Image description

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আট মাস পেরিয়ে গেলেও স্থানীয় সরকারে ফিরছেন না নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখনও ‘অনির্বাচিত প্রশাসকদের’ মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অবস্থানেও এখনও স্পষ্টতা আসেনি। ফলে নির্বাচিত সরকারের আমলে অনির্বাচিত স্থানীয় প্রশাসন আর কতদিন চলবে, সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

স্থানীয় সরকারের তৃণমূল পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদে এখনও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা রয়েছেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতেই মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। আবার ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অনেক চেয়ারম্যান-মেম্বার নিজ নিজ এলাকায় নেই। সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে নাগরিক সেবায়, ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠলেও বিএনপি তখন এর বিরোধিতা করেছিল। দলটির নেতারা বলেছিলেন, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে। দলটির নির্বাচনি ইশতেহারেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু সরকার গঠনের আট মাস পরও সেই নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

সরকার ও ইসির ভিন্ন অবস্থান কেন?

গত ১৪ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সাত ধাপের একটি প্রাথমিক রোডম্যাপ প্রকাশ করে। এতে ১২ নভেম্বর, ১৩ ডিসেম্বর, ৩০ ডিসেম্বর, আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে নির্বাচনের সম্ভাব্য তারিখ উল্লেখ করা হয়। তবে ইসি তখনই জানিয়েছিল, এটি চূড়ান্ত তফসিল নয়।

পরদিন, ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, এসব তারিখের বিষয়ে সরকার বা মন্ত্রণালয় কিছু জানে না। তার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণত সরকারের সঙ্গে আলোচনা, প্রস্তুতিমূলক সভা, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত সমন্বয়, বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়।

একই সময়ে ইসি সচিবও স্পষ্ট করেন, ঘোষিত সময়সূচি ছিল সম্পূর্ণ প্রাথমিক এবং ১৭ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে তা চূড়ান্ত করা হবে। ১৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকের পরও অবশ্য ১২ নভেম্বরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। এরপর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জুনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথাও বলা হয়েছে। তবে সরকার ও কমিশন এখনও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট চূড়ান্ত অবস্থান জানায়নি।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে পরীক্ষা, রমজান, প্রস্তুতি, বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় সমন্বয় করতে হবে। নভেম্বর-ডিসেম্বরে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা, ফেব্রুয়ারিতে রমজান, তারপর এসএসসি এবং জুনে এইচএসসি পরীক্ষা; এই সময়সীমা নির্বাচন আয়োজনকে জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট সবাই একমত হয়েছেন যে, আগামী ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগেই ইউপি নির্বাচন শেষ করার লক্ষ্য থাকা উচিত।

অবশ্য ইসির দাবি, আগের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে তারা এখনও সরে আসেনি। আবার সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান না জানানোর কারণে মূলত এ নিয়েই বিতর্ক শুরু হয়েছে।

দীর্ঘদিন অনির্বাচিত প্রতিনিধি থাকলে কী হয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত। একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বলেন, জনগণের ভোগান্তি কমাতে স্থানীয় সরকারকে সক্রিয় করতে হবে। ভালো সরকার ব্যবস্থার জন্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি প্রয়োজন। কিন্তু সরকার এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগ দেখায়নি।

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সংবিধানের ১১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে শুধু মন্ত্রী-এমপিরাই নির্বাচিত প্রতিনিধি। আর স্থানীয় সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠান চলছে অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে, যা ৫৯ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। কারণ এতে নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসন পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অথচ সরকার নাকের কাজ মুখে করছে। মন্ত্রী-এমপিদের মাধ্যমে করছে উন্নয়ন কাজ।’

তিনি আরও বলেন, বিএনপির ৩১ দফাতেও স্থানীয় সরকারের সব কাঠামো নির্বাচিত প্রতিনিধি দিয়ে পরিচালনার কথা বলা হয়েছিল। দলটি এও বলেছিল, শুধু আদালতে কোনও জনপ্রতিনিধি সাজাপ্রাপ্ত হলে, কেবল সেখানেই প্রশাসক বসানো হবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী দীর্ঘদিন অনির্বাচিত প্রতিনিধি দিয়ে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হলে গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশের (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, তৃণমূলে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকা জরুরি। কিন্তু গত ৮ মাসেও এ নিয়ে সরকারের আন্তরিকতা দেখা যাচ্ছে না। বরং সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন জায়গায় দলীয় প্রশাসক বসিয়ে সব জায়গায় নিজেদের কর্তৃত্ব জাহির করতে চায়, যা গণতন্ত্রের জন্য ভালো দিক নয়।

তিনি মনে করেন, সরকার বা নির্বাচন কমিশন যে ধরনের অবস্থান নিয়েছে, সেটিও সন্দেহজনক। কারণ এর মাধ্যমে তারা প্রশাসক দিয়েই আরও অনেক দিন কাজ চালিয়ে নেওয়ারও চেষ্টা করতে পারে।

৫ আগস্টের পর যেভাবে স্থানীয় সরকার চলছে

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অনেকে আত্মগোপনে চলে যান। পরে এসব প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

তবে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা বহাল থাকেন। যদিও তাদেরও অনেকের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। অনেক চেয়ারম্যান ও সদস্য আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজ নিজ এলাকায় নেই। 

ফলে সব মিলিয়ে স্থানীয় সরকারের একাধিক স্তরে বড় একটি অংশই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বদলে প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে। একই সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রেও মেয়াদ শেষ হওয়া ও জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল, তারা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেবে। কিন্তু ক্ষমতায় এসে সব জায়গায় দলীয় প্রশাসক বসিয়ে এখন নির্বাচন দিতে গড়িমসি করছে। কারণ তারা ঠিকই নিজেদের সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। এ নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে।’

তার মতে, নির্বাচন বিলম্বিত করার কোনও গণতান্ত্রিক সুফল নেই; বরং এতে ক্ষমতাসীন দলের ‘অবৈধ ক্ষমতা’ আরও শক্তিশালী হয়।

কোন কৌশলে এগোতে চায় বিএনপি?

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক যুগ্ম মহাসচিব বলেন, ‘তারা অবশ্যই স্থানীয় সরকার নির্বাচন চান। সে অনুযায়ীই চলছে সব প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণভাবে তারা সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করছেন। এ ধরনের প্রার্থীদের প্রোফাইল প্রধানমন্ত্রী যাচাই করছেন। যোগ্য প্রার্থীদের অঘোষিতভাবে সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছে। তারপরও বিএনপি নির্বাচন চায় না বলে অপ্রপ্রচার চলছে।’

তিনি বলেন, এক্ষেত্রে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে দলীয় কাউন্সিলের পর। এর আগে তৃণমূলে সব কমিটি সম্পন্ন করারও পরিকল্পনাও আছে। তাছাড়া উন্নয়নকাজকে আরও বেগবান করে স্থানীয় নির্বাচনে পা বাড়াতে চায় দলটি।

অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘সরকার সঠিক সময়েই স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেবে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনও অবকাশ নেই। সে অনুযায়ী ইসিও কাজ করছে। কারণ বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক দল। তাই গণতান্ত্রিক ধারা নস্যাৎ হয়, এমন কাজ করবে না সরকারি দল। দলগতভাবে বিএনপিরও যেকোনও কৌশল থাকতেই পারে। এক্ষেত্রে আমরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এগোতে চাই।’