নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্র সিন্ডিকেটের কবজায়। দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করে চক্রটি পছন্দের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অধিকাংশ কাজ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রভাব খাটিয়ে এভাবেই দরপত্রের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে ফেলা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) একশ্রেণির কর্মকর্তা ও প্রেস মালিকদের দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত যোগসাজশে কৌশলে কাজটি সম্পন্ন করা হয়েছে। আর এ কাজে সরকারের প্রায় ৩০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে বলে অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এনসিটিবিতে অভিযান চালিয়ে বেশকিছু নথিপত্র উদ্ধার করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
এনসিটিবির দরপত্রের নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিভিন্ন শ্রেণির বই মুদ্রণ ও সরবরাহের জন্য আহ্বান করা ৪৫টি দরপত্রের মধ্যে ৩০টিতেই মাত্র একজন করে দরদাতা প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এছাড়া ১৩টি দরপত্রে দুটি এবং বাকি দুটি দরপত্রে তিনটি করে প্রস্তাব জমা পড়ে। কয়েকটি প্রেস মালিকের অনুরোধে নিয়মবহির্ভূতভাবে দরপত্র চলাকালে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটা নজিরবিহীন। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রের কোনোটিতেই একক দরদাতা ছিল না। পুরোনো চক্র ফের সক্রিয় হয়ে সরকারি অর্থ লুটপাট করেছে।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান যুগান্তরকে বলেন, এবার বইয়ের দরপত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হয়নি। এনসিটিবি ও কিছু মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক যোগসাজশে সরকারের শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এসব দেখার কেউ নেই। সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি কমানোর চেষ্টা করলে এক্ষেত্রে এনসিটিবি উলটো পথে হাঁটছে। দরপত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের ফর্মাপ্রতি গড় মুদ্রণমূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে যেখানে ফর্মাপ্রতি গড় দর ছিল ২ টাকা ৩১ পয়সা, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ টাকা ৩২ পয়সা। গত বছরের তুলনায় দর বেড়েছে প্রায় ৪৩ দশমিক ৭ শতাংশ। একই সঙ্গে দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে বিধিবহির্ভূতভাবে প্রাক্কলিত মূল্য পুনর্নির্ধারণের অভিযোগ উঠেছে, যা এনসিটিবির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। এতে পাঠ্যবই মুদ্রণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এনসিটিবির পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ বণ্টন ও দরপত্র নিয়ন্ত্রণে একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রে মুদ্রণশিল্প সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাওসারুজ্জামান রুবেল, প্রেস মালিক দুলাল সরকার, এসএম মহসিন, মিন্টু মোল্লা, হুমায়ুন কবির, শেখ সিরাজ, পারভেজ ও সুহেলের নাম এসেছে। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় তাদের জুড়ি মেলা ভার। চক্রটি ইতোমধ্যে এনসিটিবির প্রায় হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিয়েছে।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রমা ও ব্রাইট প্রিন্টিং প্রেসের মালিক এসএম মহসিন যুগান্তরকে বলেন, এনসিটিবিতে সিন্ডিকেট বলতে কিছু নেই। আমি এবার খুব বেশি কাজ পাইনি। তবে অনিয়মের বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবার তিনি প্রায় ১২০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছেন।
এসব অনিয়মে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু, প্রতিষ্ঠানটির সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। এছাড়া প্রেস মালিকদের এ চক্রটির এনসিটিবির গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজেদের পছন্দের কর্মকর্তাদের পদায়নে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। কয়েক কোটি অর্থের বিনিময়ে শিক্ষা প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে এসব কর্মকর্তাকে পদে বসানোর অভিযোগ ওপেন সিক্রেট। প্রেস চক্রটির বিরুদ্ধে পছন্দের লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে দরপত্র প্রক্রিয়া চলাকালে প্রাক্কলিত দর বাড়ানো এবং এনসিটিবির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। আওয়ামী লিগ সরকারের সময়ও এই চক্রের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকা বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা রয়েছে। দরপত্রে লুটপাটের অর্থ বিভিন্ন মহলে ভাগবাঁটোয়ারা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চলমান দরপত্রে বিধিবহির্ভূতভাবে দর বাড়ানো এবং গোপন দর ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) মোহাম্মদ আবু নাসের টুকুর বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে জানতে তাকে একাধিকবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
অভিযোগ সম্পর্কে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা যুগান্তরকে বলেন, আমরা যথাসময়ে বই দেওয়ার চেষ্টা করছি। যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়।
বই ছাপানোর চুক্তি অনুযায়ী, ৪০ দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ বই সরবরাহের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সময় পেরিয়ে গেলেও কয়েকটি প্রেস বই সরবরাহ করছে না। চুক্তি ভঙ্গ করলে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে বই সরবরাহের চুক্তির সময়সীমা তুলে দিতে এনসিটিবির ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে প্রেস চক্রের বিরুদ্ধে। দরপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরের ৩৩৭ ও ৪০৪ নম্বর লট এবং মাধ্যমিক স্তরের ৬৭১ নম্বর লটে কাওসারুজ্জামান রুবেলের মালিকানাধীন দুটি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ও কর্ণফুলী প্রেস অংশ নেয়। অভিযোগ রয়েছে, পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে তুলনামূলক বেশি দর দিয়ে প্রতিষ্ঠান দুটি কাজ পেয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি এবার প্রায় তিন কোটি বই ছাপানোর কাজ পেয়েছে।
সম্প্রতি দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে প্রেস মালিকদের এই চক্রটি সতর্ক হয়ে যায়। পরে চলতি মাসে নতুন চারটি বইয়ের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু হলে সেখানে ভিন্নচিত্র দেখা যায়। ৯২১, ৯৩২, ৯৪৫, ৯৪৭ ও ১০১২ নম্বর লটে ৩১ থেকে ৩৪টি প্রেস প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের ও পরের দরপত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করলে প্রতিযোগিতার চিত্রে বড় ধরনের অনিয়ম স্পষ্ট হয়। এসব দরপত্রে দর ও অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যার ব্যবধানও দৃশ্যমান। তবে বই ছাপানোর কাজে কার্যকর প্রতিযোগিতা থাকলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের ঝুঁকি কমত। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার ১০১ কপি বই ছাপানো হচ্ছে। এ কাজে সরকারের ব্যয় প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। গত শিক্ষাবর্ষে ব্যয় হয় প্রায় এক হাজার ৬ শ কোটি টাকা।
এনসিটিবির ইনস্পেকশন এজেন্টদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার পর্যন্ত কয়েকটি প্রেস চুক্তি অনুযায়ী বই সরবরাহ করতে পারেনি। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি তদারকি বাড়িয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী কয়েকটি প্রেস পরিদর্শন করেছেন এবং মুদ্রণকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নিুমানের বই ছাপানোর অভিযোগে ২০টির বেশি মুদ্রণপ্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দিয়েছে এনসিটিবি।