বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচনের পথে নতুন করে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি, সার ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা- পরিস্থিতিকে আরও
জটিল করে তুলেছে। ফলে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পরিবর্তে অনেক মানুষ আবারও দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এমন বাস্তবতায় আজ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যবিমোচন দিবস।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ সালে এ হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। একই অর্থবছরে প্রায় ২১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে। দারিদ্র্যের এই চিত্রের পাশাপাশি বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে রয়েছেন। মূল্যবৃদ্ধি, অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা চাকরি হারানোর মতো একটি ধাক্কাই তাঁদের আবার দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ উঠে এসেছে। ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি স্থবির হয়ে পড়া এবং নারীদের চাকরি হারানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি থাকলেও তার সুফল সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতায় যথেষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো খাবার, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক পরিবারকে প্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। উচ্চমূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের গতি মন্থর থাকা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হওয়া মিলিয়ে বর্তমানে দারিদ্র্য পরিস্থিতি খুবই প্রতিকূল অবস্থায় রয়েছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন জরিপেও দেখা যাচ্ছে, দারিদ্র্যসীমা ও চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা জনসংখ্যার হার এখন বেশ উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিনিয়োগে গতি আনতে হবে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে আরও কার্যকর ও জোরদার করতে হবে।
দারিদ্র্য বিমোচনে তরুণদের কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিশেষ করে আমাদের তরুণ-তরুণীদের জন্য কর্মসংস্থান ও স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দেশে শুধু দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে না, আয়বৈষম্য, ভোগবৈষম্য ও সম্পদবৈষম্যও বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা যদি অর্থনৈতিকভাবে উন্নত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, তাহলে অবশ্যই শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটি এখন সময়ের দাবি।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ বলছে, নতুন করে দারিদ্র্যে পড়া মানুষের বড় অংশ এমন পরিবার, যাদের আয় কমেছে বা কর্মসংস্থান হারিয়েছে এবং যারা উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামাল দিতে পারছে না। অর্থনীতির ধীরগতিতে নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরির হার কমেছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। কাজ হারানো নারীদের অনেকে আর শ্রমবাজারে ফিরতে পারেননি। ফলে যেসব পরিবার একসময় দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে ছিল, আয় কমে যাওয়ায় তাদের একটি অংশ আবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি আগের অর্থবছরের ১০ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে। তবে মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয় বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত মজুরি না বাড়ায় তাঁদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিঘ্নের কারণে শিল্পকারখানা, পরিবহন ও কৃষি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাসের সংকটে দেশে সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয়ও বাড়তে পারে।
যুদ্ধের প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশে প্রায় ৬ লাখ চাকরি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। যুদ্ধ না হলে ২০২৬ সালে প্রায় ১৭ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ সংখ্যা কমে প্রায় ৫ লাখে দাঁড়াতে পারে বলে ওই মূল্যায়নে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
জ্বালানি ও সারের দাম বাড়লে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। এতে দরিদ্র পরিবারগুলোর ব্যয় আরও বাড়বে। একই সঙ্গে সরকারের ভর্তুকি ব্যয় বেড়ে গেলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ রাখাও কঠিন হতে পারে।