নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে দ্রুত বিক্রয়যোগ্য ভোগ্যপণ্য বা এফএমসিজির বাজারে সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর অন্যতম হয়ে উঠেছিল ‘কেয়া’। এ প্রভাব দেখা গেছে চলতি শতকের শূন্য দশকের মাঝামাঝি পর্যন্তও। টেলিভিশন ও রেডিওর সম্প্রচার সময়ের উল্লেখযোগ্য অংশ দখল করে রাখতো কেয়া গ্রুপের পণ্যের বিজ্ঞাপন। এক সময়ের শক্তিশালী ব্র্যান্ডটি এখন পাদপ্রদীপের আলোয় নেই বললেই চলে। ব্যবসা নয়, কেয়া গ্রুপ এখন দুর্নীতি, ঋণ কেলেঙ্কারি আর অর্থপাচারের অভিযোগ নিয়েই আলোচনায় আসছে বেশি। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপির যে তালিকা প্রকাশ করেছেন, তাতে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডেরও নাম রয়েছে।
বর্তমানে আবারো আলোচনায় এসেছে কেয়া গ্রুপ। সর্বশেষ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর, ২০২৬) ৭৩৯ কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে কেয়া গ্রুপের মালিকানাধীন চার প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো– কেয়া গ্রুপের নিট কম্পোজিট ডিভিশন, স্পিনিং ডিভিশন, কটন ডিভিশন ও কেয়া ইয়ার্ন মিলস লিমিটেড।
এ নিয়ে কেয়া গ্রুপের পক্ষ থেকে কর্মীদের উদ্দেশে দেয়া নোটিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস বিল বকেয়ার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত জনবলের কারণে উৎপাদন ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এজন্য বিভিন্ন সেকশন, বিভাগ ও ডিভিশনের কিছু পদ বিলুপ্ত করা হয়েছে।
বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে কেয়া গ্রুপের ধারাবাহিক ব্যবসায়িক পতনেরই প্রতিফলন হিসেবে। বিগত বছরগুলোয় ব্যবসায়িক নানা কেলেঙ্কারিতে বারবার জড়িয়েছে কেয়া গ্রুপের নাম। পুঁজিবাজারে কারসাজি, ব্যবসার হিসাবে হস্তক্ষেপ, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার এবং ব্যাংক ঋণ জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে গ্রুপটির বিরুদ্ধে। চলমান রয়েছে একাধিক মামলা ও তদন্ত। কেয়া গ্রুপের উদ্যোক্তা আবদুল খালেক পাঠানসহ এসব মামলার আসামীদের বিদেশযাত্রায় আরোপ করা হয়েছে নিষেধাজ্ঞা। আসামী তালিকায় নাম রয়েছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদেরও।
কেয়া গ্রুপের মতো ঋণ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষজ্ঞরা দেখেন ত্রুটিপূর্ণ ঋণ ব্যবস্থার বড় সুবিধাভোগী হিসেবে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ব্যাংকের পর্ষদ ও কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করে ব্যাংক থেকে বিপূল অংকের অর্থ ঋণ হিসেবে বের করে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে বারবার।
প্রতিষ্ঠানগুলোর এমন পরিণতির জন্য ব্যাংকারদের দায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী। স্ট্রিমের সঙ্গে আলোচনায় সম্প্রতি তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরা কেয়াসহ বিভিন্ন বড় বড় কোম্পানির যে উত্থান-পতন দেখলাম, এগুলোর মূল কারণ কিন্তু অতি অর্থায়ন। এবং তার জন্য আমি মনে করি ব্যাংকাররাই দায়ী। ওরা কিন্তু নিজেরা এসে বলেনি যে আমাকে এত অর্থ দাও, এটা করো, সেটা করো। বরং ব্যাংকগুলোই সেধে সেধে তাদের কাছে গেছে। তারা বলেছে, এই প্রজেক্ট করুন, সেই প্রজেক্ট করুন, আমার এখান থেকে আপনারা কিছু টাকা নিন! আপনাদের পোর্টফোলিওতে আমার ব্যাংকের নামটা একটু থাকুক। ইদানীংকালে যতগুলো নাম উঠে এসেছে, এগুলোর জন্য মূলত ব্যাংকাররাই দায়ী।’
কেয়া ব্র্যান্ডের সাবান দেশের বাজারে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে নব্বই দশকের মাঝামাঝি। চলতি শতকের শূন্য দশকের শুরুর দিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড হয়ে ওঠে কেয়া। ২০০১ সালে তালিকাভুক্ত হয় পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীদের কাছে কেয়া কসমেটিকস পরিচিতি পায় ব্লু-চিপ কোম্পানি (বৃহৎ ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী এবং মুনাফাজনক প্রতিষ্ঠান যা বাজারে নিয়মিতভাবে ভালো পারফরম্যান্সের প্রদর্শন করে থাকে)। ভোক্তা পর্যায়ে কেয়ার সাবান, ডিটারজেন্ট ও বিভিন্ন প্রসাধনী দ্রব্য ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পাঁচবার জাতীয় রপ্তানি পুরস্কার পায় প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু নানা আর্থিক অনিয়ম সামনে আসা শুরু হওয়া মাত্র তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়তে থাকে কেয়ার সাম্রাজ্য।
