Image description

দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেও মূল্যায়ন নেই—অন্যদিকে ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা পাচ্ছেন গুরুত্বপূর্ণ পদ। গণ অধিকার পরিষদের সিনিয়র সহসভাপতি ফারুক হাসানকে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাঞ্চলের পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার পর বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে এখন এই প্রশ্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে সমালোচনা, উঠেছে ‘গুপ্ত’ রাজনীতির অভিযোগও।

সম্প্রতি ফারুক হাসানকে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাঞ্চলের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পদটি উপসচিব পদমর্যাদার। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।তিনি বলেন, “আমাকে বিদ্যুৎ বিভাগের পূর্বাঞ্চলের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে সরকার। গত সপ্তাহের শুরুতে আমি কর্মস্থলে যোগদান করেছি।”

এর আগে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে গণ অধিকার পরিষদে যোগ দেন ফারুক হাসান। সে সময় দলটির সভাপতি নুরুল হক নুর ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান তাকে উচ্চতর পরিষদের সদস্য ও সিনিয়র সহসভাপতি পদমর্যাদায় দলীয় মুখপাত্র হিসেবে মনোনীত করেন।

ফারুকের নিয়োগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের একাংশ। তাদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করে বিভিন্ন দলে থাকা গুপ্তদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে সর্বত্র।

ছাত্রদলের ক্ষোভ: মূল্যায়ন কোথায়?

ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুল ফারুকের নিয়োগ নিয়ে লিখেছেন, “ছাত্রদলের ছেলেরা ১৮টা বছর লড়াইটাকে টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর ছাত্রদলের কয়টা ছেলেকে বিএনপি মূল্যায়ন করতে পেরেছে? মূল্যায়ন দূরের কথা, নীতিনির্ধারকদের সাথে একটা মিটিংও তো হইলোনা আমাদের। সাইয়েদ আব্দুল্লাহকে দ্বিতীয় গ্রেডে বিশেষ সহকারী করা হয়েছে। রাশেদ খানকে রাজনৈতিক বিশেষ সহকারী করা হয়েছে। কাল ফারুককে পর্যন্ত পরিচালক করা হলো। এগুলো নিয়ে আমাদের কিছু বলার নাই। সরকার যাকে যেখানে প্রয়োজন মনে করে, সেটা সরকারের ব্যাপার। কিন্তু সমসাময়িক ছাত্রদলের একজনকেও সমমানের একটা জায়গায় বিবেচনা করা গেল না? ছাত্রদল এতোটাই গুরুত্বহীন? এতোটাই মানহীন? ছাত্রদল অবশ্যই মানহীন না। সমস্যা হলো, আমাদের নীতিনির্ধারকদেরই ঐ বোধটুকু নাই। ঐ দরদটুকু নাই।”

বিএনপিপন্থী টকশো আলোচক রেজাউল রনি নিজ আইডিতে পোস্ট দিয়ে বলেন, “ফারুক হাসানের চাটাচাটির রেজাল্ট নিয়ে কি ভাবছ ভন্ডুরা? জাশির ঘেউ ঘেউ এখন শোনবেন না। কেন না এখন তাদের আব্বা ফারুক নিয়োগ পাইছে। কয়েকদিন আগে তাদের আরেক আব্বা জুলাই জাদুঘরে নিয়োগ পাইছিল তখনও এরা নিদ্রায় চলে গেছিল। ফারুক গোপনে চেটেছে আর প্রকাশ্যে বিএনপিকে নিয়ে যত আজেবাজে ও ভুয়া কথা বলা যায় বলেছে। অবশেষে একটা পদে নিয়োগ হইছে। এবং তার ব্যাপারে আর কোন রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা কারো থাকবে বলে আমার মনে হয় না। ফারুকের নিয়োগ হইছে আর জাশির কুত্তাগুলা সাথে সাথে শীত নিন্দ্রায় চলে গেছে। এই জায়গায় বিএনপির কেউ নিয়োগ পাইলে এতোক্ষণ ফেবুতে বট ফোর্স ধুয়া তুইলা ফালাইতো। এলিট ছাপড়ি ও বাম বাটপাগুলাও মকারি শুরু করতো।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী হাবিবুর রহমান লিখেছেন, “ছাত্রদল করলে আজ যারা কেন্দ্রীয় কমিটিতে বড়জোর চল্লিশ নম্বর সিরিয়ালে জয়েন্ট সেক্রেটারি হতে পারত, অন্য দল করে বিএনপির আশীর্বাদে তারাই এখন জাতীয় নেতা, জাতীয় নীতিনির্ধারক বনে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে ছাত্রদলে কর্মী খুঁজে পাওয়া যাবে না। সবাই তখন একটা দোকান, একটা ইউটিউব চ্যানেল কিংবা একটা ব্যক্তিগত প্রেসক্লাব খুলে জোটবদ্ধ হয়ে সরকারে ঢুকে পড়বে। রাজনীতিতে ত্যাগ-তিতিক্ষা আর দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক অবদানের চেয়ে শর্টকাটে ক্ষমতার কেন্দ্রে যাওয়াই যদি বেশি সহজ হয়, তাহলে ছাত্রদলের জন্য ভবিষ্যতে কর্মী ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। ছাত্রদল হবে মজুরিবিহীন শ্রমিকদল।”

বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট আবু সুফিয়ান ফারুকের নিয়োগ ইস্যুতে লিখেছেন, “হাসিনার শাসনামলে নির্যাতিত বইলা জামানত হারানো গণঅধিকারের ফারুক হাসানের সরকারি দপ্তরে নিয়োগ হয়। হাসিনার শাসনামলে বিএনপির যেইসব পরিবার, বাবা ভাই স্বজন হারিয়েছে। তাদের পরিবারের জন্যে সরকার কি করেছে? ক'দিন আগেও তো বিএনপির এক নেতা বিনাচিকিৎসায় মারা গেলো। বিএনপির রাজনীতির সাথে বড়ভাই যুক্ত বইলা ছোট ভায়ের চাকুরী হয়নাই। আরেক ছাত্রদল নেতার অসুস্থতার নিউজ ভাইরাল হলে সরকার বিপদে পড়ে তার চিকিৎসার দায় বার নেন। আমাদের ছাত্রদলের খোকন শ্যামল কই? খোকন যে ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে আগ্রাসনের দিনে ছাত্রদলরে টিকায়ে রাখছে, তারা হারাইলো ক্যামনে? আগামী প্রজন্ম কি দেইখা ছাত্রদল করবে? ফারুকদের মতো জাশি যখন সরাসরি নিয়োগ পায়, তাহলে নিশ্চিত থাকুন এই বিএনপি চুরি হয়ে গেছে। এটা আমাদের বিএনপি না।”

বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. আসিফ সৈকত লিখেছেন, “হারাধনের পাঁচ ছেলের তিনজনই সরকারে ! এদের মধ্যে ফারুককে আমি স্ট্রেটকাট গুপ্ত বলবো। জাশি এনসিপির চেয়েও ফারুক বিশ্রীভাবে বিএনপিকে আক্রমণ করেছে। নূর, রাশেদ বিএনপি বিরোধী নয় , ফারুক তো পিউর গুপ্ত প্রোডাক্ট ! অথচ ১৭ বছর রাজপথে রক্ত ঘাম ঝরিয়ে একটা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরীও পায়না আমাদের ছোটো ভাইগুলা।”

বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুজ্জামান সেলিম লিখেছেন, “বিএনপি সরকার এই জায়গায় সত্যিই সফল! গত ১৭ বছর যারা নিজের পরিবার-পরিজনের কথা না ভেবে বিএনপিকে নিজের পরিবার মনে করে রাজপথে লড়াই করেছেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতন সহ্য করেছেন, আজ সেই ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন কোথায়? দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ মূল্যায়ন পাচ্ছেন এমন কিছু মানুষ, যাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যায়ন হচ্ছে কথিত গুপ্ত জামায়াত-শিবিরের লোকজনের, মূল্যায়ন হচ্ছে সেই গুপ্ত জাশি ফারুকেরও!”

ফাহাদ মোহাম্মদ নামের একজন বিএনপিপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট লিখেছেন, “গতকাল গণঅধিকার পরিষদের ফারুক হাসানকে নিয়ে তারা তেমন সমালোচনা করছে না। বরং তাদের অনেক কর্মী খুশিও হয়েছে। ফারুক হাসানের এই নিয়োগে কি বিএনপির কর্মীদের চেয়ে জামায়াত-শিবির ও এনসিপির কর্মীরা বেশি খুশি? যদি তা-ই হয়, তাহলে তো ঝামেলা আছে। ফারুক হাসান কিন্তু কয়েক মাস আগেও বিএনপিকে নোংরাভাবে আক্রমণ করেছেন।”

প্রসঙ্গত, অভ্যুত্থানের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘গুপ্ত’ ট্যাগ নিয়ে বিতর্ক ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগে চাপে পড়ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র থেকে তৃণমূল কর্মীরা কেউই এ ট্যাগ থেকে রেহাই পাচ্ছেন না।