Image description

উত্তরার বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী অঙ্কিতা রায় স্বজনদের নিয়ে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দিরে এসেছিলেন দুর্গা পূজার মহানবমীতে।

তিনি বলেন, ‘এবার মানুষের ভিড় বেশি, সবাই প্রাণবন্ত। আগেরবারের চেয়ে এবার বেশি আনন্দ লাগছে।’

এবার বাড়ি যাওয়া হয়নি নোয়াখালীর অমর কৃষ্ণ। পূজার শুরুর দিন থেকেই ঢাকার প্রধান এই মন্দিরে স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘চারদিন ধরে যে এখানে আছি, মনে হয় না যে পরিবারের বাইরে আছি। এখানকার প্রতিটা মানুষই আমার পরিবার। সবাই সবাইকে সহযোগিতা করছেন, পূজা করছেন, আনন্দ করছেন।’

বাঙালি হিন্দুদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজায় প্রায় সব আনুষ্ঠানিকতা গুটিয়ে এনে এখন বিজয়া দশমীতে বিসর্জনের প্রস্তুতি চলছে।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গা স্বর্গলোকের কৈলাসে ফিরে যান এবং পরের বছর শরতে তিনি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য হলো, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি কাম, ক্রোধ, হিংসা ও লালসা বিসর্জন দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা।

এ বছর ৯ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এরপর ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয় দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা। এদিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

শনি ও রোববার দুই দিন মহাসপ্তমী পালিত হয়। এ সময় নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার পালন করেন ভক্তরা। সোমবার মহাষ্টমীতে অঞ্জলি ও সন্ধিপূজায় অংশ নেন পূজারিরা। মঙ্গলবার মহানবমীতে বিশেষ পূজা ও হোম-যজ্ঞের মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা এগিয়ে যায়।

মহা নবমীতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢাকা শহরের চারটি পূজা মণ্ডপ ঘুরে প্রতিটিতেই মানুষের মধ্যে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। কেউ পরিবার নিয়ে পূজাতে এসেছেন, কেউ বন্ধুবান্ধব, কেউ পাড়াপড়শিকে নিয়ে দলবেঁধে মণ্ডপে এসেছেন। সবার মুখে হাসি, আবার দেবী দুর্গাকে বিদায় দেওয়ার বিসর্জনের বেদনার কথাও বলছেন তারা।

মণ্ডপের চারপাশে বাহারি পণ্যের পসরা বসেছে, কোথাও কোথাও বসে মেলাও। খাবারের দোকান আছে, পোশাক-প্রসাধনীর দোকানও।

ঢাকার রমনা কালী মন্দিরের সামনে দেখা মিলেছে নাগরদোলার, ছিল শিশুদের নানা ধরনের রাইড। মণ্ডপের ভেতরে কেউ দেবী দুর্গার উদ্দেশে পূজা দিচ্ছেন, কেউ প্রসাদের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে প্রসাদ নেওয়ার জন্য প্রধান ফটক থেকে মণ্ডপ পর্যন্ত বিশাল লাইন দেখা গেছে। পূজা পালন ছাড়াও সেখানে ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, রক্তদান কর্মসূচি, অসচ্ছল পরিবারদের সহযোগিতা করার উদ্যোগও বিশেষভাবে চোখে পড়েছে।

প্রতিটি মণ্ডপের প্রধান ফটক থেকে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা।

ঢাক মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, এবার সারাদেশে ৩৩ হাজার ৮০০ ৫১ মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, এর মধ্যে ঢাকা শহরে আছে ২৫৮টি।

ঢাকার সবচেয়ে বড় পূজাটি হচ্ছে ঢাকেশ্বরী মন্দিরে। পূজা কমিটি বলছেন, মন্দিরে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ হাজার দর্শনার্থী প্রসাদ নিচ্ছেন। এর বাইরেও অনেক মানুষ আছেন, যারা প্রসাদ নিচ্ছেন না অথবা ঘুরতে আসছেন।

বিজয়া দশমী নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যদের ব্যস্ততাও চোখে পড়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন। শোভাযাত্রার নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা, প্রতিমা বহনের ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক আয়োজনের যেন কোনো ত্রুটি না ঘটে সেদিকে তারা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখছেন।

বুধবার প্রতিমা বিসর্জনের পাশাপাশি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবী দুর্গার জন্য বিশেষ পূজা দেবেন, বিবাহিত নারীরা দেবীরে কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেবেন। প্রতিমা বিসর্জনের পর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, বন্ধু ও পরিচিতজনেরা পরস্পরের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। ছোটরা বড়দের প্রণাম করবেন এবং বড়রা আশীর্বাদ করবেন।

বিজয়া দশমীর প্রস্তুতির বিষয়ে মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভাশিস কুমার বিশ্বাস টাইমসকে বলেন, ‘সকালে আমরা রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করব, এরপর রক্তদান কর্মসূচির উদ্বোধন হবে, এরপর সিঁদুর খেলা হবে, সকাল সাড়ে ১১টায় ঢাকার বিভিন্ন থানা থেকে প্রতিমা আসতে শুরু করব, এগুলো সিরিয়াল করে পলাশীর মোড় থেকে বিজয়া শোভাযাত্রা শুরু হবে, এরপর সদরঘাটের ওয়াইজ ঘাটে বিসর্জন দেওয়া হবে।’

আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি গোপাল চন্দ্র দেবনাথ। তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘এই সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমরা দ্বিধায় ছিলাম কী হয় না হয়। কিন্তু মহালয়া উপলক্ষ্যে যে নিরাপত্তা আমরা পেয়েছি, এরপর আমাদের সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। সারাদেশে এখন পর্যন্ত বড় কোনো সমস্যার খবর আমাদের কাছে আসেনি। আমরা এই নিরাপত্তা সামনে পেলে আগামী বছর সারাদেশে পূজা মণ্ডপের সংখ্যা চল্লিশ হাজার হবে বলে আমার বিশ্বাস।’

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এবার মর্ত্যে দেবী দুর্গার আগমন হয়েছে ঘোড়ায় চড়ে। শাস্ত্রমতে ঘোড়ায় দেবীর আগমন বা গমনকে অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয়। এর ফল হলো ‘ছত্রভঙ্গ স্তুরঙ্গমে’, যার অর্থ সমাজে বা রাষ্ট্রে রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, যুদ্ধ বা অরাজকতার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

দেবীর মর্ত্য ছেড়ে কৈলাস যাত্রা একই সঙ্গে দুঃসংবাদ ও সুসংবাদের বার্তা বহন করে। এই যাত্রায় দেবীর বাহন এবার নৌকা। এর ফল হলো ‘শস্যবৃদ্ধিস্তুথাজলম’। এর অর্থ হলো ভালো ফলন বা শস্য বৃদ্ধি হবে, তবে একই সঙ্গে অতিবৃষ্টিপাত ও বন্যার আশঙ্কা থাকে।