আর্ন্তজাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সাবেক বিচারক নাভি পিল্লাই চলতি বছরের শান্তিতে নোবেল ঘোষণার কয়েকঘণ্টার পরপরই আইসিসির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মজার ছলে ট্রাম্পকে ‘আর কয়েকটা বেশি হাততালি দিলে তার সঙ্গে নোবেল ভাগাভাগি করবেন’— পিল্লাইয়ের এমন মন্তব্যের পরপরই আন্তর্জাতিক এই প্রতিষ্ঠানটির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করল ট্রাম্প প্রশাসন। খবর রয়টার্সের
সদ্য আরোপিত এই নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানিয়েছেন আইসিসির উপপ্রধান কৌঁসুলি নাজহাত শামীম খান। তিনি বলেছেন, এ পদক্ষেপে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ হবে না।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে খান বলেন, ‘এই নিষেধাজ্ঞার নিন্দা জানানো উচিত। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আইনের শাসন এবং একটি স্বাধীন বিচারিক প্রতিষ্ঠান যে কাজ করছে, তা দুর্বল করে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। আমাদের সব পরিস্থিতি, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় কাজ অব্যাহত থাকবে।’
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত আইসিসি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার বিচার করে। আদালতটির প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধিতা দীর্ঘদিনের। এর আগে আদালতের কৌঁসুলি ও বিচারকদের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল ওয়াশিংটন। তবে শুক্রবারের পদক্ষেপ আরও বিস্তৃত। এর ফলে আদালতকে সেবা দেওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কখনোই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে মার্কিন নাগরিকদের বিচার করতে দেবেন না। এ কারণেই আজ যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছে। আমরা এই অবাধ্য আদালতের সঙ্গে লেনদেন নিষিদ্ধ করব, এর সম্পদপ্রাপ্তি বন্ধ করব এবং কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা পঙ্গু করে দেব।’
ইসরায়েলের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কারণে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসির সমালোচনা করে আসছে। আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে আদালতের আগের একটি তদন্তও ওয়াশিংটনের বিরোধিতার কারণ ছিল। তবে ওই তদন্ত ইতিমধ্যে বন্ধ করেছে আইসিসি।
আদালতটির সদস্যদেশের সংখ্যা ১২৫। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্ক ছাড়া ন্যাটোর সব সদস্যই এর অন্তর্ভুক্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্রসহ সদস্যদেশগুলোর কাছ থেকেও আদালতটি অতীতে জোরালো সমর্থন পেয়েছে। আইসিসির সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সদস্য।
শুক্রবার নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া দক্ষিণ আফ্রিকার আইনজ্ঞ নাভি পিল্লাই ২০০৩ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আইসিসির আপিল চেম্বারের বিচারক ছিলেন। পুরস্কার ঘোষণায় নোবেল কমিটি বলেছে, বিচারক ও আন্তর্জাতিক আইনবিষয়ক প্রতিষ্ঠানগুলো যখন রাজনৈতিক আক্রমণের মুখে, তখন পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার মধ্য দিয়ে একটি স্মরণবার্তা দিতে চেয়েছে তারা।
নোবেল কমিটি আরও বলেছে, ‘যে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থায় যুদ্ধাপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয় এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা ন্যায়বিচার পান, তা শান্তিপূর্ণ বিশ্বের পূর্বশর্ত।’
রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে আইসিসি ও এর সদস্যদেশগুলোকে সুযোগ দিতেই নিষেধাজ্ঞার কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে। নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় চারটি সাধারণ লাইসেন্স জারি করে। এর আওতায় আইসিসির টেলিযোগাযোগ, সফটওয়্যার ও পেনশন পরিশোধের কিছু লেনদেন এবং আদালতের হেফাজতে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
মিত্রদের আদালতকে নিয়ন্ত্রণে আনার আহ্বান যুক্তরাষ্ট্রের
সাধারণত মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত সংস্থার সঙ্গে কাজ করতে পারে না। এতে ব্যাংক হিসাব বন্ধ করতে পারে, বিমা প্রতিষ্ঠান বিমা-সুরক্ষা প্রত্যাহার করতে পারে এবং সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো সহযোগিতা বন্ধ করে দিতে পারে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে আইসিসির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন নতুন নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে।
আদালতের কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে প্রতিষ্ঠানটির ওপর সরাসরি নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কায় প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ কারণে তারা মাইক্রোসফটের সফটওয়্যারের বদলে ওপেন-সোর্স বিকল্প ব্যবহারের জন্য অফিসের কম্পিউটার স্থানান্তর এবং ব্যাংকিং ও স্বাস্থ্যবিমার বিকল্প ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেন।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে আইসিসির রেজিস্ট্রার ওসভালদো জাভালা গিলার ইউরোপীয় ইউনিয়নকে একটি ‘ব্লকিং মেকানিজম’ ব্যবহারের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার বহির্দেশীয় প্রভাব ঠেকাতে পারে।
রুবিওর ভাষ্য অনুযায়ী, আইসিসি ও আদালত প্রতিষ্ঠার রোম সংবিধিতে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সমাধান করবে—এমন প্রত্যাশায় ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা আরোপে দেরি করেছিল। কিন্তু তারা তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।
রুবিও বলেন, ‘হয় আইসিসি তাদের হুমকি দেওয়া বন্ধ করবে, নয়তো আমরা আইসিসির অবসান ঘটাব। আমরা আশা করি, আমাদের মিত্ররা—যাদের অনেকেই আইসিসির সদস্য এবং প্রতিরক্ষার জন্য মার্কিন সেনাদের ওপর নির্ভরশীল—আদালতটিকে নিয়ন্ত্রণে আনবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সদস্যদেশগুলোকে আলোচনা ও আমাদের উদ্বেগের সমাধান উপস্থাপনের সুযোগ দিতে আমরা এই পদক্ষেপের কাঠামো তৈরি করেছি। এসব উদ্যোগ সফল না হলে আমরা পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’