‘প্রথম আলো’র সম্পাদক মতিউর রহমানের সাম্প্রতিক একটি বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এক ফেসবুক পোস্টে প্রথম আলোর সম্পাদকের বক্তব্যকে ‘অর্ধসত্য, ভুল তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করেছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে শফিকুল আলম এই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
শফিকুল আলমের সম্পূর্ণ পোস্টের হুবহু অনুবাদ উপস্থাপন করা হলো–
১. সম্প্রতি প্রথম আলোর সম্পাদক দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল এবং অন্যান্য গণমাধ্যমগুলো ‘স্বাধীনভাবে কাজ করতে বেশ জটিলতার সম্মুখীন হয়েছে।’ তিনি দাবি করেন যে ‘বিভিন্ন ধরনের চাপ ও ভয়ের কারণে ব্যবস্থাপনা পরিবর্তিত হয়েছে, সম্পাদকদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেক সাংবাদিক চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।’ তিনি আরও যোগ করেন, সাংবাদিকরা ‘অনিশ্চয়তা ও আত্ম-সংযমের (সেলফ-সেন্সরশিপ) পরিবেশে’ কাজ করেছেন।
২. তিনি আরও বলেন, প্রথম আলোকে ‘ভয়ের পরিবেশে’ কাজ করতে হয়েছে এবং পুরো সময়জুড়ে চরমপন্থি গোষ্ঠী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চাপ ও হুমকির কথা উল্লেখ করেন। তিনি ১৮ ডিসেম্বরের প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা রোধ করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনীকে ‘সরাসরি, কার্যকর নির্দেশনা’ দিতে ব্যর্থ হওয়ার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বশীলদের দায়ী করেন।
৩. এই বক্তৃতায় গুরুতর অর্ধসত্য, ভুল তথ্য এবং বিভ্রান্তিকর মন্তব্য ছিল। ভয়ের পরিবেশ নিয়ে মতিউর রহমান স্পষ্টভাবে সত্যকে এড়িয়ে গেছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কখনোই সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করেনি, কোনো সংবাদপত্র বন্ধ বা কোনো সংবাদ সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেয়নি। (কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে মিথ্যা বা ভুল তথ্যসংবলিত খবর সংশোধনের জন্য অনুরোধ করেছি)। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে, যাদের ওপর হাসিনা সরকারের আমলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার অভিযোগ ছিল, যার মধ্যে শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি গণমাধ্যমগুলোতে জোরপূর্বক আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকদের বসানো অন্তর্ভুক্ত ছিল— স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় বাধা না দেওয়া হয়।
৪. সংবাদপত্র, টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল আউটলেটগুলো যে কোনো বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন প্রকাশ ও সরকারের সমালোচনা করার জন্য পুরোপুরি স্বাধীন ছিল। আমরা দেখেছি যে কীভাবে ‘জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা’ এবং টক শো অতিথিরা কোনো বাধা ছাড়াই মিথ্যা ছড়িয়েছেন এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করেছেন। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এবং তার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে মিথ্যা ছড়ানোর যেন একটি উন্মুক্ত সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবুও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কখনোই এই বিষয়গুলোকে আদালতে নিয়ে যায়নি কিংবা টেলিভিশন চ্যানেল বা সংবাদপত্রগুলোকে ফোন করে এই মিথ্যা ও অসত্য প্রচারকারীদের জায়গা দেওয়া বন্ধ করার নির্দেশ দেয়নি।
৫. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, জুলাই বিপ্লবের অংশগ্রহণকারীদের প্রকাশ্যে ‘চরমপন্থি’ এবং ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ করার জন্য জুলাইয়ের বিপ্লবীদের কাছ থেকে অধ্যাপক ইউনূস ও তার টিমের (দল) ওপর ব্যাপক চাপ ছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি কোনো সংবাদমাধ্যম বন্ধ করেছিল? না। বরং এটি হাসিনা সরকারের আমলে বন্ধ করে দেওয়া বেশ কয়েকটি সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলকে তাদের কাজ পুনরায় শুরু করার সুযোগ করে দিয়েছিল।
হাসিনার ১৬ বছরের শাসনের বড় একটি সময় জুড়ে এই প্রিন্ট, ব্রডকাস্ট এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমগুলোর অনেকেই হাসিনার তোষামোদ করেছে। তারা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর বিরুদ্ধে মিথ্যা ছড়িয়েছে, যা বিরোধী দলের ওপর নির্মম দমন-পীড়নের পথ তৈরি করতে সাহায্য করেছিল। বিরোধী দলের কর্মীদের চরমপন্থি হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশের তাজা গুলির চরম ব্যবহারকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল। এমনকি হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের শেষ দিনগুলোতেও এই শীর্ষ সাংবাদিকদের অনেকেই জুলাইয়ের বিপ্লবীদের কঠোরভাবে দমন করার জন্য তাকে উস্কানি দিয়েছিল।
