পরিবারের ভাগ্য ফেরাতে উন্নত চাকরির আশায় রাশিয়ায় যান লালমনিরহাটের আবদুল্লাহ আল মামুন। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। দেশটিতে গিয়ে তাঁর ঠাঁই হয় যুদ্ধের ক্যাম্পে। প্রশিক্ষণ শেষে যুদ্ধে পাঠানোর আগের দিন দেশে থাকা ছোট ভাই মো. রনিকে ফোন করে মামুন বলেন, ‘যুদ্ধে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আর দেখা না-ও হতে পারে। দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে।’
প্রথম আলোকে কথাগুলো বলছিলেন মামুনের বাবা আবদুল মজিদ। তিনি বলেন, যুদ্ধে নেওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি। পরে তাঁর সঙ্গে রাশিয়ায় যাওয়া আল আমিনকে আবার ফোন করেন রনি। আল আমিন জানান, মামুন মারা গেছেন। এরপর গ্রামে গায়েবানা জানাজার আয়োজন করা হয়। কিন্তু মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় লোকজন এসে জানাজা না পড়ে মোনাজাত করেন। এরই মধ্যে পাঁচ মাস পার হয়ে গেছে। ঋণগ্রস্ত পরিবার এখন অসহায় হয়ে পড়েছে। এক বছরের একটি ছেলেশিশুকে নিয়ে মামুনের স্ত্রীর সামনে শুধুই অন্ধকার।
কয়েক বছর ধরেই রাশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁদের অনেকেই প্রতারিত হয়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের মরদেহ পাওয়া যায় না। কাগজে–কলমে নিখোঁজ বলা হলেও পরিবার জানে, তাঁরা মৃত।

ভালো বেতনে চাকরির আশায় গত ৭ মে ঢাকা থেকে মামুনসহ ৩০ জন বাংলাদেশি যান রাশিয়ায়। কিন্তু সেখানে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে ১৬, ৮ ও ৬ জনের গ্রুপে ভাগ করে তাঁদের যুদ্ধে পাঠানো হয়। তাঁদের অনেকেই ১২ ও ১৩ জুনের দিকে মারা যান। দুজন হাসপাতালে ভর্তি হন, পরে পালিয়ে দেশে ফেরেন। এদের একজন নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন ও আরেকজন ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তাঁরা অন্যদের মৃত্যুর তথ্য প্রথম আলোকে জানিয়েছেন।
কয়েক বছর ধরেই রাশিয়ায় যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তাঁদের অনেকেই প্রতারিত হয়ে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে তাঁদের মরদেহ পাওয়া যায় না। কাগজে–কলমে নিখোঁজ বলা হলেও পরিবার জানে, তাঁরা মৃত। এখন পর্যন্ত গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছে প্রথম আলো। যদিও বর্তমান সরকার রাশিয়া যাওয়ার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করেছে।
প্রথম আলোকে আদনান বলেন, যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে না রাশিয়া। মরদেহও আনে না। যুদ্ধের সম্মুখসারি থেকে কেউ না ফিরলে তাঁকে নিখোঁজ বলে দেয়। কিন্তু নিখোঁজ মানেই মৃত্যু। এ ছাড়া না ফেরার আর কোনো কারণ নেই।
যুদ্ধক্ষেত্রে পেটে স্প্লিন্টার নিয়ে মস্কোর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন আদনান। তাঁর তিন দফা অস্ত্রোপচার করা হয়। দেড় মাস বিছানা থেকে উঠতেই পারেননি। টানা দুই মাস হাসপাতালে কাটানোর পর পালিয়ে দূতাবাসে যান। এরপর ট্রাভেল পাস (ভ্রমণের বৈধ অনুমতিপত্র) নিয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর দেশে ফেরেন।

রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে যাচাই–বাছাই ছাড়া কর্মী পাঠানো নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। গত ২৫ মে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দূতাবাসের শ্রম উইং থেকে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, রিক্রুটিং এজেন্সি জাবালে নূর গত ৫ মে ৭০ জন কর্মী পাঠানোর অনুমতি চাইলেও সত্যায়ন করেনি দূতাবাস। প্রাথমিকভাবে আর এস ইন্টারন্যাশনালকে ১০ জন কর্মী নিয়ে আসার কথা বলা হলেও সন্দেহ তৈরি হলে তা স্থগিত করা হয়। এরপর ১৮ মে এক কর্মীর পরিবার থেকে ফোন করে দূতাবাসে জানানো হয়, জাবালে নূর ও আর