প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করেই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন সম্পদশালী। মাটির নীচের ওই সম্পদের কারণে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে সমীহ করে। প্রাকৃতিক সম্পদে বাংলাদেশেও পিছিয়ে নেই। বরং মাটির নীচে এবং সাগরে তলদেশে লুকিয়ে রয়েছে অর্থনীতির উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা। কেবল দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে সে সম্পদ উত্তোলণে যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দেশে পাঁচটি কয়লা খনিতেই মজুদ রয়েছে ৭৮০ কোটি টনের মতো কয়লা। প্রতি টন কয়লার দাম ১৩৬ ডলার ধরলে এই কয়লার মূল্য (বড়পুকুরিয়ার বর্তমান কয়লার টন হিসাবে) এক লাখ ৬ হাজার ৮০ কোটি ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩০ লাখ কোটি টাকা।
বিশেষজ্ঞরদের মতে, বর্তমান চাহিদা ও ব্যবহার অব্যাহত থাকলে এই মজুদ দিয়ে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ বছর দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটানো সম্ভব। এ কয়লা উত্তোলন করা গেলে দেশের অর্থনীতি ও জিডিপির আকারও বড় হবে। সে জন্যই দেশের জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন থেকে বিদেশীদের উপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের খনিজ সম্পদগুলোর উত্তোলন ও ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে আসছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দৃঢ় সিদ্ধান্তের অভাবে দিল্লির অনুগত আমলারা ক্যারিকেচার করে প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে গড়িমসি করেছেন। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শ্লোগান নিয়ে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার আমলাদের সেই ‘দেয়াল’ বিচূর্ণ করে মাটির নীচের সম্পদ উত্তোলনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করলে পাল্টে যাবে দেশের অর্থনীতির গতিধারা।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ইনকিলাবকে বলেন, মাটির নিচে কয়লা রেখে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে কয়লা আমদানির কোন যৌক্তিকতা নেই। এটা খুবই দুঃখজনক। এই পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেশীয় কয়লা উত্তোলন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। আমরা ইতোমধ্যেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছি। যত দ্রুত আমরা কয়লা উত্তেলন করতে পারবো, ততই দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ কমবে এবং জনগণ উপকৃত হবে।
মাটির নিচে থাকা বিপুল কয়লা থাকার পরও কয়লা আমদানিতে সরকার খরচ করছে বিলিয়ন ডলার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, বিদায়ী অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে খরচ হয়েছে মোট ১০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার। এরমধ্যে কয়লা আমদানিতে খরচ হয়েছে এক দশমিক ৮৫ বিলিয়ন। এছাড়া ডিজেল আমদানিতে তিন দশমিক ৩১ বিলিয়ন ডলার, এলএনজি আমদানিতে দুই দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলার, এলপিজিতে এক দশমিক ২০ বিলিয়ন ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েল আমদানিতে খরচ হয়েছে এক দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার।
দেশের কয়লা খনিতে বিপুল কয়লা মজুত থাকার পরও শুধুমাত্র গত অর্থবছর এই খাতে ব্যয় এক দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের দেশবিরোধী নীতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের ভুল নীতিতে গত দেড় দশকে কয়লা আমদানিতেই গুণতে হয়েছে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা। তবে নিজেদের সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি কমানোর বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় কয়লা উত্তোলনে জোর দিচ্ছে তারেক রহমানের নেত্বত্বাধীন বিএনপি সরকার।
