প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের (এক লাখ কোটি ডলার) অর্থনীতির সাইজে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। যা বর্তমান অর্থনীতির দ্বিগুণ পরিসর। এ লক্ষ্য অর্জনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই)সহ দেশি ও বিদেশি ব্যাপক বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং জনগণের কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ড প্রসার। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’— এই স্পিরিট ধারণ করে কোনো দেশ অথবা ব্লক বিশেষের সংকীর্ণ গণ্ডিতে ঘুরপাক নয়। বরং বিশ্বায়নের যুগে যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, সম্পর্ক উন্নয়ন এবং বন্ধুত্বেও নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচন ও সম্প্রসারণের পথে হাটছে সরকার।
অর্থনৈতিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক গুরুত্ব এবং একই সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক, ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবেই বিবেচিত হবে। যা আগামীর বাংলাদেশকে নিয়ে যাবে উদীয়মান আঞ্চলিক শক্তির নতুন পরিচয়ে। এমনটি আশাবাদ বিএনপি সরকারের। আশাবাদের পেছনে রয়েছে বিগত জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির প্রতি দুই-তৃতীয়াংশ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসমর্থনের শক্তিশালী জনভিত্তি।
দীর্ঘ ১৬ বছর ফ্যাসিবাদী লুটপাটে ভঙ্গুর অর্থনীতির নাজুক অবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে ট্রিলিয়ন ডলার পর্যায়ে দেশের অর্থনীতিকে উন্নীত করা সরকারের কঠিন চ্যালেঞ্জ। অথনৈতিক পুনর্গঠন ও সক্ষমতা অর্জনের অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার— বাংলাদেশের জন্য একটি সবল, টেকসই ও স্বনির্ভর অর্থনীতি। এর ভিত রচনায় উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা নিয়ে সরকার অগ্রসর হচ্ছে। উন্নয়ন-সমৃদ্ধি অর্জনে সরকারের যে রোডম্যাপ তার প্রধান স্তম্ভ হচ্ছে ‘পূর্বমুখী’ (লুকইস্ট) নীতি এবং কৌশল গ্রহণ। অর্থনীতিবিদ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞগণ ‘পূর্বমুখী’ দেশসমূহের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক, বন্ধুত্ব প্রসারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাদের অভিমত, ‘পূর্বমুখী’ সম্পর্ক জোরদারের মধ্যদিয়েই নিশ্চিত হবে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত সবল এবং স্বনির্ভর অর্থনীতি। এশিয়ায় বাংলাদেশের পূর্ব দিকেই আছে বিস্তর সম্ভাবনার হাতছানি।
সফল রাষ্ট্রনায়ক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে বিশেষ প্রাধান্য পায় ‘পূর্বমুখী’ নীতি-কৌশল। প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং খালেদা জিয়ার পদাংক বা রোডম্যাপ অনুসরণে সবল-স্বনির্ভর নতুন বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রা সূচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্যাসিবাদী হাসিনা আমলে বেপরোয়া অর্থ-সম্পদ লুটপাট, পাচার, আর্থিক খাতসমূহের চরম বিশৃঙ্খলায় তছনছ হয় দেশের অর্থনীতি। ভঙ্গুর অর্থনীতিকে খাদের কিনার থেকে টেনে তোলার নিরলস প্রচেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি সরকার।
এ অবস্থায় যুগের প্রয়োজনে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির বিশাল অবয়বে রূপান্তরের পথে চ্যালেঞ্জ ও বাধা-বিপত্তি অনেক। তাছাড়া সরকারের লক্ষ্য, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার আওতায় দেশে অন্তত ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান করা। এসব লক্ষ্য অর্জনের জন্য সরকারের হাতে কী এমন ম্যাজিক আলাদীনের চেরাগ? বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, যোগাযোগ ও উন্নয়ন কৌশলবিদ, ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিএনপি সরকারের এসব অর্থনৈতিক লক্ষ্য উচ্চাভিলাষী নয়। তবে লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ব্যাপক সহযোগিতা বিনিময় বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। অর্থাৎ বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ ও কর্মসংস্থানের দিগন্ত উন্মাচন এবং এর পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যে পার্টনারশিপ (আদান-প্রদান) বৃদ্ধির পথ সুগম করতে হবে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হলে পূর্ব দিকেই দৃষ্টি ফেরাতে হবে— একথা জানিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইস্ট ডেল্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর মুহাম্মদ সিকান্দার খান গতকাল দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, এর ফলে হ্রাস পাবে অতিমাত্রায় ভারত-নির্ভরতা। আমাদের পূর্বের দেশগুলো উন্নত। তাদের সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তরোত্তর সুসম্পর্ক ছাড়া ‘খারাপ’ বা ‘মন্দ’ হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। ভারত চায় ঘুরেফিরে একমুখী, একতরফা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। পরমুখাপেক্ষী রাখতে চায়। প্রতিবেশী কোনো দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো নয়।
