দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে ৯৯টি অক্সিজেন প্লান্টের মধ্যে ৬১টি অকার্যকর। বর্তমানে ৩৮টি চালু।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে (আইইউবি) শুরু হওয়া দুই দিনের ‘বাংলাদেশ অক্সিজেন সামিট ২০২৬’-এর প্রথম দিন উপস্থাপিত একাধিক পর্যালোচনায় সরকারি হাসপাতালের অক্সিজেন ব্যবস্থার এ চিত্র উঠে এসেছে। আয়োজনে রয়েছে বাংলাদেশ অক্সিজেন নেটওয়ার্ক, আইইউবি ও ইমপ্লিমেন্টেশন অ্যান্ড পপুলেশন সায়েন্স।
সম্মেলনে ‘ফ্রম অক্সিজেন প্লান্টস টু রিলায়েবল অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর প্রজেক্ট সার্ভিসেস (ইউএনওপিএস) বাংলাদেশের সিনিয়র অ্যানালিস্ট মারুফ হাসান। তাঁর উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪টি জেলা হাসপাতাল, ২৮টি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও সাতটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ৯৯টি প্রেসার সুইং অ্যাডজর্পশন (পিএসএ) ও ভ্যাকুয়াম সুইং অ্যাডজর্পশন (ভিএসএ) অক্সিজেন প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার নিজস্ব রাজস্ব খাত থেকে ৪০টি এবং বাংলাদেশ সরকার ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ৩০টি—মোট ৭০টি প্লান্ট কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে সরকারি হাসপাতালে স্থাপন করে। মূল্যায়নে দেখা যায়, সিএমএসডির মাধ্যমে স্থাপিত ৭০টি প্লান্টের মাত্র ৯টি বর্তমানে চালু।
কেন এত প্লান্ট : করোনা মহামারির সময় দেশের হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেনের সংকট দেখা দিলে কভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস (ইআরপিপি) প্রকল্পের আওতায় এসব অক্সিজেন জেনারেটর প্লান্ট স্থাপন করে সরকার। হাসপাতালে এসব অক্সিজেন প্লান্টে সরাসরি অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। এ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার বা তরল অক্সিজেন সরবরাহের প্রয়োজন হয় না।
প্লান্ট চালানোর লোক নেই : সরকারি প্লান্টগুলো সেবার বাইরে থাকার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দক্ষ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতি। সিএমএসডির অধীনে থাকা সাতটি প্লান্ট এখনো হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি। স্থায়ী বাজেট ও কারিগরি টেকনিশিয়ান না থাকায় কোথাও কোথাও হাসপাতালের সাধারণ কর্মীদের দিয়েই প্লান্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। সীমিত কারিগরি জ্ঞান নিয়ে তাঁদের পক্ষে দিনে কয়েক ঘণ্টার বেশি প্লান্ট চালানো সম্ভব হচ্ছে না। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে প্লান্টে উৎপাদিত অক্সিজেনের বিশুদ্ধতাও চিকিৎসায় ব্যবহারের উপযোগী মাত্রার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অক্সিজেন অবকাঠামোর সংকট এখানেই শেষ নয়। গ্লোবাল ফান্ডের অর্থায়নে স্থাপিত ২৯টি প্লান্টের কারিগরি জনবলের বেতন সহায়তার মেয়াদ গত ৩০ সেপ্টেম্বরে শেষ হয়েছে। এসব প্লান্টের রক্ষণাবেক্ষণ সহায়তার মেয়াদ রয়েছে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর সরকার নিজস্ব বাজেটে কারিগরি জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব না নিলে বর্তমানে সচল ২৯টি প্লান্টও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইউএনওপিএসের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা না থাকলে জাতীয় পর্যায়ের অক্সিজেন প্লান্টগুলোর ৬০ শতাংশের বেশি অচল থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
