কেউ এসেছেন বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করে, কেউ মায়ের ঘরে পালন করা হাঁস-মুরগি বিক্রি করে জোগাড় করেছেন পরীক্ষার খরচ। কেউ পাড়ি দিয়েছেন উত্তরবঙ্গ থেকে দীর্ঘ পথ, কেউ আগের দিনই ঢাকায় এসে উঠেছেন পরিচিতজনের বাসায়। সবার চোখে ছিল একটি স্বপ্ন—সরকারি চাকরি পেয়ে পরিবারের অভাব ঘোচানোর, অনিশ্চিত জীবনে একটু স্বস্তি ফেরানোর। কিন্তু সেই স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছে তাদের শুনতে হলো, পরীক্ষা স্থগিত। কারণ, নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ।
আজ শনিবার যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ১১তম গ্রেডের এই পদের পরীক্ষায় অংশ নিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় এসেছিলেন চাকরিপ্রার্থীরা। সকাল ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও তার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে। পরে পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেয় কর্তৃপক্ষ। এতে ক্ষোভে ফেটে পড়েন পরীক্ষার্থীরা। রাজধানীর বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে বিক্ষোভ, অবরোধ এবং প্রবেশপত্র পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানান তারা।
রংপুর থেকে আসা চাকরিপ্রার্থী মুসলেম উদ্দিন আগামীর সময়কে বলেন, ‘আমরা যারা পরীক্ষা দিতে এসেছি, তাদের বেশির ভাগই শিক্ষিত বেকার। সবার আর্থিক অবস্থা করুণ। আমি আমার মায়ের ঘরে পালন করা হাঁস-মুরগি বিক্রি করে পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম। এসে দেখি, পরীক্ষা শুরুর আগেই এমন অবস্থা। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।’
শাহবাগে আন্দোলনরত কুড়িগ্রাম থেকে আসা আরেক চাকরিপ্রার্থী আফনান উদ্দিন বলেন, ‘আমি এক দিন আগে ঢাকায় এসেছি। পকেটে কোনো টাকা ছিল না। এক বন্ধুর কাছ থেকে টাকা ধার করে এসেছিলাম। আমরা আসলে যাব কোথায়? চাকরি নেই, পরীক্ষা নেই। পরীক্ষা হলেও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী?’
এই দুই চাকরিপ্রার্থীর অভিজ্ঞতা কেবল ব্যক্তিগত দুর্ভোগের চিত্র নয়, বরং সরকারি চাকরির আশায় দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেওয়া বেকার তরুণদের অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের প্রতিফলন। নিয়োগ পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তাদের সেই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পরীক্ষার জন্য অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দিতে না পারার ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে।
শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে রাজধানীর শাপলা চত্বর, মতিঝিলের বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, কলোনি উচ্চবিদ্যালয়, বালক উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও নীলক্ষেতসহ বিভিন্ন এলাকায় চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। তারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের শাস্তি এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানান। বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ প্রবেশপত্র পুড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের স্লোগানে উঠে আসে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিচার ও বৈষম্যহীন নিয়োগের দাবি।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক চাকরিপ্রার্থী বলেন, ‘আমরা রংপুর থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছিলাম। আমাদের কেন্দ্র ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের পাশে। সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা ভ্রমণ করতে হয়েছে। কিন্তু কেন্দ্রে এসে জানতে পারি, অনিবার্য কারণে পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। হঠাৎ করে কেন পরীক্ষা স্থগিত করা হলো, আমরা এর জবাব চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ চাইলে আগের দিনই জানাতে পারত যে পরীক্ষা হবে না। কিন্তু তা না করে সকালে কেন্দ্রে আসার পর জানানো হয়েছে। দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ করে বেকার মানুষ কষ্ট করে এখানে এসেছে। কারও হয়তো সেই টাকাটুকুও ছিল না। এই ক্ষতির দায় কে নেবে?’
আরেক চাকরিপ্রার্থী নাইমা আফরোজ বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে পরীক্ষা দিতে এসেছি। এসে শুনি, প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। প্রশ্ন কয় সেট ছিল, তা আমরা জানি না। এক সেট ফাঁস হলে অন্য সেটে পরীক্ষা নেওয়া যেত। আমরা চাই, আজকালের মধ্যেই পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হোক।’
নতুন তারিখ ১৬ অক্টোবর
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা শনিবার বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছিল কর্তৃপক্ষ। তবে পরীক্ষা শুরুর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসায় পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, স্থগিত হওয়া পরীক্ষা আগামী ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হবে। পরীক্ষাসংক্রান্ত আনুষঙ্গিক তথ্য পরীক্ষার্থীদের মুঠোফোনে খুদে বার্তার (এসএমএস) মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হবে।
এদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তদন্তে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তবে পরীক্ষা স্থগিত ও নতুন তারিখ ঘোষণার পরও চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষোভ কমেনি। তাঁদের প্রশ্ন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ কীভাবে তৈরি হলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসা প্রার্থীদের আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও সামনে এসেছে।
প্রতিমন্ত্রী-ডিজিকে সরানোর দাবি ডাকসু ভিপির
প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে পরীক্ষা স্থগিতের ঘটনায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তসহ চার দফা দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম।
গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে সাদিক কায়েম বলেন, ‘ভেরিফিকেশনের পর এবার প্রশ্নফাঁসের তামাশা শুরু করল বিএনপি সরকার, ঠিক যেন আওয়ামী যুগে ফিরে যাচ্ছি আমরা।’ তার অভিযোগ, সরকারি চাকরির নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে না পারা এবং প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেট নির্মূল করতে না পারা সরকারের ব্যর্থতা।
তিনি আরও বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় নিয়োগ পরীক্ষা স্থগিতের পর বিভিন্ন কেন্দ্রের সামনে চাকরিপ্রার্থীদের বিক্ষোভে তিনি সংহতি জানাচ্ছেন। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবিলম্বে শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি চাকরির সব নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রশ্নফাঁসের সিন্ডিকেট চিরতরে নির্মূল করারও দাবি জানান তিনি।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। চাকরিরত কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকলে তাকে চাকরিচ্যুত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগকে অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তিনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে নতুন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।