Image description

নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের মধ্যে সৌরবিদ্যুতে বেশ অগ্রগতি থাকলেও সম্ভাবনাময় বায়ুবিদ্যুতে অগ্রগতি খুব কম। দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এর অবদান প্রায় ৬৩ মেগাওয়াট। এর প্রায় পুরোটাই আসছে কক্সবাজারের খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশিবিদেশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অফশোর (উপকূল থেকে দূরে সমুদ্রের অংশে) এবং স্থলভাগে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য তথ্য সংগ্রহের কাজ করছে। এ তথ্য যাচাইবাছাই শেষে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে দেশের কোন স্থানগুলোতে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অফশোর ও উপকূলীয় এলাকায় বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।  

বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্তমান অবস্থা : কক্সবাজার সদর উপজেলার বাঁকখালী নদীর তীরে অবস্থিত খুরুশকুল বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ প্রকল্প। বাণিজ্যিকভাবে ২০২৪ সালের ৮ মার্চ এর উৎপাদন শুরু হয়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আড়াই বছরে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ লাখ ৯৬ হাজার মেগাওয়াট প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ দিয়েছে এ কেন্দ্রটি। কক্সবাজারের খুরুশকুলে দেশের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প চালুর পর উপকূলীয় অঞ্চল ও চরাঞ্চলে আরও একাধিক প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে উপযুুক্ত বাতাসের বেগসংক্রান্ত তথ্যের অভাব, জমির স্বল্পতা ও নীতিগত জটিলতার কারণে এ উদ্যোগ এখনো প্রাথমিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। ফেনীর সোনাগাজীতে ফেনী মুহুরী ড্যাম প্রজেক্ট শূন্য দশমিক ৯ মেগাওয়াটের বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পটি অফ-গ্রিড বা সীমিত মেয়াদের পরীক্ষামূলক কেন্দ্র, যা কার্যত উৎপাদনে নেই। এ ছাড়া কক্সবাজারের কুতুবদিয়া বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১ মেগাওয়াটের অফ-গ্রিড (এটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণাধীন অবস্থায় আছে)। সিরাজগঞ্জ বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ২ মেগাওয়াটের। এর অবকাঠামো নির্মাণ হলেও এটি আংশিক অকার্যকর।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত কমপক্ষে দুই বছরের তথ্য সংগ্রহ ছাড়া বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। দুই বছরের বায়ুবিদ্যুতের তথ্যের জন্য কোন সময়ে বাতাসের গতিবেগ কেমন এবং কোন উচ্চতায় বাতাসের গতি কেমন এগুলো সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে হয়। এরপর সফটওয়্যারে বসানোর পর এর পিনপয়েন্ট করা হয় কোন স্থানগুলোতে টারবাইন স্থাপন করা হলে বাতাসের ভালো গতি পাওয়া যাবে। এর সঙ্গে জমির বিষয়টিও জড়িত। যখন তথ্য ও জমি এ দুটি বিষয় মিলে যাবে তখনই বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে।

সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি অনুবিভাগের একজন সিনিয়র সহকারী সচিব বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে। সমুদ্রের অংশ ও দেশের স্থলভাগে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জরিপের কাজ করছে। বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে তথ্য না পেলে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন,  অফশোরে ড্যানিশ প্রতিষ্ঠান ‘কোপেনহেগেন অফশোর পার্টনার্স’ বায়ুবিদ্যুতের জরিপের কাজ করছে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির যে যন্ত্রপাতি প্রয়োজন হবে তা আমদানি করছে বলে কিছুদিন আগে জানিয়েছে। আর স্থলভাগে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জরিপ করছে। এর মধ্যে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, টেকনাফ ও মোংলার কিছু প্রতিষ্ঠান স্থলভাগে তথ্য সংগ্রহের জন্য অনুমতি নিয়েছে। এ জরিপের ডেটাগুলো হাতে আসা মাত্রই টেন্ডার করা হবে। আপাতত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনে আসবে এমন নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল রিনিউবল এনার্জি ল্যাবরেটরির একটি গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের দীর্ঘ ৭২৪ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকায় বায়ুর গড় গতিবেগ ৫.০ থেকে ৬.৫ মিটার/সেকেন্ড। দেশে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সন্দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন এবং মহেশখালী অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে সফল বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর (গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল) পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে বায়ুর গতিবেগ সর্বাধিক থাকে, যা বিদ্যুৎ চাহিদার পিক-সিজনের সঙ্গে চমৎকার সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে বায়ুর গড় গতিবেগ বছরজুড়ে এক রকম থাকে না। শীতকালে বাতাসের গতি কমে যাওয়ায় ধারাবাহিক বিদ্যুৎ পাওয়া চ্যালেঞ্জিং। আবার উইন্ড টারবাইন ও প্রকল্প এরিয়ার জন্য ব্যাপক সমতল জমির প্রয়োজন, যা ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশের জন্য বড় বাধা। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ের কারণে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টারবাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করা ব্যয়বহুল।

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিক্স অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের বাংলাদেশবিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কক্সবাজারে অফশোরে বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের ব্যাপারে ড্যানিশ একটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহী ছিল। এ ব্যাপারে ড্যানিশ কোম্পানিটির বিনিয়োগে আগ্রহ ছিল, পরে তা পিছিয়ে যায়। কোম্পানিটি ৫০০ মেগাওয়াটের একটি প্রকল্প নিয়ে আগ্রহ ছিল। সরকার এ আলোচনা নতুন করে শুরু করতে পারে। তিনি বলেন, অফশোরে বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে যেতে হবে। তুলনামূলক বাংলাদেশে বায়ুবিদ্যুতে বাতাসের গতিবেগ কম। এজন্য উপকূলীয় এলাকাগুলোতেই বায়ুবিদ্যুতের সম্ভাবনা বেশি।