জানা গেছে, সরকার দিনাজপুরের ফুলবাড়ী খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি প্রাথমিক অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছে। খনিসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এ খনি থেকে উত্তোলন শুরু হলে বছরে ১৫ মিলিয়ন বা দেড় কোটি টন কয়লা পাওয়া যাবে। সেক্ষেত্রে দেশে স্থাপিত তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জন্য আমদানি করা কয়লা চাহিদার ৭৫ শতাংশই স্থানীয় উৎস থেকে মেটানো যাবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে আগে যেসব সমীক্ষা হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করতে হবে। কয়লা উত্তোলনে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও ঝুঁকি নিতে হবে। বিশেষত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিজস্ব কয়লা ব্যবহার জরুরি হয়ে উঠেছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ সরকারও জ্বালানী সংকট মোকাবিলায় সূদুর প্রসারী পরিকল্পনা নিয়েছে। এক্ষেত্রে দেশেই মাটির নীচে থাকা কয়লা উত্তোলনের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ভীত মজবুত করতে চায়। যার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীর কয়লা। সেখান থেকে উত্তোলন করা হলেও ফুলবাড়ীর পার্শ্বেই পার্বতীপুরে কয়লার বিপুল মজুদ থাকলেও উত্তোরণ করা হচ্ছে না সেই কালো সোনা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে যে পদ্ধতিতে বড় পুকুরিয়ার কয়লা উত্তোলন করা হচ্ছে তাতে মাত্র ১৮ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে-বাকি কয়লা ভূগর্ভেই পড়ে থাকছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি’র সিংহভাগ কয়লা উত্তোলনের জন্য বহুল আলোচিত ওপেন বিড পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
স্থানীয়রা বলছেন, ঘন ঘন ভূগর্ভে মাইনিং বিস্ফোরণের কম্পন আর বিস্তৃত এলাকা বিলে পরিণত হওয়ার অবস্থা দেখে একবারে পর্যাপ্ত ও বাস্তবসম্মত ক্ষতিপূরন প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে ওপেন বিড পদ্ধতির জন্য বাড়ী-ঘর ভিটেমাটি ছেড়ে দিতেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদিও বাম ঘরানার একটি পক্ষ ইতোপূর্বে তাদের জীবন মান, পরিবেশ ও বাপদাদার ভিটেমাটির মত স্পর্সকাতর ইস্যুগুলোকে সামনে এনে স্থানীয়দের আন্দোলনে নামিয়েছিল এবং ওপেন বিড পদ্ধতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় আন্দোলন করতে যেয়ে ঝড়েছিল তিনটি তাজা প্রাণও। আজ প্রায় ত্রিশ বছর পর প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। ফুলবাড়ীর মানুষ নিজেদের জীবন-মান উন্নয়নের পাশাপাশি আন্দোলনে নেতৃত্ব দানকারীদের জীবনমান উন্নয়নের চিত্র দেখে এবং পর্যালোচনা করে নিজেদের ভালোর দিকটা খুঁজছে ও বুঝতে শিখেছে। এক্ষেত্রে অনেকেই পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ এবং বাসস্থানের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ফলে সরকার যখন খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে তখন সরকারের এই মনোভাব বুঝতে পেরে আন্দোলনকারী পক্ষরা পুনরায় খনিবিরোধী আন্দোলনের চেষ্টা চালালেও দুই দশক আগের মতো আর সাড়া দিচ্ছে না স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে তাদের দাবি- ফুলবাড়ী বাসীর স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি ষ্টেক হোল্ডারদের সাথে আলোচনা এবং সর্বোপরি জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে নিজ স্বার্থের বিষয়টি এখন পরিস্কার হয়ে উঠেছে। কারন তারা দেখছে তাদের পাশেই বড় পুকুরিয়া কয়লা খনির আংশিক কয়লা উত্তোলন হওয়াতেই এলাকাবাসী দিনান্তের খেটে খাওয়া মানুষেরা কোটি পতি হয়ে গেছে। জমির ক্ষতির পূরন পেয়ে অন্য এলাকায় যেয়ে আলিশান জীবন যাপন করছে। কয়লা খনির অধিগ্রহন করা তাদের জমি এখন বিলে (ডেবে যাওয়ায়) পরিণত হয়েছে। সেটিও বাড়িয়েছে তাদের বাড়তি আয়ের উৎস।