এস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে রাশিয়ায় এসেছে ৩০ জন, যাঁদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হচ্ছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, দুটি এজেন্সি সত্যায়ন করাতে না পারায় টিএস ওভারসিজের নামে কর্মীদের পাঠিয়েছে। দূতাবাসের অনুমতি ছাড়া কর্মী পাঠানোর বিষয়টি যাচাই করতে বলা হয়েছে চিঠিতে। আর কর্মীদের যুদ্ধে না পাঠিয়ে নিয়োগপত্র অনুসারে কাজে ফিরিয়ে আনতে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, চার–পাঁচ মাস ধরে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ ও নিহত বাংলাদেশিদের তথ্য দূতাবাসকে জানাচ্ছে রাশিয়ার সরকার। এখন পর্যন্ত ৪০ জনের তথ্য জানিয়েছে তারা। যদিও এর মধ্যে নিহত কতজন, নিখোঁজ কতজন; তা আলাদা করে বলেনি তারা। সবশেষ ২০ জনের মৃত্যুর বিষয়ে দেশটির পক্ষ থেকে এখনো কিছু জানায়নি। যুদ্ধে কেউ মারা গেলে বা ছয় মাসের বেশি নিখোঁজ থাকলে ক্ষতিপূরণ দাবির সুযোগে আছে। কিন্তু রাশিয়া থেকে ক্ষতিপূরণ নিতে উত্তরাধিকার নিশ্চিত করা, উত্তরাধিকারের রাশিয়ায় গিয়ে অন্তত ছয় মাস থাকাসহ বেশ জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। আর মরদেহ উদ্ধার করা যায় না। রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক চ্যানেলে নিয়মিত আলোচনা চলছে।
রাশিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি কর্মী নিজে থেকেই যুদ্ধে যান। সবশেষ ৩০ জনের বিষয়েও রাশিয়ার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁরা স্বেচ্ছায় যুদ্ধে গিয়েছেন। এর লিখিত প্রমাণ আছে রাশিয়ার কাছে। আর রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ মরদেহ হস্তান্তর করছে না, তাই দেশেও পাঠানো যাচ্ছে না।
এসআরবি, গোয়েন্দা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন, আসলে তাঁরা কেউ যুদ্ধের জন্য যোগ্য নন। যুদ্ধের জন্য শারীরিক সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনোটাই তাঁদের নেই। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের সামনে পাঠিয়ে একধরনের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় ক্ষতিপূরণ নেই

ব্যাংককভিত্তিক ফোর্টিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি সংগঠন গত মার্চে জানায়, রাশিয়ার হয়ে ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া শতাধিক বাংলাদেশি তরুণের মধ্যে সে সময় পর্যন্ত ৩৪ জন নিহত হয়েছেন। আর ১৪ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানায়, ৩০ জন বাংলাদেশিকে ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে জুনে যুদ্ধে পাঠানো হয়। তাঁদের অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছে এসআরবি।
আহত হয়ে দেশে ফেরত আসা দুজন এবং আরও ছয়জনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা বলছেন, জুনে যুদ্ধে পাঠানোর আগেই পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন কর্মীরা। পরিবারের পক্ষ থেকে এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দায়িত্ব নেবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এরপর জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকেই তাঁরা নিখোঁজ হতে থাকেন। মারা যাওয়ার খবর পেলেও কোনো প্রমাণ পায়নি। যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত বিদেশিদের মরদেহ উদ্ধার করা হয় না, মাঠেই ফেলে রাখে।
রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠেছে। মূলত ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটিতে কর্মী পাঠানো বাড়তে শুরু করে। এ সুযোগে একটি চক্র বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে।

