Image description

‘১২ তারিখ নির্বাচনের পর ১৩ তারিখ সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। অথচ কিছুই ঠিক হলো না। মন্ত্রী মহোদয় আমাদের জীবন কঠিন থেকে কঠিনতম করে দিলেন।’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীকে উদ্দেশ্য করে ফেসবুক স্ট্যাটাসে এটি লেখার কারণে জুবায়ের আহমদ নামে সিলেটের এক শিক্ষককে ১০ ঘণ্টা হেফাজতে কাটাতে হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে কোম্পানীগঞ্জের জুবায়ের আহমদকে থানায় নেওয়া হয়। পরে রাত ১১টা ৫০ মিনিটে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর আগে সাদা কাগজে তার সই নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

জুবায়ের উপজেলার কলাবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি কলাবাড়ি কিন্ডারগার্টেন নামে বাচ্চাদের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি তার পাথর ভাঙার একটি ছোটখাটো মিল আছে।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমি কল্পনা করিনি, নরমাল একটা লেখা নিয় এমন কিছু হবে। আমি পুরা ফেডাপ। অসুস্থ হয়ে গেছি।’

কোম্পানিগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. উছমান গনি টাইমসকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তিনি (জুবায়ের) নিজে থেকে অনুতপ্ত হওয়ায় দুইজনের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি আমাদের আশ্বস্ত করেছেন, এমন কাজ আর করবেন না।’

গত ৮ অক্টোবর রাতে নিজের ফেসবুক আইডিতে মন্ত্রী আরিফুলের তিনটি ছবি দিয়ে ওই পোস্টটি করেন জুবায়ের।

জুবায়ের টাইমসকে জানান, সেই রাতেই সিলেটের এক পরিচিতি সংবাদকর্মী তাকে পোস্টটি ডিলিট করার পরামর্শ দিলে তিনি ডিলিট করে দেন। কিন্তু পরের দিন তিনি শুনতে পান তার সম্পর্কে নানা তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমি নিরীহ মানুষ, আমার বাপ-দাদা সবাই কৃষক। আমি কোনো রাজনীতি করি না। কিন্তু এলাকার বিভিন্ন মানুষকে কল দেওয়া হতে থাকে। ডিবি-ডিজিএফআই-এনএসআইয়ের নাম বলতে থাকে। আমি তখন ভয় পেয়ে যাই, ফোন বন্ধ করে দিই।’

মঙ্গলবার জুবায়ের শুনতে পান, বিএনপির দুই নেতাকে কল করে ওসি বলেছেন, তাকে নিয়ে থানায় যেতে। তিনি ফোন বাড়িতে রেখে যান। পরে তার চাচার মাধ্যমে সেই ফোন নিয়ে তল্লাশি করা হয়।

থানায় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর ও সিনিয়র সহসভাপতি শওকত আলী বাবুল উপস্থিত ছিলেন বলেও জানিয়েছেন জুবায়ের। দুপুর একটার সময় সেখানে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে তিনি শুনতে পান, মন্ত্রী আরিফুল নারায়ণগঞ্জের একটি অনুষ্ঠানে আছেন। তিনি পরে কথা বলবেন।

 
 
 

তখন ওসি বলেন, ‘এখন সে বাইরে গেলে আবার কীভাবে তাকে আনা হবে।’

তখন জুবায়েরকে একটি কক্ষে তালা দিয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে রাত ৯টার দিকে বের করে আবার ওসির কক্ষে নেওয়া হয়। পরে শওকত আলী বাবুল ও লাল মিয়া নামে বিএনপির আরেক নেতার জিম্মায় জুবায়েরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার আগে সাদা কাগজে সই নেওয়া হয়।

     শিক্ষক জুবায়ের আহমদের ফেসবুক পোস্ট। ছবি: ফেসবুক

কোম্পানিগঞ্জ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সুজন কর্মকার টাইমসকে বলেন, ‘ফেসবুক পোস্ট নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছিল, বিএনপির দুইজন নেতা সেই ব্যক্তিকে থানায় এনেছিলেন।’

সেই দুই নেতার একজন আলী আকবর কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ’।

তবে জুবায়েরকে থানায় নেওয়ার কথা অস্বীকার করে আলী আকবর টাইমসকে বলেন, ‘সে মন্ত্রীকে নিয়ে একটা পোস্ট করেছিল। আমরা বলেছি পোস্টটা ডিলিট করে দাও।’

কিন্তু আপনি কেন অন্য একজনের পোস্ট ডিলিট করাবেন- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমি মনে করেছি পোস্টটা ভালো না, এ জন্যই বলেছি।’

ওসি বলেন, ‘জুবায়েরকে আটক বা গ্রেপ্তার করা হয়নি। ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় আনা হয়েছিল।’

বিএনপি নেতা ও পুলিশের এই তৎপরতা স্পষ্টতই বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের লঙ্ঘন। জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপির ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দিয়ে নির্বাচনি ইশতেহার ২০২৬ উল্লেখ করে লেখা হয়, ‘গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।’

ইশতেহারেও লেখা আছে, ‘এমন একটি উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ করা হবে, যেখানে কোনো মত বিশ্বাস বা পরিচয় অবমূল্যায়িত হবে না। মুক্ত ও নিরাপদ মত প্রকাশ স্বাধীন গণমাধ্যম ও বাধাহীন চিন্তার পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে কল করা হলে সাড়া মেলেনি। তাকে লিখিত প্রশ্ন পাঠানো হলেও জবাব আসেনি।

হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি-এইচআরএসএস নামে একটি বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম এই ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

টাইমসকে তিনি বলেন, ‘ফেসবুকে লেখালেখির কারণে সরকার যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে, তাদের অনেকেই অশালীন ভাষা ব্যবহার করেছেন। তবে বর্তমান ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ ও সহজ ভাষার। এরপরও তাকে সরকারের পক্ষ থেকে আটক করা হয়েছে কেন?’

এই ঘটনাটিতে তিনি মত প্রকাশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন। বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন আইন ব্যবহার করে নাগরিকদের হয়রানি করা হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এ ধরনের ঘটনা কিছুটা কমলেও বিএনপি সরকারের আমলে তা আবারও দেখা যাচ্ছে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, ‘পুলিশের এখন মেরুদণ্ড নেই। বিএনপি নেতারা যখন ওই যুবককে থানায় নিয়ে গেছেন, তখন তাকে আটক রাখা পুলিশের ঠিক হয়নি।’

যে স্ট্যাটাস দিয়ে এত তুলকালাম সেটি কেন দিয়েছিলেন- এই প্রশ্নে ভুক্তভোগী জুবায়ের বলেন, ‘মন্ত্রী বলেছিলেন, নির্বাচনের পরদিন পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া হবে। আর সেই ভরসায় তারা কয়েকজন মিলে একটি ছোটখাটো পাথর ভাঙার মিল করেছেন। কিন্তু কোয়ারি চালু হয়নি, এই হতাশা থেকেই এমন কথা লেখেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করি, আড়াই-তিন হাজার টাকা বেতন। এ কারণে ব্যবসাটা করতে চেয়েছিলাম।’