Image description

নিজেদের তৈরি কাঠের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন দেখেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনি। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে প্রায় আড়াই বছর ধরে পরিশ্রম করে তৈরি করেছিলেন স্বপ্নের নৌযানটি। পরিকল্পনা ছিল, এই নৌযানে করেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে ফিরবেন। কিন্তু স্বপ্নপূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রকৃতির বৈরিতা। সাগরে ডুবে যায় কাঠের তৈরি নৌযানটি। সেদিন প্রাণে বাঁচলেও হারাতে হয় ১৬ বছর বয়সি বড় ছেলে আলবার্টকে। এরপর থেমে যায় সমুদ্রযাত্রার স্বপ্ন।

 

সন্তান হারানোর শোক আর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অবশেষে কক্সবাজার ছেড়েছে পরিবারটি। বুধবার (১৪ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৪টায় কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে উড়োজাহাজে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন জন এডওয়ার্ড পুডনি (৭৪), তার স্ত্রী বেলা (৩৬) ও ছেলে রালফ (১৩)। নৌযানডুবির ঘটনার পর থেকে তারা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে কক্সবাজারের পর্যটন মোটেল শৈবালে অবস্থান করছিলেন। সেখানে টানা ৫০ দিন থাকার পর বুধবার বিকেল তিনটায় হোটেল ত্যাগ করেন।

 

এদিন বিকেল চারটার দিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান পরিবারটিকে বিদায় জানান। এ সময় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ছবি তুলে কক্সবাজারে কাটানো সময়ের স্মৃতি ধরে রাখেন।

 

হৃদ্যতার সম্পর্ক, স্বাভাবিকভাবে ফিরতে শুভকামনা

 

হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের নাগরিকেরা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়েছিলেন। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের পর্যটন মোটেল শৈবালে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ৫০ দিন অবস্থানের পর বুধবার তারা হোটেল ছেড়েছেন। এ সময়ে তাদের খাবার, নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। খাবার ও দেশে ফিরে যাওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসন দেখভাল করেছে।’

 

তিনি আরও বলেন, ‘সব মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডের নাগরিকেরা ভালো পরিবেশে ছিলেন। তারা অনেক খুশি। বাংলাদেশ সম্পর্কে ভালো ধারণা নিয়ে দেশে ফিরছেন। আমাদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকায় আমাদের হৃদ্যতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। যাওয়ার সময় দেশীয় পণ্য উপহার দিয়েছি। এ সময় আমাদের শুভকামনা জানিয়েছেন।’

 

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘নিউজিল্যান্ডের চার নাগরিক একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার শিকার হয়েছিল। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সর্বশেষ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। দূতাবাস কর্তৃপক্ষ এই তিন নাগরিককে কীভাবে দেশে ফেরত পাঠানো যায়, সে বিষয়ে মতামত চেয়েছিল।’

 

 

 

কক্সবাজারের হোটেল শৈবাল ছাড়ছেন নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কক্সবাজারের হোটেল শৈবাল ছাড়ছেন নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

 

 

তিনি আরও বলেন, গত ৭ অক্টোবর তাদের ফেরার কথা ছিল। কিন্তু পাসপোর্ট, ভিসা ও বিমানের টিকিট সংক্রান্ত জটিলতায় সেদিন তারা যেতে পারেননি। অবশেষে বুধবার তারা কক্সবাজার ছেড়েছেন। ভালো-মন্দ, যে অভিজ্ঞতাই তাদের হয়ে থাকুক, তা নিয়ে তারা নিরাপদে দেশে ফিরুক। সেখানে গিয়ে যেন স্বাভাবিক জীবনে পুরোপুরি ফিরতে পারেন, সেটিই আমাদের কামনা করছি।

 

৫০ দিন হোটেলে, বিল ৪ লাখ ২৪ হাজার টাকা

 

পরিবারটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এক মাসের বেশি সময় ধরে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন পুলিশ সদস্যরা। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দুজন পুলিশ সদস্য দায়িত্বে থাকতেন। বুধবার ছিল তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের শেষ দিন। এদিন দায়িত্বে ছিলেন নায়েক রাহাত ও কনস্টেবল আবদুল কাদের।

 

নায়েক রাহাত বলেন, ‘তারা কোথায় যাচ্ছেন, কেন বাইরে বের হচ্ছেন এসব বিষয় দেখতে হতো। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। প্রথম দিকে তারা খুবই রূঢ় আচরণ করতেন, পরে তা কমে এসেছে।’

 

এদিকে ১৩ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের স্বাক্ষরিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৬ আগস্ট থেকে ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত হোটেল শৈবালে পরিবারের সদস্যদের অবস্থান, রাত্রিযাপন ও খাবারের জন্য মোট বিল হয়েছে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৬২৭ টাকা।

 

 

 

কক্সবাজার বিমানবন্দরে জন এডওয়ার্ড পুডনি, তার স্ত্রী বেলা ও ছেলে রালফ। ছবি : এশিয়া পোস্ট
কক্সবাজার বিমানবন্দরে জন এডওয়ার্ড পুডনি, তার স্ত্রী বেলা ও ছেলে রালফ। ছবি : এশিয়া পোস্ট

 

 

 

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসি ডিলাক্স কক্ষের ভাড়ায় ২০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার পর বিল দাঁড়িয়েছে ২ লাখ টাকা। খাবারের বিল ২ লাখ ২১ হাজার ৫০৭ টাকা এবং লন্ড্রি বাবদ খরচ হয়েছে ৩ হাজার ১২০ টাকা। বিল পরিশোধের জন্য শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় অবস্থিত নিউজিল্যান্ডের হাইকমিশনের কনস্যুলার অ্যান্ড প্রপার্টি কর্মকর্তা মিস নাদিসা ফার্নান্দোর কাছে তা পাঠানো হয়েছে। বিল পরিশোধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেও প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।

 

যেভাবে সাগরে ডুবেছিল ‘আইল্যান্ড গার্ল’

 

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার পৌরসভার নাজিরারটেক ও সোনাদিয়া দ্বীপের মধ্যবর্তী সাগরে অনুমতি ছাড়া নৌভ্রমণের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয় পরিবারটি। খবর পেয়ে কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা পরিবারের তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। পরদিন বিকেল পাঁচটার দিকে সমিতিপাড়াসংলগ্ন সৈকত থেকে তাদের বড় ছেলে আলবার্টের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

 

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গত ১৩ সেপ্টেম্বর আলবার্টের মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়। পরে মরদেহ তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর নিউজিল্যান্ড দূতাবাস ও পরিবারের সম্মতিতে কক্সবাজার শহরের একটি হিন্দু শ্মশানে আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন হয়।

 

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি প্রায় দুই বছর ধরে কক্সবাজারে অবস্থান করছিল। পরে তারা নিজেদের তৈরি ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নামের নৌযানে বসবাস করছিল। নৌযানটি তৈরিতে দেড় কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছিল।

 

জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিদেশি নাগরিকদের বরাত দিয়ে জানান, ভিসার মেয়াদ সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে পরিবারটি সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল। নৌযানডুবির সময় আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকভাবে আটকানো ছিল না বলে তাদের ধারণা। আলবার্ট সাঁতার জানত না। সে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন ছিল।

 

এর আগে, গত ৭ এপ্রিল বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরে পরিবারটি সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেয়। সেখানে রাতে দুর্বৃত্তরা তাদের ওপর হামলা চালিয়ে ক্যামেরা, মোবাইল ফোন, পাসপোর্ট, ডলারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে। খবর পেয়ে ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড তাদের উদ্ধার করে। পরে অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া অধিকাংশ মালামাল উদ্ধার করা হয়।