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড বলছে, প্রবাসে কোনো কর্মী মারা গেলে তাঁর মরদেহ দেশে আনার দায়িত্ব নেয় কল্যাণ বোর্ড। মৃত্যুর পর কর্মীর পরিবার থেকে আবেদন করতে হয়। কর্মী যদি দেশ থেকে বিএমইটি ছাড়পত্র নিয়ে বিদেশে গিয়ে থাকেন বা বিদেশে যাওয়ার পর দূতাবাস থেকে মেম্বারশিপ নিবন্ধন নেন; তাহলে তাঁর মরদেহ আনার খরচ বহন করে কল্যাণ বোর্ড। এর কোনোটি না থাকলেও বোর্ডে আবেদন করতে পারে পরিবার। সে ক্ষেত্রে বোর্ড থেকে প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয় থেকে মরদেহ দেশে আনতে খরচ দেওয়া হয়, এটি প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ থাকে।
দেশে আসা প্রতিটি মৃতদেহ দাফনে ৩৫ হাজার টাকা নগদ সহায়তা দেয় কল্যাণ বোর্ড। এরপর ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়। এর বাইরে এখন জীবনবিমার সুবিধা পায় কর্মীর পরিবার। আর বিদেশে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি থাকলে তা দূতাবাসের মাধ্যমে আদায় করে দেওয়া হয়। মৃত কর্মীর বকেয়া থাকলে তা-ও আদায়ের উদ্যোগ নেয় দূতাবাস। কিন্তু রাশিয়া থেকে মরদেহ আনার কোনো আবেদন এখন পর্যন্ত কল্যাণ বোর্ডে আসেনি। মৃত্যুর প্রমাণ না থাকায় কেউ আবেদন করতে পারছেন না। ফলে কেউ কোনো ক্ষতিপূরণও পাচ্ছেন না।
মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সি সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে রাশিয়ায়। কতজন গিয়ে কাজ পেয়েছেন, বাকিরা কোথায় আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। মৃতদেহও পায় না পরিবার, পায় না কোনো ক্ষতিপূরণ। কতজন মারা গেছেন, সেটাও কেউ জানে না।শরিফুল হাসান, ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান
দেশে ফেরার আকুতি
এসআরবি, গোয়েন্দা বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যাঁরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছেন, আসলে তাঁরা কেউ যুদ্ধের জন্য যোগ্য নন। যুদ্ধের জন্য শারীরিক সামর্থ্য, প্রশিক্ষণ বা কৌশল—কোনোটাই তাঁদের নেই। মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করতে তাঁদের সামনে পাঠিয়ে একধরনের টোপ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যখন প্রতিপক্ষ তাঁদের ওপর ড্রোন হামলা করে, তখন শত্রুপক্ষের অবস্থান শনাক্ত করে রাশিয়ার সেনারা। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এটি এসআরবিও নিশ্চিত হয়েছে। জীবন বাঁচাতে সুযোগ পেলে কেউ কেউ পালিয়ে দেশে ফিরে আসেন।
এসআরবি জানিয়েছে, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান ও আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে ১৩ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ৩৭ জন। পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। এক বছরেই রাশিয়া যাওয়া তিন গুণের বেশি বেড়েছে। এ বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।
বাংলাদেশি ওই ৩০ জনের মধ্যে একজন হলেন মো. পলাশ শেখ। যুদ্ধে গিয়ে পলাশ প্রথম দফায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। সুস্থ হয়ে দ্বিতীয় দফায় যুদ্ধে গিয়ে হাত হারান। এখন মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর ফুফাতো ভাই আবু সালেহ ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পলাশ শেখ চাকরির প্রলোভনে প্রতারিত হয়েছেন, ২২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দূতাবাস ও মন্ত্রণালয়ে বলেও কোনো সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে না। সেনা পাহারা থাকায় হাসপাতাল থেকে পালাতেও পারছেন না। ১০ লাখ টাকা খরচ করে পাঠালেও কোনো টাকাপয়সাও পায়নি পরিবার।