এদিকে সরকার যখন নিজস্ব খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কথা ভাবছে এবং স্থানীয়রাও ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করছে তখন সরকারের সেই বার্তা এবং স্থানীয়দের সঙ্গে সমন্বয়ে ব্যর্থ হচ্ছেন স্থানীয় মন্ত্রী-এমপি ও বিএনপি নেতারা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রী-এমপি, নেতাদের স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ফুলবাড়ীবাসীর ন্যায্য হিস্যা বুঝিয়ে দিয়ে তাদের ও বংশধরদের বাসস্থান, কৃষি জমি ও চাকরিসহ সকল সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্ম্পকে অবগত করা এবং ক্রমান্বয়ে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
ফুলবাড়ীর পার্শ্বেই বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে পূর্বের ধারাবাহিকতায় ১৮৮৫ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর বড় পুকুরিয়া, ১৯৮৯ সালে রংপুরের খালাশপির, ১৯৯৫ সালে এবং ১৯৯৭ সালে বহুজাতিক কোম্পানী ফুলবাড়ীর কয়লা খনি আবিস্কার করেন। দেশী বিদেশী সকল ষড়যন্ত্রকে উপেক্ষা করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দৃঢ় মনেবলের ভিত্তিতে চীনের সিএমসি-এক্সএমসি কনসোটিয়ামের সঙ্গে ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন চুক্তি করে। ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ খনিজ সম্পদের যুগে প্রবেশ করে এবং কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। বড় পুকুরিয়ার কয়লার উপর ভিত্তি করে পাশেই বড় পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হয়। বলা বাহুল্য ফুলবাড়ী চুক্তির মত নয় বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা চীনা কোম্পানী বিক্রি করছে পেট্রোবাংলার কাছে আর পেট্রোবাংলা বিক্রি করছে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাছে। অর্থাৎ দেশের কয়লা জাতীয়ভাবে ব্যবহার হচ্ছে। চীনা কোম্পানী শুধু তাদের উত্তোলন খরচ পাচ্ছে। কয়লা উত্তোলনের কারনে স্থাণীয় বাসিন্দাদের আবাসস্থল ও কৃষি জমি বড় পুকুরিয়া খনি কতৃপক্ষ উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিয়ে অধিগ্রহন করে নিয়েছে এবং পর্যায়ক্রমে নিচ্ছে।
শুধু তাই নয় অধিগ্রহনের পরও খনি অভ্যন্তরে মাইনিংয়ের কারনে উপরিভাগের বাড়ীঘরে ফাটল এবং জমি ডেবে যাওয়ার ক্ষতিপূরনও দেয়া হচ্ছে। বড় পুকুরিয়ায় চাকরির সুযোগ হয়েছে ক্ষতিগ্রস্থদের। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ- স্থানীয় বাসিন্দাদের ন্যায্য হিস্যা অনুযায়ী চাকরি দেয়া হচ্ছে না। এছাড়া কয়লা উত্তোলন বন্ধ হলেই ছাটাই করা হয় শ্রমিকদের। বড় পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, এটা চলমান প্রক্রিয়া। কাজ চললে শ্রমিকদের কাজে নেয় চীনা কোম্পানি। এ ক্ষেত্রে খনি কর্তৃপক্ষের কিছু করার থাকে না। প্রায় ৬৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে বিস্তৃত বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিটি তিনটি অংশে বিভক্ত, উত্তর অংশে ২৭০, মধ্য অংশে ৩০০ হেক্টর এবং দক্ষিন অংশে ৮০ হেক্টর এলাকার নীচে কয়লার স্তর রয়েছে। যার পূরোটাই স্থানীয় জনগণের জমি। সরকার প্রয়োজন মোতাবেক অধিগ্রহন করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের কারনে বড় পুকুরিয়া কয়লা খনিতে মজুদ থাকা কয়লার মাত্র ২০ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। উম্মুক্ত পদ্ধতিতে উত্তোলন করা গেলে ৮০ শতাংশের বেশী কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। যদিও দেশীয় কয়লার ব্যবহার বাড়াতে খনির উত্তর ও দক্ষিন অংশে উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের চিন্তা করছে সরকার। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের হিসাবে এই অংশ থেকে প্রায় ১৭ কোটি টন কয়লা উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ৩০ বছর কয়লা উৎপাদন সম্ভব হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত কারিগরি ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং স্থানীয় জনগণের মতামত গ্রহনের জন্য নীতিগত অনুমোদন ও দিক নির্দেশনা চেয়ে গত ২ জুলাই পেট্রোবাংলা চিঠি দিয়েছে জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ বিভাগে।
এলাকার হাজার হাজার মানুষের পূণর্বাসন, পানি ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টি নিশ্চিত করে উম্মুক্ত পদ্ধতির কাজ শুরু করতে সময় লাগবে ৭ থেকে ৮ বছর। এরমধ্যে ২০২৭ সালে চুক্তি মেয়াদ বৃদ্ধি করে বড় পুকুরিয়ার কয়লা উত্তোলন বর্তমান পদ্ধতিতে অব্যাহতি রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন বলে খনির একটি সুত্র নিশ্চিত করেছে। উল্লেখ্য; বর্তমান পদ্ধতিতে ভূগর্ভে থাকা কয়লার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। উম্মুক্ত পদ্ধতিতে হলে ৯০ শতাংশ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হবে। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কয়লা খনির মাত্র ৫’শ থেকে ৮৫০ ফুট গভীরে কয়লা মজুদ রয়েছে এবং ১২০ থেকে ৩৫০ মিটার পর্যন্ত কয়লার বিস্তৃতি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। এই খনি থেকে প্রায় ৫৭২ টন বিটুমিনাস কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফুলবাড়ীর কয়লা ওপেন বিড পদ্ধতিতে উত্তোলন নিয়ে সরকারি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে বিরোধিতাকারীদের সোচ্চার ভূমিকা প্রশংসার দাবী রাখে। তবে প্রশ্ন এসে যায়, বিরোধীতাকারী কারা? জাতীর জন্য তাদের অবদান কি? ওপেন বিড পদ্ধতিতে কয়লা নিয়ে তারা কি কোন কিছু বলেছে? এখন সংসদ চলমান রয়েছে। এ ব্যাপারে সংসদে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে বা আলোচনায় এসেছে? এদিকে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্ত স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা কি করছেন? বিষয়গুলি খেটে খাওয়া সাধারন মানুষ ফলো করছেন। উম্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিরোধিতাকারীদের অন্যতম এবং আবেগময় ইস্যু ছিল বাপ-দাদার ভিটা ছেড়ে যাবে না।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে যারা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের অনেকের ফুলবাড়ীতে ৫ শতক নিজস্ব জমি নেই। আবার আন্দোলনের পর কেউ কেউ ফুলে ফেপে উঠেছেন। বিষয়গুলি নিয়ে সরাসরি মুখ না খুললেও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এলাকাবাসী। কত আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং বছরে কত টাকার ফসল থেকে বঞ্চিত হবে এসব বিষয়ে ব্যাখ্যা দিবেন সরকার। কেননা জমি অধিগ্রহনের ক্ষমতা ও দায় সরকারের। উপযুুক্ত ক্ষতিপূরন রাস্তা, সরকারী অফিস, কলকারখানার জন্য জমি ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি নতুন নয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যাতিক্রম কিছু হওয়ার কথা নয়। কিন্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনি বিরোধী আন্দোলনের সাথে জড়িত এক নেতা বলেন, সরকার স্থানীয় ষ্টেক হোল্ডারদের সাথে, স্থানীয় মাঠ পর্যায়ের নেতাদের পর্যায়ক্রমে বসে আলোচনা করলেই এর সমাধান হতে পারে। তবে ক্ষতিপূরন প্রদানে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
