বাংলাদেশ পুলিশের কর্মকর্তাদের জন্য গড়ে তোলা একটি আবাসন প্রকল্প পুলিশ হাউজিং-১। এর ভেতরেই একটি বাড়িতে বসেছিল ‘রেভ পার্টি’। রাতভর মাদকের পার্টির পাশাপাশি চলে নারী-পুরুষের অবৈধ মেলামেশা। একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ থেকে এই রেভ পার্টির আয়োজন করা হয়।
গত সোমবার রাতে পার্টির শুরুর পরই অভিযান শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল। সেখান থেকে আটক করা হয় ৮৪ জনকে। এর মধ্যে ২৬ জন নারী।
অভিযান সূত্রে জানা গেছে, ‘বাড়িটি একজন ডিআইজির। এই পার্টিতে আসলে পুলিশ রেইড হবে না। উল্টো পুলিশ নিরাপত্তা দেবে।’—এই প্রতিশ্রুতি জানিয়ে রেভ পার্টির আয়োজন করা হয়। দ্যা টেকওভার. ঢাকা পেজ থেকে এই পার্টির আমন্ত্রণ জানানো হয়। নির্ধারিত ফি এবং রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে গত সোমবার এই পার্টিতে অংশ নিতে আসে তরুণ-তরুণীরা। ডিবির অভিযানে ট্রিপ্লেক্স এই বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের মাদক ও যৌন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে মাদক সেবনের সরঞ্জামও জব্দ করা হয়েছে।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, ওই পুলিশ কর্মকর্তা বাড়িটি ভাড়া দিয়েছেন। সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও অবৈধ ডিজে পার্টি চলছিল। এজন্য সেখানে অভিযান চালানো হয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি মুহাম্মদ সোহরাব আল হোসাইন জানান, আটক ৮৪ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হয়েছে। আটক পুরুষদের এক মাস ও নারীদের ১৫ দিন করে সাজা দেওয়া হয়েছে।
সামাজিকমাধ্যমের রেভ পার্টির প্রচারণার সময় একজন ডিআইজির বাড়ি বলে প্রচার করা হলেও পরে জানা যায, বাড়িটি পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির। তার নাম আব্দুল্লাহ আল জহির। অভিযানের পর তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তিনি পুলিশ সদর দপ্তরে রিপেয়ার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখায় কর্মরত ছিলেন।
গতকাল মঙ্গলবার আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে আব্দুল্লাহ আল জহিরকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তাকে সংযুক্ত রাখা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০০৬ সালে প্লটটি বরাদ্দ পান আব্দুল্লাহ আল জহির। ২০২২ সালে সেখানে তিনি ট্রিপ্লেক্স কনটেইনার হাউস তৈরি করেন, যা তিনি বিভিন্ন পার্টির জন্য বরাদ্দ দিতেন।
ট্রিপ্লেক্স এ বাড়িটি কনটেইনার হাউস নামেও পরিচিত। বাড়িতে রয়েছে পার্টি আয়োজনের বিশেষ ব্যবস্থা। বাড়িটিতে মোট ৫টি বেডরুম, যার মধ্যে ৩টি এসি রুম এবং ৪টি বেডরুমে অ্যাটাচড বাথরুমের সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া ৫টি ব্যালকনি রয়েছে।
ডিবির অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়িটি ভাড়া দিতেন জহির। কো-হোস্ট হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন মাহবুবুল আলম নামে একজন। ডিবির অভিযানে ৮৪ জনের মধ্যে কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমও আছেন।
ডিবির এক কর্মকর্তা বলেন, ডিবি অভিযান শুরুর পর নানাভাবে সুপারিশ করার চেষ্টা করেন অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির। সবশেষ কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমকে ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি। তবে কাউকে ছাড় না দিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাইকে আটক করা হয়েছে।
ডিবি উত্তরা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপকমিশনার (ডিসি) মো. ইলিয়াস কবির বলেন, বাড়িটিতে প্রতি মাসেই ১৫ থেকে ২০ দিন এ ধরনের পার্টি হতো। পেমেন্ট হতো ডলারে। এই পেমেন্টের ৭০ ভাগ পেতেন মালিক। ২০২৫ সাল থেকে এ বাড়িতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড হচ্ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।
গোয়েন্দা উত্তরা বিভাগের ডিসি ইলিয়াস কবির কালবেলাকে বলেন, ওই বাড়িটি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে ভাড়া দিয়েছিলেন আব্দুল্লাহ আল জহির। একজন কো-হোস্ট ও হোস্টের মাধ্যমে তা পরিচালিত হচ্ছিল। কো-হোস্ট মাহবুবুল আলম আটক আছেন। এয়ারবিএনবিকে ভাড়া দেওয়া হলেও ওই বাসা থেকে যা আয় হতো, তার ৭০ শতাংশ নিতেন জহির।
তার ভাড়া দেওয়া বাড়িতে এক বছরের বেশি সময় এভাবে মাদকের আসর বসার বিষয়ে জানতে চাইলে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির কালবেলাকে বলেন, আমার বাসাটি ভাড়া হতো এয়ারবিএনবির মাধ্যমে। জন্মদিন উদযাপনের জন্য বাড়িটি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। কোনো অপরাধ করে থাকলে যারা ভাড়া নিয়েছে, তারা করেছে। আমি সব নিয়ম মেনেই ভাড়া দিয়েছি। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।