নিখোঁজ স্বজনকে ফিরিয়ে আনতে গত জুলাইয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আলাদা করে জমা দেওয়া ২৮টি চিঠি প্রথম আলোর হাতে এসেছে। এসব চিঠিতে বলা হয়, উন্নত জীবনের আশায় কর্মসংস্থানের জন্য দালালের মাধ্যমে রাশিয়া যান তাঁরা। খিলক্ষেতের জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনাল ও আশুলিয়ার আর এস ইন্টারন্যাশনাল তাদের রাশিয়া পাঠায়। উচ্চ বেতনের প্রলোভনে তাঁদের নিয়ে রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। তাঁদের যুদ্ধে নেওয়ার প্রস্তুতি শেষ করা হয় এবং যেকোনো সময় যুদ্ধে যোগ দিতে বাধ্য করা হতে পারে। দ্রুত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। তাঁরা আর্থিক সহায়তারও আবেদন জানান সরকারের কাছে।
কর্মীদের এভাবে যেতে নিরুৎসাহিত করছে সরকার। নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে বিভিন্ন দেশ হয়ে নানাভাবে যাচ্ছেন। সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।আরিফুল হক চৌধুরী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী
তবু থামছে না রাশিয়া–যাত্রা
গত ৭ মে ৩০ জনের দলে রাশিয়া যান ২১ বছর বয়সী ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। উচ্চ বেতনের চাকরির লোভে দালালকে ১০ লাখ টাকা দিয়ে গেলেও পাননি চাকরি। চার দিন হোটেলে রাখার পর একটি কাগজে সই নিয়ে পাঠানো হয় সেনাক্যাম্পে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ২১ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে আরও পাঁচ বাংলাদেশির সঙ্গে তাঁকেও পাঠানো হয় যুদ্ধের সম্মুখসারিতে। ড্রোন হামলায় মারা যান চারজন। তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, সেখান থেকে পালিয়ে দেশে আসেন।
রাশিয়া বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন শ্রমবাজার হয়ে উঠেছে। মূলত ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই দেশটিতে কর্মী পাঠানো বাড়তে শুরু করে। এ সুযোগে একটি চক্র বাংলাদেশি কর্মীদের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য পাঠাচ্ছে। নিয়মিত কেউ কেউ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে আসছেন। কেউ কেউ সেখানেই মারা যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ দেশে ফেরার আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠাচ্ছেন। তবু কমছে না রাশিয়া–যাত্রা। যুদ্ধে গিয়ে ছয় মাস থাকতে পারলে রাশিয়ার নাগরিকত্বের সুযোগ, মাসে বেতন ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। এ কারণে অনেকে নিজ থেকেই যুদ্ধে যাচ্ছেন।
বিএমইটির তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে রাশিয়া যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন মাত্র ৩৭ জন। পরের বছর এটি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫ জনে। ২০২৫ সালে দেশটিতে যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৪ হাজার ৭২৫ জন। এক বছরেই রাশিয়া যাওয়া তিন গুণের বেশি বেড়েছে। এ বছরের ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত রাশিয়ায় যেতে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ১০৫ জন।
ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, মানব পাচারে অভিযুক্ত এজেন্সি সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠাচ্ছে রাশিয়ায়। কতজন গিয়ে কাজ পেয়েছেন, বাকিরা কোথায় আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। মৃতদেহও পায় না পরিবার, পায় না কোনো ক্ষতিপূরণ। কতজন মারা গেছেন, সেটাও কেউ জানে না। হটলাইন চালু করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা তৈরির পরামর্শ দেন তিনি।
রাশিয়া পাঠাতে সবচেয়ে বেশি ছাড়পত্র নিয়েছে বন্যা বিজয় ওভারসিজ। এরা একাই পাঠিয়েছে ২৭ শতাংশ কর্মী, যা প্রায় আড়াই হাজার। এই এজেন্সির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ আছে। মানব পাচারের মামলাও আছে। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামেও অভিযোগ আছে।
