Image description

বন্যায় পানিবন্দি মানুষকে উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার কাজটি করে উদ্ধারকারী নৌযান বা রেসকিউ বোট। সেটিই এখন কোমরপানিতে ডুবে উদ্ধারের অপেক্ষায় আছে। লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর তীরে সাড়ে তিন বছর ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোট। অযত্ন আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, হারিয়ে যাচ্ছে সরঞ্জাম। অথচ প্রতি বছর তিস্তার পানি বাড়লে বন্যা ও নদীভাঙনে বিপর্যস্ত হয় নদীতীরবর্তী জনপদ। দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন বাঁচাতে কেনা সরকারি সম্পদ এখন কাজে আসছে না কারও।

স্থানীয়রা বলছেন, সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়নে তিস্তা নদীর তীরে কোমরপানিতে ডুবে আছে বোট দুটি। গায়ে জমেছে কচুরিপানা। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে জরাজীর্ণতার চিহ্ন। ইঞ্জিনসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। নৌযান দুটি দেখভালের দায়িত্বে থাকা চালক ও কর্মচারীরাও বেতন না পাওয়ায় কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন। ফলে নৌযানগুলো সচল রাখা তো দূরের কথা, নিয়মিত দেখভালও হচ্ছে না।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, বন্যাপ্রবণ ১৫টি জেলার জন্য ২০২১ সালের ২৭ ডিসেম্বর ১৮টি মাল্টিপারপাস রেসকিউ বোটের বাজেট অনুমোদন করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৪ এপ্রিল বিভিন্ন জেলায় আরও ৩৬টি বোট সরবরাহ করা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় তিস্তার তীরবর্তী মানুষের দুর্যোগকালীন সহায়তার জন্য বুড়িমারী-লালমনিরহাট-১ ও বুড়িমারী-লালমনিরহাট-২ নামে দুটি বোট দেওয়া হয়। প্রতিটির দাম প্রায় ৬৫ লাখ টাকা।

নদীতীরের বাসিন্দাদের ভাষ্য, শুরুর দিকে প্রায় এক বছর নৌযান দুটি চলাচল করেছিল। কিন্তু এরপর বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ। প্রয়োজনীয় জ্বালানি, চালক-কর্মচারীদের বেতন এবং যন্ত্রাংশের দেখভালের ব্যবস্থা না থাকায় ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ে বোট দুটি। গত সাড়ে তিন বছর ধরে নদীর তীরে পড়ে থাকলেও এগুলো সচল করার কার্যকর উদ্যোগের কথা জানা যায়নি।

সরকারি অর্থে কেনা নৌযান এভাবে পড়ে থাকায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, নিয়মিত তদারকি ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে বোট দুটি এত অল্প সময়ে নষ্ট হতো না। এখন বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে। এতে সরকারি সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি বন্যার সময় জরুরি উদ্ধারকাজে ব্যবহারের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তিস্তাপাড়ের মানুষ।

তিস্তাপাড়ে ঘর সাজু মিয়ার। তার ভাষায়, ‘সরকার আমাদের উপকারের জন্য বোট দুটি দিয়েছিল। কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে সেগুলো এখন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। নাট-বোল্টসহ দামি যন্ত্রাংশ হারিয়ে যাচ্ছে। বন্যার সময় মানুষের কাজে লাগার কথা থাকলেও এখন আমরা কোনো সুফল পাচ্ছি না।’

তার মতে, তিস্তার পানি বেড়ে গেলে অনেক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় অনেক এলাকায় যাতায়াত কঠিন হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষকে উদ্ধার, নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দিতে নৌযানের প্রয়োজন হয়। বোট দুটি সচল থাকলে এসব কাজে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত।

বোট অচল হওয়ার পেছনে পরিচালন ব্যয়ের সংকটের কথা জানিয়েছেন চালকরাও। বুড়িমারী-লালমনিরহাট-২ বোটের চালক আলমগীর মিয়ার ভাষ্য, বোট দুটি আনার পর প্রায় এক বছর বেতন ও জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো দায়িত্ব নেওয়া হয়নি। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় তারা কাজ বন্ধ করে দেন।

দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনাই যথেষ্ট নয়; সেগুলো সচল রাখা, জনবল নিয়োগ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও জরুরি— মনে করেন বন্যাপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে নৌযান দুটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাবে।

নৌযান দুটির চালকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং বোট সংরক্ষণের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে— জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল মতিন।

তবে বোট দুটি মেরামত করে আবার চালু করা হবে কি না— পরিচালন ব্যয় কীভাবে নিশ্চিত করা হবে কিংবা নষ্ট হয়ে যাওয়া যন্ত্রাংশের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বন্যার সময় মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় ব্যবহারের জন্য কেনা নৌযান দুটি পড়ে আছে নদীর পানিতে।

লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল ইসলামের ভাষ্য, বোট দুটি আনার পর প্রায় এক বছর ভালোভাবে চলেছিল। পরে কারিগরি কারণে নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো ব্যবহার না হওয়ায় বিধি অনুযায়ী সংরক্ষণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।