Image description

রাজধানীর অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম মোহাম্মদপুর। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের সহিংস কর্মকাণ্ডের কারণে প্রতিনিয়তই আলোচনায় আসে এলাকাটির নাম। অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বারবার কিশোর গ্যাং নির্মূলের বার্তা দেওয়া হলেও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। বরং দিন দিন নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে বিভিন্ন নামে সক্রিয় কিশোর গ্যাং।

মোহাম্মদপুরে সক্রিয় একাধিক কিশোর গ্যাং লিডার, স্থানীয় লোকজন ও এই কিশোর গ্যাংয়ের শিকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ, দখল, নানা খাতের চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের আয়ে তাদের দলগুলো চলে। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হলেও অবৈধ আয়ের টাকায় মুক্তি মেলে। কিশোর গ্যাংয়ের নামে মাঠ পর্যায়ে অপরাধ চললেও তাদের মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকেন রাজনৈতিক পরিচয়ে পৃষ্ঠপোষকরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ক্ষমতার পালাবদলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দীর্ঘদিনের পৃষ্ঠপোষকরা পালিয়ে গেলেও মোহাম্মদপুরের কিশোর গ্যাং এখন অনেকটাই আত্মনির্ভরশীল। নিজেদের আয়ের টাকায় এলাকায় অপরাধের বিস্তার ঘটাচ্ছে তারা। কিনছে দামি অস্ত্র, যা পরে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে ব্যবহার করা হচ্ছে।

অন্তত ১৫ দিন ধরে মোহাম্মদপুর ও আদাবরসহ আশপাশের এলাকায় সরেজমিন খোঁজখবর নিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের অপকর্ম, আয়ের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে কালবেলা। ভুক্তভোগী আর স্থানীয় লোকজন এই কিশোর গ্যাং নামের সন্ত্রাসীদের বিষয়ে নানা তথ্য দিলেও আতঙ্কে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খোলেন না। তারা বলছেন, মোহাম্মদপুর আর আদাবরের সব অপরাধই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই ঘটাচ্ছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে মাদকের স্পট ও পরিবহনে চাঁদাবাজিও এই সন্ত্রাসীদের হাতে। পাশাপাশি ইন্টারনেট, ডিশ, নতুন বাড়ি তুললে চাঁদাবাজি, নতুন বাড়ি তৈরিতে ইট-রড, মাটি সরবরাহের নামে চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে বাসাবাড়ির ময়লার ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করছে এই অপরাধীরা

কিশোর গ্যাং সদস্যদের কাছে নিরবচ্ছিন্ন অপরাধের টাকা আসার পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতাকে দায়ী করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় কিশোর গ্যাং অপরাধীরা তাদের নানা ধরনের তৎপরতা চালানোর সুযোগ পায়। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার অভাবও এই জন্য দায়ী।

অবশ্য গত সোমবার নারায়ণগঞ্জে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা পরিদর্শনে গিয়ে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেছেন, কিশোর গ্যাং দমনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে। অপরাধী যে মতের, বর্ণের, ধর্মের কিংবা যত ক্ষমতাশালীই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। মাদক, কিশোর গ্যাং ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ১৫ অক্টোবর মোহাম্মদপুরের বসিলা সড়কের ময়ূর ভিলার সামনে দুই হকারকে গুলি ও ছুরিকাঘাতের নেপথ্যেও রয়েছে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ। এই হামলার পেছনে রয়েছে রায়েরবাজারের দুর্ধর্ষ কিশোর গ্যাং সাব্বির গ্রুপ। একই গ্রুপের হাতে গত ১৫ সেপ্টেম্বর কেরানীগঞ্জের আরশিনগর এলাকায় খুন হন রায়েরবাজার এলাকার আরেক কিশোর গ্যাং পাটালি গ্রুপের একাংশের নেতৃত্ব দেওয়া ফরহাদ।

স্থানীয় সূত্র বলছে, বসিলা সড়কে ফরহাদের ৩০টি দোকান ছিল। তাকে হত্যার পর এসব দোকানের নিয়ন্ত্রণ নেয় সাব্বির গ্রুপ। ফরহাদ হত্যা ও দোকান দখলের প্রতিবাদে সক্রিয় ছিলেন তার বোনজামাই মো. সুমন (৪৫) ও ভাগ্নে ফাহিম (১৮)। এ কারণেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। হামলায় সুমনের পায়ে গুলি এবং ফাহিমকে ছুরিকাঘাত করা হয়।