২৭% কর্মী পাঠিয়েছে একটি এজেন্সি
প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, গত চার বছরে এখন পর্যন্ত রাশিয়ায় কর্মী পাঠাতে ৯৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির নামে ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে এসআরবির অভিযুক্ত তিনটি এজেন্সির মধ্যে টিএস ওভারসিজ নামের একটি এজেন্সি ২৬৬ জনের নামে ছাড়পত্র নিয়েছে। বাকি দুটির নাম বিএমইটি ডেটাবেজে পাওয়া যায়নি। রাশিয়া পাঠাতে সবচেয়ে বেশি ছাড়পত্র নিয়েছে বন্যা বিজয় ওভারসিজ। এরা একাই পাঠিয়েছে ২৭ শতাংশ কর্মী, যা প্রায় আড়াই হাজার। এই এজেন্সির বিরুদ্ধে আলজেরিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে পাচারের অভিযোগ আছে। মানব পাচারের মামলাও আছে। রাশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামেও অভিযোগ আছে। সব মিলে শতাধিক কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে মাত্র ১৭টি এজেন্সি।
৩০ কর্মী পাঠানোর সঙ্গে যুক্ত জাবালে নূর, টিএস ওভারসিজ ও আরএস ইন্টারন্যাশনালের লাইসেন্স বাতিল করেছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। সবচেয়ে বেশি কর্মী পাঠানো বন্যা বিজয়ের সার্ভার বন্ধ (লক্ড) করে দেওয়া হয়েছে। তারা নতুন করে আর ছাড়পত্র নিতে পারছে না। এসব এজেন্সি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসা করে আসছে।
বন্যা বিজয় ওভারসিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরুণ দেবনাথের সঙ্গে কথা বলতে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই।
বিএমইটির তথ্য বলছে, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭৭১ জন কর্মীর ছাড়পত্র নিয়েছে সরকারি এজেন্সি বোয়েসেল। এ কোম্পানির একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা রাশিয়ার তিনটি কোম্পানিতে কর্মী পাঠাচ্ছিলেন। এর মধ্যে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এক কর্মী গিয়ে গাড়ি নিয়ে পালিয়ে যান। একজন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এরপর দুটি কোম্পানি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। আর একটি কোম্পানিতে এখনো যাচ্ছে, তাদের পুরোনো চাহিদাপত্র অনুসারে আরও ১৪ জনের রাশিয়া যাওয়া বাকি আছে। তবে এক বছর ধরে নতুন কোনো চাহিদাপত্র পায়নি বোয়েসেল।
রাশিয়ায় শ্রম অভিবাসন নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে একটি গবেষণা করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক মাইগ্রেশন কর্মসূচি। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মোট কতজন বাংলাদেশি জড়িয়েছেন, কতজন নিহত হয়েছেন কিংবা কতজন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে আছেন, তার হিসাব কারও কাছে নেই। প্রতারণার প্রক্রিয়া শুরু হয় বাংলাদেশ থেকেই। বৈধ ভিসা, চাকরির চুক্তি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই দেশ ছেড়েছিলেন তাঁরা। ওখানে নেওয়ার পর যুদ্ধে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ায় বাংলাদেশিদের পাচারের অভিযোগে অন্তত ছয়টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে সিআইডি সূত্র।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, কর্মীদের এভাবে যেতে নিরুৎসাহিত করছে সরকার। নিশ্চিত চাকরির তথ্য যাচাই-বাছাই ও সত্যায়ন না করে কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে না। অনেকে বিভিন্ন দেশ হয়ে নানাভাবে যাচ্ছেন। সব দূতাবাসকে সতর্ক করা হয়েছে, প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে নজরদারি করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাঁরা মারা গেছেন বলে পরিবার খবর পেয়েছে; তাঁদের মরদেহ খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।