৬. এখন যখন এই সাংবাদিক এবং সংবাদমাধ্যমের মালিকরা নিজেদেরকে ইতিহাসের ভুল পক্ষে আবিষ্কার করেছেন, তখন মালিকপক্ষ তাদের ব্যবসায়ী স্বার্থ রক্ষা করতে এবং নতুন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের অনুগ্রহ পাওয়ার জন্য স্বেচ্ছায় তাদের শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন করেছে, বিতর্কিত আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়েছে এবং জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর উপস্থাপনা বদলে ফেলেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি সংবাদমাধ্যমের মালিকদের এই পরিবর্তনের আদেশ দিয়েছিল? না, দেয়নি। নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার মন জয় করতে এবং নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষায় মালিকরা নিজ উদ্যোগে এটি করেছিলেন।
৭. হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশের অন্যতম শীর্ষ এক ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মিডিয়া সাম্রাজ্য পুরোপুরি পরিচালনা করত আওয়ামী লীগপন্থি সাংবাদিকরা। ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর, নতুন রাজনৈতিক কর্তাদের সন্তুষ্ট করতে তারা তাদের শীর্ষ ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আনে। একই ধরনের পরিবর্তন আরও কয়েকটি টেলিভিশন স্টেশন এবং সংবাদপত্রেও ঘটেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি এটি পরিচালনা করেছিল? একদমই না। মালিকরা স্বাধীনভাবেই এটি করেছিলেন, যা সম্পাদক মতিউর রহমান খুব ভালো করেই জানেন, যদিও তিনি এ বিষয়ে না লেখার সিদ্ধান্ত বেছে নিয়েছেন।
এমনকি প্রথম আলোর ভেতরেও যে কণ্ঠগুলোকে আওয়ামী লীগপন্থি মনে করা হতো, মতামতের পাতা থেকে তাদের সরিয়ে রাখা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কি প্রথম আলোকে এমনটি করতে বলেছিল? মোটেও না। সময় টিভিতে মালিকরা নতুন ব্যবস্থাপনা নিয়ে এসেছিলেন ঠিক এই কারণে, হাসিনার আমলে এই স্টেশনটি ভিন্নমতাবলম্বী কণ্ঠের বিরুদ্ধে অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিল। স্টেশনটির মূল প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপ চরম দেনাগ্রস্ত ছিল, হাসিনার আমলে সময় টিভি আওয়ামী লীগকে সার্ভিস দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে সহজেই নতুন ঋণ পেয়েছিল। এখন, পরিবর্তিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে তারা সংকটে পড়েছে।
৮. হাসিনার ১৬ বছরের শাসনকাল জুড়ে এই গণমাধ্যমগুলোর আগ্রাসী, দলবিরোধী ও জনবিরোধী সাংবাদিকতার সঙ্গে ভয়ের এই পরিবেশ সরাসরিভাবে জড়িত। অন্যান্য বিরোধী দলগুলোর পাশাপাশি বিএনপি, এর নেতা তারেক রহমান ও প্রয়াত খালেদা জিয়া এর প্রধান ভুক্তভোগীদের মধ্যে ছিলেন।
এই সংবাদমাধ্যমগুলো হাসিনাকে এতটা তোষামোদ করেছিল যে তারা বিশ্বাসই করতে পারেনি যে বিরোধীরা কখনো ক্ষমতায় ফিরবে। জুলাইয়ে পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার পর, এই মিডিয়া মালিক এবং বিতর্কিত সাংবাদিকরা ভীত হয়ে পড়েন। ফলে, জুলাই গণহত্যায় হাসিনার শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের পরিবার এবং বিরোধী দলের কর্মীরা এদের অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই মামলাগুলো শুরু করেনি।
প্রতিকূল সাংবাদিকতার অভিযোগে অভিযুক্ত সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের অতীত আচরণের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার আদেশ দিতে পারত। তারা তাদের জনবিরোধী সাংবাদিকতার জন্য, সময় নিউজ যেভাবে করেছিল, চুপচাপ অনুশোচনা প্রকাশ করতে পারত। তা না করে, তারা কেবল নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তোষামোদ করতে এবং তাদের ব্যবসায়ী সাম্রাজ্য রক্ষা করতে নিউজরুমে ঢালাও পরিবর্তন আনা বেছে নিয়েছিল।
৯. প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারে হামলা ছিল সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে একটি ঘৃণ্য অপরাধ। পুলিশের এই হামলা ঠেকানো উচিত ছিল। ১৮ ডিসেম্বরের অগ্নিসংযোগের কয়েক মাস আগে প্রথম আলোতে অনুরূপ এক আক্রমণের চেষ্টা পুলিশ সফলভাবে প্রতিরোধ করেছিল। ১৮ ডিসেম্বরের হামলার পর পুলিশ প্রেস ব্রিফিং করে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে।
হামলার পর থেকে এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে কিছুসংখ্যক মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় সরাসরি ও কার্যকর নির্দেশ দিতে ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা’ ব্যর্থ হয়েছেন– মতিউর রহমানের এই দাবির ভিত্তি কী, তা স্পষ্ট নয়। পুলিশকে উভয় সংবাদপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং সেনাবাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছিল, যেখানে সেনা কর্মকর্তারা প্রকৃতপক্ষে আটকেপড়া ডেইলি স্টারের সাংবাদিকদের নিরাপদে উদ্ধার করতে হস্তক্ষেপ করেছিলেন।