অক্সিজেন চাহিদা ৭৫ লাখ মানুষের : ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন মেডিক্যাল অক্সিজেন সিকিউরিটির কো-চেয়ার ও আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. আহমেদ এহসানুর রহমান সম্মেলনের আরেক অধিবেশনে বাংলাদেশের বার্ষিক অক্সিজেনের চাহিদা নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা যায়। গুরুতর নিউমোনিয়ায় এই ঝুঁকি আরো বেশি। শরীরে অক্সিজেন কম থাকলে মৃত্যুর আশঙ্কাও প্রায় পাঁচ গুণ বেড়ে যায়। শুধু নিউমোনিয়া নয়, অপুষ্টি, সেপসিস, জরুরি চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারেও অক্সিজেন প্রয়োজন। তাই প্রয়োজনের সময় সবার জন্য সহজে ও দ্রুত মেডিক্যাল অক্সিজেন নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৯ লাখ মানুষের জরুরি অক্সিজেন চিকিৎসার প্রয়োজন। এর বাইরে অস্ত্রোপচারের জন্য বছরে প্রায় ৫৪ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগে আক্রান্ত আরো প্রায় দুই লাখ মানুষের মেডিক্যাল অক্সিজেন প্রয়োজন হয়। তীব্র নিউমোনিয়া, হৃদরোগ, সড়ক দুর্ঘটনা বা আঘাত, সেপসিস, অপরিণত জন্ম, ডায়রিয়া, হাম-হুপিং কাশি ও ডেঙ্গুর মতো রোগের চিকিৎসায় অক্সিজেনের চাহিদা বেশি। এ ছাড়া হাঁপানি, যক্ষ্মা, এনকেফালাইটিস, টাইফয়েড, মেনিনজাইটিস ও ম্যালেরিয়ায়ও অক্সিজেনের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রয়োজনের সময় প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ মেডিক্যাল অক্সিজেন পায় না।
বিশ্বে বছরে প্রায় ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ মানুষের চিকিৎসায় অক্সিজেন প্রয়োজন। জিবিডি ২০২১-এর হিসাবের তুলনায় নতুন হিসাবে এই সংখ্যা এক কোটি ৪২ লাখ বেশি। এর মধ্যে তীব্র রোগে ১১ কোটি ৩১ লাখ, অস্ত্রোপচারে ২৬ কোটি ৫৩ লাখ এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগে ৯৩ লাখ মানুষের অক্সিজেন প্রয়োজন। দেশে প্রতিবছর মোট প্রায় দুই কোটি ৩৮ লাখ ঘনমিটার অক্সিজেনের প্রয়োজন হলেও উৎপাদন হয় প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে।
বড় হাসপাতালেও সক্ষমতার ঘাটতি : অক্সিজেনের চাহিদা অনুযায়ী সব হাসপাতালের প্লান্টের সক্ষমতাও যথেষ্ট নয়। মূল্যায়নে দেখা গেছে, বর্তমানে চালু ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩১টির অক্সিজেনের চাহিদা প্রতি মিনিটে ৫০০ লিটার (এলপিএম) বা তার কম। এসব প্রতিষ্ঠানে ৫০০ এলপিএম সক্ষমতার একটি মানসম্মত প্লান্ট দিয়েই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে সাতটি বড় প্রতিষ্ঠানের চাহিদা ৫০০ এলপিএমের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে একাধিক প্লান্ট বা বড় সক্ষমতার প্লান্টের পাশাপাশি তরল অক্সিজেনের বড় ব্যাকআপ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বেশি অক্সিজেন ব্যবহার করছে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল—তিন হাজার ১৬৫ এলপিএম। এরপর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এক হাজার ৭৫০, মেহেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল এক হাজার ৫৯২, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এক হাজার ৫৫৩, বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এক হাজার ১০০, শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দিনাজপুর ৭৬৩ এবং কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ৭০০ এলপিএম অক্সিজেন ব্যবহার করছে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ জেলা ও ২৫০ শয্যার হাসপাতালের চাহিদা ৫০০ এলপিএমের একটি প্লান্টেই পূরণ করা সম্ভব, কিন্তু বড় হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে একই সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। এসব প্রতিষ্ঠানে একাধিক প্লান্ট বা বড় সক্ষমতার প্লান্টের পাশাপাশি তরল অক্সিজেনের ব্যাকআপ রাখার প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু প্লান্টের সংখ্যা নয়; হাসপাতালের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সক্ষমতা নির্ধারণ, প্লান্ট চালানোর জনবল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।