কেয়া গ্রুপের উদ্যোক্তা আব্দুল খালেক পাঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় প্রথম গ্রেপ্তার হন ২০১৭ সালে। ওই সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের কারওয়ান বাজার শাখা থেকে ২০১০ সাল থেকে ২০১১ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ১১১ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগে এ মামলা করা হয়। মামলায় আব্দুল খালেক পাঠান ও তার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি কৃষি ব্যাংকের কয়েক কর্মকর্তাকে আসামী করা হয়।
অনেকটা একই ধরনের অভিযোগে গত বছরের শুরুতেই কেয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে আরো দুটি মামলা করে দুদক। ৫২৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে করা এ মামলায় আব্দুল খালেক পাঠান ও সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের পাঁচ কর্মকর্তাকে আসামী করা হয়। দুদকের অভিযোগে বলা হয়, এ ঋণ নেয়া হয়েছিল কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে।
প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ২০২০ সালে এক তদন্ত চালায় ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। অভিযোগ ছিল, কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদনে মোট সম্পদ দেখানো হয়েছে প্রকৃতের চেয়ে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এছাড়া মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোরও অভিযোগ ওঠে।
বিভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কেয়া গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শুধু কেয়া কসমেটিকসেরই খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। সোনালী, ন্যাশনাল, সাউথইস্ট, সোশ্যাল ইসলামী (বর্তমান আরো চার শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সঙ্গে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে একীভূত), স্ট্যান্ডার্ড ও প্রিমিয়ার ব্যাংক এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক খাতের জিএসপি ফাইন্যান্স ও ইউনিয়ন ক্যাপিটাল থেকে এসব ঋণ নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২২ সালের নভেম্বরে কেয়া গ্রুপের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ নিরীক্ষার নির্দেশ দেয়। কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের স্পিনিং মিলস, কেয়া কটন ও কেয়া নিট কম্পোজিট অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে এ নির্দেশনা হয়। এ সময় কোম্পানিটির বিরুদ্ধে মুনাফা ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখিয়ে বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের বিভ্রান্ত করার অভিযোগ ওঠে।
এরও আগে ২০২১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর দুদক কেয়ার চেয়ারম্যান আবদুল খালেক পাঠান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে পাঁচটি পৃথক ফৌজদারি মামলা করে। তাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচার, ১৮৪ কোটি টাকার অবৈধ ও হিসাববহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং বিপুল সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়।
ঋণখেলাপির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. নূর হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা পুনঃতফসিলের প্রক্রিয়ায় আছি। এক কিস্তিতে পুরো টাকাটা একবারে জমা দেয়া বা তিন কিস্তিতে দেয়া, এমন একটি বিষয় আছে। এর আবেদনের প্রক্রিয়া মনে হয় এরই মধ্যে হয়ে গেছে।’
এফআরসির প্রতিবেদন ও বিএসইসির বিশেষ নিরীক্ষা নির্দেশ নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএসইসির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত করা হয়েছে। তাদের নিয়োগকৃত একটি অডিট ফার্মের মাধ্যমে নিরীক্ষাও করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেবে। আমরা এখনো সেই চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাইনি।’