দোকানের নিয়ন্ত্রণ একাধিক গ্যাংয়ের হাতে সরেজমিন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু পাটালি গ্রুপ নয়, বসিলা সড়কের প্রায় ১৭০টি দোকানের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে একাধিক কিশোর গ্যাংয়ের হাতে। ফুটপাতের এসব দোকানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী কিলার পাপ্পুর অন্যতম সহযোগী শরীফ বাদল ওরফে কাইল্লা বাদল। তিনি একাই নিয়ন্ত্রণ করেন অন্তত ৭০টি দোকান। বাকি দোকানগুলোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে পাটালি গ্রুপের একাংশ, ছোট সাজ্জাদ, ডাকু রমজান, ভাগিনা ইমন ও রাব্বি ওরফে জাউরা রাব্বির হাতে। কাইল্লা বাদলের পর সবচেয়ে বেশি দোকানের নিয়ন্ত্রণ এখন রাব্বি গ্রুপের হাতে। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে অন্তত ৫০টি দোকান। এ ছাড়া রাব্বির ১০টি, ভাইগ্না ইয়াসিন ১০টি, ভান্ডারি ইমন ৫টি ও ডাকু রমজানের তিনটি দোকান নিয়ন্ত্রণ করে। পাটালি গ্রুপের ফরহাদের ৩০টি দোকান এখন সাব্বির গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে। আর বসিলা সড়কের পুরো ফুটপাত থেকে টাকা তোলার দায়িত্বে রয়েছে আল-আমিন, রিংকু ও মামুনসহ চারজন।

ফুটপাতের একাধিক দোকানির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দীর্ঘদিন তাদের চাঁদা দিতে হয়নি। পরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের চাঁদা দিতে নানা ধরনের হুমকি দেওয়া হয়। তাতেও কাজ না হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় কিশোর গ্যাং সদস্যরা। এমনকি চক্রের অনুমতি ছাড়া কেউ দোকান বসানোর চেষ্টা করলেই অস্ত্র হাতে হাজির হয় এই অপরাধীরা। হয়রানির ভয়ে একপর্যায়ে চাঁদা দেওয়া শুরু করেন ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা। চাঁদা আদায়ের পুরো প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিত কাইল্লা বাদল। সম্প্রতি চট্টগ্রামে পুলিশের হাতে সে গ্রেপ্তার হয়। এরপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে বছিলা সড়কের ফুটপাতের দোকানের একটি অংশ কিশোর গ্যাংগুলোর মধ্যে ভাগ করে দেয় সে।

একাধিক দোকানি জানান, একসময় সড়কে এক লাইনে ভ্যান বসত। দোকান বাড়তে বাড়তে এখন তা তিন লাইনে দাঁড়িয়েছে। আল্লাহ করিম মসজিদের মোড় থেকে বছিলা সড়কের বেড়িবাঁধ তিন রাস্তা পর্যন্ত এসব দোকান বসানো হয়। সামনের লাইনের প্রতিটি দোকান থেকে ৩০০ টাকা, দ্বিতীয় লাইনের দোকান থেকে ২৫০ টাকা এবং পেছনের ফুটপাত-সংলগ্ন দোকান থেকে ২০০ টাকা করে আদায় করা হয়। এসব দোকানের বাইরে অন্তত পাঁচটি মাছের দোকান রয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে আদায় করা হয় ৫০০ টাকা।

কবজি কাটা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে মাদকের ১০ স্পট মোহাম্মদপুর ও আদাবরের কবজি কাটা গ্রুপ মাদকের স্পটগুলো নিয়ন্ত্রণ করত। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একের পর এক অভিযানে এই গ্রুপের বেশিরভাগ সদস্য গ্রেপ্তার হলে এরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে সম্প্রতি বেশিরভাগ সদস্য কারাগার থেকে বেরিয়ে ফের মাদকের স্পটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর বাইরে ছিনতাই ও চাঁদাবাজি করা এই গ্রুপের অন্যতম কাজ। গ্রুপটির প্রধান আনোয়ার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকলেও সদস্যরা কারামুক্ত হয়ে হাল ধরেছে। সর্বশেষ গ্রুপটি আবু সাঈদ নিয়ন্ত্রণ করত। আদাবরে পুলিশ সদস্যদের কোপানোর ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও সম্প্রতি সে কারামুক্ত হয়েছে। এখনো গ্রুপটির নিয়ন্ত্রণে মাদকের অন্তত ১০টি স্পট। স্থানীয় একটি সূত্র জানিয়েছে, আদাবর, শেখেরটেক, সুনিড়বিল, হাড্ডি পট্টি, তুরাগ হাউজিং, নবোদয় হাউজিং নয় তলা এলাকা, নবীনগর ১, ২ ও চন্দ্রিমা হাউজিং ১২ এলাকায় চলা মাদকের স্পট এই গ্যাংটির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