অক্সিজেন উৎপাদনেও নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি : সম্মেলনে দেশের বেসরকারি অক্সিজেন উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগের বিষয়টি উঠে আসে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪৯টি অক্সিজেন প্লান্ট উৎপাদনে থাকলেও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়েছে। মান বজায় রাখতে না পারায় একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ঔষধ ও কসমেটিকস আইন এবং ১৯৮২ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী অক্সিজেন একটি ওষুধ। তবে বেশির ভাগ উৎপাদক এখনো নিয়ন্ত্রনব্যবস্থার আওতার বাইরে রয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থায় গুণগত মান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ, মনিটরিং ও মূল্যায়নের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ও জরুরি। তিনি বলেন, অক্সিজেন প্রকল্পের শুরু থেকেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে যুক্ত করতে হবে। ধারণাগত নকশা থেকে বিস্তারিত কাঠামোগত নকশা পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন। বায়োমেডিক্যাল, সিভিল ও ফার্মাসিউটিক্যাল বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কারিগরি উপকমিটিও করা যেতে পারে। অক্সিজেনের মান পরীক্ষায় কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, আর্দ্রতাসহ বিভিন্ন অমিশ্রণ নির্ধারিত মাত্রায় আছে কি না, তা পরীক্ষা করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন। এসব উপাদান নির্ধারিত মাত্রার বেশি হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সম্মেলনে অক্সিজেন ব্যবস্থাকে টেকসই করতে ইউএনওপিএস ছয়টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছে। এগুলো হলো—অচল প্লান্ট মেরামত করে কেন্দ্রীয় অক্সিজেন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা, দক্ষ অপারেটর নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সার্ভিসিং, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, হাসপাতালের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী প্লান্টের সক্ষমতা নির্ধারণ, প্লান্টের কার্যকারিতা, অক্সিজেনের মান, ব্যবহার ও ব্যয় পর্যবেক্ষণে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা বা ড্যাশবোর্ড চালু করা।
অধিবেশনে স্বাগত বক্তব্য দেন চিপসের পরিচালক ড. এস এম মোয়াজ্জেম হোসাইন। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ও জাতীয় ফার্মাকোভিজিলেন্স সেন্টারের প্রধান ড. আকতার হোসেন নিরাপদ মেডিক্যাল অক্সিজেন এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির নিবন্ধন ও তদারকিতে ঔষধ প্রশাসনের ভূমিকা তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষণা কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. মো. আলী সাইফুল্লাহ সজীব অন-সাইট মেডিক্যাল অক্সিজেন উৎপাদন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন।
বেসরকারি অক্সিজেন উৎপাদক প্রতিষ্ঠান লিনডে বাংলাদেশ, স্পেকট্রা অক্সিজেন ও আবুল খায়ের গ্রুপের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সক্ষমতা, সরবরাহ ও নিরাপত্তার বিষয় তুলে ধরেন। ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. টেন চো ও ডা. হোসাইন আহমেদ মা, নবজাতক ও শিশুর জরুরি চিকিৎসায় মেডিক্যাল অক্সিজেনের প্রাপ্যতা, নির্ভরযোগ্যতা ও মান নিয়ে আলোচনা করেন। ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের (নিমো অ্যান্ড টিসি) প্রকৌশলী অপু সিকদার মেডিক্যাল অক্সিজেনের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বক্তব্য দেন।