Image description

সারা দেশে একদিকে হাম ও হামের উপসর্গ এবং ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। একই সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক রোগী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শুক্রবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার তথ্য বলছে, হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরও পাঁচজনের। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে মোট ১ হাজার ১৮৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হওয়ার পর মারা গেছে ১০৪ জন। বাকি ১ হাজার ৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে। অর্থাৎ হামের উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা নিশ্চিত হামে মৃত্যুর তুলনায় প্রায় ১০ গুণ। তবে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়াদের সবাইকে পরীক্ষায় নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা যায় না। এই সময়ের মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬১৫ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে দুজন চট্টগ্রাম বিভাগের এবং ঢাকা, ময়মনসিংহ ও বরিশাল বিভাগের একজন করে। এ সময়ে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে কোনো মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে নতুন করে ১ হাজার ১৬৪ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে এবং পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে ৪৬ জনের শরীরে।

 

 

এ ছাড়া গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ২ লাখ ১১ হাজার ৪০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের মধ্যে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২ হাজার ৯৭২ জনের। উপসর্গ থাকা মানুষের তুলনায় নিশ্চিত রোগী কম হলেও বিপুলসংখ্যক মানুষের উপসর্গ দেখা দেওয়া সংক্রমণ শনাক্তকরণ, পরীক্ষা এবং চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

বিভাগভিত্তিক তথ্যেও উদ্বেগজনক। হামের উপসর্গ নিয়ে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে- ৪৮৮ জন। এরপর সিলেটে ১৮৯, চট্টগ্রামে ৯৮, রাজশাহীতে ৯৩, ময়মনসিংহে ৮২, বরিশালে ৬৫, খুলনায় ৪৯ এবং রংপুরে মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের।

ঢাকায় মৃত্যুর সংখ্যা অন্য বিভাগগুলোর তুলনায় বেশি হওয়ায় রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় রোগী শনাক্ত, দ্রুত চিকিৎসা এবং শিশুদের সুরক্ষায় বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

অন্যদিকে ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৪৪০ জন। তাদের মধ্যে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১ লাখ ২ হাজার ২১০ জন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ৩৩৫ জন।

মাসভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের প্রথম দিকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু তুলনামূলক কম থাকলেও বর্ষা ও পরবর্তী সময়ে তা বেড়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে, মে মাসে একজন, জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬, আগস্টে ৪৩ এবং সেপ্টেম্বরে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অক্টোবরে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ৯০ জন। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরের তথ্য মিলিয়ে চলতি বছরের মোট ডেঙ্গু মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ ঘটেছে এই দুই মাসে।

এই হিসাব ডেঙ্গুর মৌসুমি বিস্তারের পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধে আগাম প্রস্তুতির গুরুত্বও তুলে ধরে। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরের পরও অক্টোবরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মৃত্যু হওয়ায় শুধু বর্ষাকালকেন্দ্রিক মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম যথেষ্ট কিনা, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে মৃত্যুর মাসভিত্তিক তথ্য একা দিয়ে সংক্রমণ বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ করা যায় না।

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ১ হাজার ১৮১ জনের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৬৬ জন এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ১২৫ জন ভর্তি হয়েছেন। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২১৯ জন। বিভাগগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৪২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়া খুলনায় ১৪০, বরিশালে ১২৭, রাজশাহীতে ৯৯, ময়মনসিংহে ৯২ এবং রংপুর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭১ জন।

এখানে লক্ষণীয়, ডেঙ্গু রোগীর চাপ শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসা, পরীক্ষার সুবিধা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং রোগী ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করে দেরিতে হাসপাতালে আসা, রোগের জটিলতা শনাক্ত এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় কোনো ঘাটতি রয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে হাম ও ডেঙ্গুর পরিসংখ্যান দুটি ভিন্ন ধরনের জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের সুরক্ষা, টিকাদানের আওতা, দ্রুত রোগ শনাক্ত এবং জটিল রোগীর চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। আর ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত পরীক্ষা এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ নয়, এসব মৃত্যুর পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।