নার্সারি-গ্যারেজেও চাঁদাবাজি, মাদকের হাট বেড়িবাঁধ সড়কে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের দেয়াল-সংলগ্ন অন্তত ১৭টি নার্সারি ও আটটি রিকশার গ্যারেজ এবং অটোস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এগুলো সাব্বির গ্রুপ, শাহরুখ-আরমান গ্রুপ ও পাটালি গ্রুপের একাংশের হাতে। প্রতিটি নার্সারি থেকে ভাড়া হিসেবে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং প্রতিটি গ্যারেজ থেকে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। এসব স্পট থেকে টাকা তোলার দায়িত্ব পালন করে হাবিব।

এই তিন গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রায়েরবাজারের পাবনা হাউস গলি ও ক্যানসার গলি ঘিরে জঙ্গল সলিমপুরের মতো এক দুর্গ গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। সেখানে পরিচালিত হয় মাদকের হাট। এই হাটের মূল নিয়ন্ত্রক আরিফ ওরফে চাপা আরিফ। তার হয়ে সার্বক্ষণিক পাহারায় থাকে অস্ত্রধারী কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

এই স্পটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যেতে ভয় পান বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি। রায়েরবাজারের এই মাদকের স্পটে অভিযান চালাতে গিয়ে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। এমনকি অভিযান চালাতে গিয়ে অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।

অন্যদিকে বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার উত্তর পাশে চাঁদ উদ্যান হাউজিংয়ের গেট থেকে ঢাকা উদ্যান পর্যন্ত বেড়িবাঁধের দুই পাশের দোকান ও রিকশার গ্যারেজ নিয়ন্ত্রণ করে ভাত রাসেল গ্রুপ, মোল্লা রুবেল গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ ও লারা দে গ্রুপ। এসব দলের নেতৃত্ব দেয় রানা নামে একজন। স্থানীয়রা তাদের ‘রানা বাহিনী’ নামে চেনেন।

গণপরিবহন ঘিরেও চলছে নীরব চাঁদাবাজি পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা রীতিমতো চাঁদাবাজদের কাছে জিম্মি অবস্থায় আছেন। রাজধানীতে চলাচল করা গণপরিবহনের অন্তত ১০টি রুটের বাস মোহাম্মদপুর থেকে চলাচল করে। এ ছাড়া শ্যামলী, ফার্মগেট ও ঝিগাতলাসহ চারটি রুটে লেগুনা চলাচল করে।

মোহাম্মদপুর থেকে বাড্ডার নতুন বাজার রুটে চলাচল করা সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাসস্ট্যান্ড এবং একই স্থান থেকে ফার্মগেট রুটে চলাচল করা লেগুনা নিয়ন্ত্রণ করে পাপ্পু। অন্যদিকে মোহাম্মদপুর থেকে শ্যামলী রুটে চলাচল করা লেগুনাস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ অন্য এক গ্রুপের হাতে।

এ ছাড়া মোহাম্মদপুর থেকে উত্তরা রুটে চলাচল করা প্রজাপতি পরিবহন এবং মোহাম্মদপুর থেকে জুরাইন রুটে চলাচল করা মালঞ্চ পরিবহনের নিয়ন্ত্রণও পাপ্পুর হাতে। একই রুটে চলাচল করা পরিস্থান পরিবহন এবং স্টাফ কোয়ার্টার রুটে চলাচল করা রমজান পরিবহনের নিয়ন্ত্রণ আরেক গ্রুপের হাতে।

রিং রোডজুড়ে চাঁদাবাজির জাল মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানাকে বিভক্ত করা রিং রোডজুড়েও কিশোর গ্যাংয়ের চাঁদাবাজি চলছে। স্থানীয়রা বলছেন, এ তালিকায় কিশোর গ্যাংয়ের ছায়া হয়ে রয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা।