প্রধানমন্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়ে স্থানীয় জনসাধারণ এবং প্রকৃত ভূমি মালিকরা বলছেন,পরিকল্পিত নগররায়ন,কর্মসংস্থান,বাসস্থানের ব্যবস্থা হলে মাটির নিচে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্টের প্রয়োজনে ব্যবহার করলে ক্ষতি কি? কেউ কেউ আবার বলছেন, যাদের ফুলবাড়ীতে তিন-চার শতাংশের বেশী জমি নেই তারাই আবার আন্দোলনের নেতা বনে গিয়ে বিভিন্ন সময় রাষ্টের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসেছেন। কয়লা খনি বিরোধী ইস্যুকে পুঁজি করে আবারো ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকতে চান কিছু নেতা, এখন এসব আর সুযোগ নেই। তারা ২০০৬ সাল থেকে আন্দোলনকারীদের আয়ের উৎস অনুসন্ধান করারও দাবি জানান। আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়া অনেক নিম্ন ও মধ্যম সারির মানুষ বলছে, ২০ বছরে কি পেলাম। বাপের সম্পত্তির হিস্যা পেয়েছিলাম যা তা আবার আমার সন্তানদের মধ্যে ভাগ হয়ে কতটুকু থাকছে। বাপ-দাদার সম্পত্তির দোহাই দিয়ে আন্দোলনকারীদের পিছনে অনেকেই এখন নিঃস্ব। তাদের থাকার জায়গাটুকুও নেই। তাদের দাবী সরকারকে কেবল জমি আছে এমন নয় যারা নিঃস্ব হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসনের বিষয়টি অন্তভুক্ত করলে ২০০৬ সালের আন্দোলনের সাথে জড়িত অধিকাংশ খেটে খাওয়া মানুষ আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ম. তামিম বলেন, দেশের কয়লা উত্তোলনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হলে নিরপেক্ষ সমীক্ষা প্রয়োজন। আমি মনে করি, আমাদের কয়লা উত্তোলনের ব্যবস্থাপনাটা ভালোভাবে তৃতীয় কোনো পক্ষ, যার কোনো স্বার্থ নেই, এ রকম কাউকে দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা দরকার। তারা যদি বলে যে এটার ঝুঁকি সীমিত আকারে ও সে ঝুঁকি সামলানো সম্ভব হবে, কোনো সমস্যা হবে না, তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারি। আর যদি বলে ঝুঁকি অনেক বেশি, তাহলে আমরা দেশীয় কয়লা উত্তোলনের চিন্তা সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করতে পারি। ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জকে ভয় পেলে চলে না। পৃথিবীর কোনো বড় প্রজেক্ট, মেগা প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ারিং চ্যালেঞ্জ ছাড়া হয়নি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ প্রফেসর বদরূল ইমাম বলেন, স্থানীয় সম্পদ কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে যদি কয়লা উত্তোলন করতেই হয়, সেক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ পদ্ধতিতেই যেতে হবে ও সেটা সীমিত কিংবা মাঝারি আকারে হতে পারে। আমরা জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমানোর কথা বলছি, সেটা অবশ্যই ভালো দিক। সেক্ষেত্রে কয়লা উত্তোলন করে যদি আমদানির চাপ কমানোর পরিকল্পনা হয়, সেক্ষেত্রে কৃষি জমি, সুপেয় পানি, পরিবেশগত জটিলতাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে। ফলে সে প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে কোন পদ্ধতিতে কয়লা তোলা যায় সেটার সব ধরনের সমীক্ষা বিবেচনায় নিতে হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ইনকিলাবকে বলেন, ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি চাহিদার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর চাপ অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার ওপর বর্তমান যুদ্ধকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই অবস্থায় আমাদের দেশীয় সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগানোটা এখন সময়ের দাবি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের দেশে প্রচুর কয়লা মজুত রয়েছে। তবুও প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে আমাদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। যেটা আমাদের অর্থনীতির ওপর অনেক বড় চাপ।