরপর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও কোনো গ্যাপ যাতে না থাকে।
হাসপাতালের আউটসোর্সিং কর্মচারীদের ইনচার্জ সুমন হাওলাদার মানবজমিনকে বলেন, সরকারি হাসপাতালের কিছু কিছু সমস্যা থাকেই। দু’টো বাথরুম ভাঙা ছিল সেগুলো আমরা ঠিক করেছি। বাইরে কনস্ট্রাকশনের কাজকর্মের জিনিসপত্র ছিল সেগুলোও আমরা ঠিক করেছি। এরপরও হাসপাতালের কিছু সমস্যা তো রয়েই যায়।

সার্বিক বিষয়ে শিশু ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, আমরা স্বীকার করছি তেলাপোকা, ছারপোকার উপদ্রব অনেক। চেষ্টা করছি এসব নির্মূলের জন্য। আমরা রেগুলার বিভিন্ন ওষুধ দিচ্ছি। কিন্তু কাজ হচ্ছে না। কারণ ভবনটি অনেক পুরাতন ও পরিত্যক্ত। চাইলেই শতভাগ নির্মূল করা যাচ্ছে না।