আদাবরের স্থানীয় বাসিন্দা ও হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিয়া মসজিদ এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় করে মোহাম্মদপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসী পাপ্পু ও তার কথিত শ্যালক ইমন মুন্সি। দুই বছর আগেও সিএনজি চালাতেন এই ইমন মুন্সি। বর্তমানে চাঁদার টাকায় তিনি ফুলেফেঁপে উঠেছেন। এই শ্যালক-দুলাভাইয়ের চাঁদাবাজির জাল ছড়িয়েছে শ্যামলীর হক সাহেবের গ্যারেজের সামনের ফুটপাতেও।

কৃষি মার্কেট বাজার এলাকায় ফুটপাত ও বাজারকেন্দ্রিক চাঁদা নিয়ন্ত্রণ করেন লিটন মাহমুদ ওরফে বাবু। তাকে স্থানীয়রা চেনেন তেরেনাম বাবু নামে। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহসভাপতি। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে দুই দিন তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি তাতে সাড়া দেননি। এমনকি হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ করেননি।

কৃষি মার্কেটের চালের আড়ত এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় করেন মীর কামাল হোসেন। তিনি মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, শুধু কৃষি মার্কেট নয় দেশের কোথাও ফুটপাত, ময়লার ব্যবসা বা হাটের সঙ্গে আমি জড়িত নই। এমনকি আমার সঙ্গে রাজনীতি করা কোনো কর্মীও কোনো অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত হতে পারে না।

শেখেরটেক ১২ নম্বরের ছাপরা মসজিদ থেকে সূচনা কমিউনিটি সেন্টারের সামনের ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় করেন রাজু ও রনি আহমেদ নামের দুই ছাত্রদল নেতা। তাদের মধ্যে রনি মোহাম্মদপুর থানা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তবে রনির দাবি এই কাজে তিনি নন একই এলাকায় যুবদলের রাজনীতি করা মো. রনি ফুটপাতের সঙ্গে জড়িত। অভিযোগের বিষয়ে যুবদলের মো. রনি বলেন, ‘ফুটপাতের কোনো কিছুর সঙ্গে আমি জড়িত নই।’

জাপান গার্ডেন সিটি ও টোকিও স্কয়ারের সামনের ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় করেন ইমন মুন্সির অন্যতম সহযোগী মুজাহিদ এবং হাসিবুল ইসলাম শাওন ওরফে বুলেট শাওন। বেগম নুরজাহান বালিকা বিদ্যালয় থেকে শেখেরটেক-১ পর্যন্ত ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেন মুরগি কাইয়ুম। টিক্কাপাড়া ছাপরা মসজিদ এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদা আদায় করেন আনোয়ার হোসেন ওরফে কাল্লু এবং শুকুর আল আমিন।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, কাল্লু স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মিয়া চাঁনের ছেলে। তবে তিনি ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের যুবদল নেতা। শুকুর আল আমিনও ২৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের নেতা। তারা সবাই ঢাকা মহানগর বিএনপির বহিষ্কৃত সদস্য সোহেল রহমান ওরফে দাড়িয়াল সোহেলের কর্মী হিসেবে পরিচিত।

মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান কালবেলাকে বলেন, কয়েক দিন আগে বাবা ও ছেলের ওপর হামলার ঘটনার পর বছিলা সড়কে কোনো দোকান বসতে দেওয়া হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে সড়ক থেকে হকার উচ্ছেদ করে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে বলা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তা এই বক্তব্য দিলেও গত সোমবার ওই এলাকা ঘুরে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের অনেকটা অংশজুড়েই ওই এলাকায় দোকান দেখা যায়।

কিশোর গ্যাংয়ের এমন অপরাধের জাল বিস্তারের বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান মু. রেজাউল করিম সোহাগ কালবেলাকে বলেন, কিশোর গ্যাং অপরাধীরা রাজনৈতিক নেতাদের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন ও অনৈতিক কাজে এদের ব্যবহার করে। ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দল দুই পক্ষই তাদের ব্যবহার করে। রাজনৈতিক নেতারা অনেক সময়ে অপরাধীদের সহযোগিতা নেন। ফলে এমন অপরাধের অর্থনৈতিক সাপোর্ট তৈরি হয়। তাই আমাদের আড়ালে থেকে অপরাধীদের মদদ দেওয়া নেতাদের সামনে আনতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, মাদক কারবার, অস্ত্রের কারবার ও কিশোর অপরাধীদের মদদ দেওয়া নেতাদের তালিকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে থাকে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করলেই সমাজের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যায়।