তিনি বলেন, দেশের পণ্যের প্রধান রফতানি বাজার পশ্চিমা বিশ্বের অভিমুখে। কিন্তু শিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, কৃষিপণ্য সুলভে আমদানিতে পূর্বমুখী দেশগুলোর সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক বৃদ্ধির বিকল্প নেই। মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ডসহ পূর্ব দিকের দেশগুলোতে বাংলাদেশে উৎপাদিত পণ্য, সেবা এবং শ্রমশক্তি রফতানির সুযোগ আছে। সম্পর্ক যতই বাড়বে লাভবান হবে দেশ।
‘পূর্বমুখী’ নীতি প্রসঙ্গে অপর বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মইনুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, পূর্বমুখী নীতি কৌশল অনুসরণে লাভবান হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি। এর জন্য পূর্ব দিকের দেশগুলোর সঙ্গে কানেকটিভিটি এবং সম্পর্ক উন্নয়ন করা প্রয়োজন। তবে ভারতে বিজেপি যতদিন ক্ষমতায় আছে তারা পূর্বমুখী নীতির বিরুদ্ধেই থাকবে। করিডোর হলে বাংলাদেশ সুদূরপ্রসারী লাভবান হবে। করিডোরে বাংলাদেশ যুক্ত না হলে চীন ও মিয়ানমারের কোনো সমস্যা নেই; মহাসুযোগ হারাবে বাংলাদেশ। কেননা চীনা সহায়তায় মিয়ানমারের ওপর দিয়ে দ্বিদেশীয় করিডোরের কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। চীনের অর্থায়নে সম্প্রতি কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়েছে। এর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সহজেই প্রবেশ নিশ্চিত করে নিয়েছে চীন।
প্রেসিডেন্ট জিয়া ও খালেদা জিয়ার আমলে বাংলাদেশের ‘পূর্বমুখী’ অর্থনীতি, ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা এবং কূটনীতির ধারণার ভিত্তিতে নীতি-কৌশল গ্রহণ এবং বাস্তব রূপদান লক্ষ্য করা যায়। চট্টগ্রামে মহাসড়ক, রেলপথ, গভীর সমুদ্রবন্দর, কন্টেইনার পোর্ট, ইয়ার্ড, মেরিন ড্রাইভওয়ে, পর্যটন-বিনোদন কেন্দ্রের আধুনিকায়ন ইত্যাদি অবকাঠামো তৈরির মাধ্যমে ‘পূর্বমুখী’ যোগাযোগের পথ সুগম হয়। ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এবং বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। যা অর্থনীতি, কূটনীতি এমনকি ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব বহন করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট জিয়া, খালেদা জিয়ার ধারাবাহিকতায় তারেক রহমান সরকারের ‘পূর্বমুখী’ নীতি কৌশল বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে— চীন থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশে সরাসরি সংযোগকারী (কানেকটিভিটি) করিডোর বা রুট বাস্তবায়নের মাধ্যমে। খুলে যাবে সমৃদ্ধির স্বর্ণদুয়ার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়। গত ২৬ জুন অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বৈঠকে বাংলাদেশের সামনে শি জিংপিং-এর করিডোর প্রস্তাব এবং এর সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরা হয়। বহুমাত্রিক সমৃদ্ধি অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সামনে এটি মহাসুযোগ; যা বারবার আসেনা।
পূর্ব দিকের দেশগুলোর সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতির বিস্ময়কর উত্থানের নজির ভিয়েতনাম। নিকট অতীতে দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, চীনসহ বিভিন্ন এশীয় দেশ পূর্ব দিকের প্রতিবেশীদের পারস্পরিক সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে অদম্য উন্নতির শীর্ষে উঠে যাচ্ছে।
গত দেড় দশকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নতি হয়েছে। যদিও বর্তমানে প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভওয়ের বড় অংশ সম্পন্ন হয়েছে। চীনের সহায়তায় কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ডাবল গেজ রেলপথে যোগাযোগ সুবিধা এবং ঝিনুকের আদলে দৃষ্টিনন্দন কক্সবাজার আইকনিক ও সুপরিসর রেলস্টেশন নির্মিত হয়েছে। উখিয়ার ঘুনধুম দিয়ে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত রেলপথ বিস্তৃত করার অবকাঠামো প্রস্তুত রয়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ছয় লেইনে উন্নীত করার প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানে ঢেলে সাজানো হয়েছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকাজে অগ্রগতি হয়েছে। যা মিয়ানমার-চীনসহ পূর্বমুখী বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক ‘হাব পোট’ এবং আগামীতে গেম চেঞ্জারের ভূমিকা রাখবে। এসব অবকাঠামো যুগোপযোগী করে ঢেলে সাজিয়ে পূর্বমুখী যোগাযোগ উন্মুক্ত করা সময়ের দাবি।
‘পূর্বমুখী’ নীতি মানে ‘পশ্চিমা বিশ্ব’কে বাদ দিয়ে শুধু পূর্ব দিকেই সম্পর্কের পাল্লা ভারী করা নয়। বরং বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, আমদানি-রফতানি, কর্মসংস্থানসহ দেশের অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তা কৌশলগত স্বার্থে পূর্ব এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনৈতিক শক্তিধর দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব প্রদান। পূর্বমুখী বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলো হচ্ছে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, লাওস ও ব্রুনেই। এসব দেশে বাংলাদেশের বাজার সম্ভাবনাময় সেক্টর হচ্ছে- জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান, আহরণ ও উত্তোলন, কৃষি-খামার শিল্পের আধুনিকায়ন, সৌরবিদ্যুৎ ও টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পোশাক, ওষুধ, চামড়া, খাদ্য ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, কৃষিপণ্য, আইটি, প্রযুক্তি, কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও নার্সিং, পর্যটন, জাহাজনির্মাণ ও মেরামত শিল্প, সামুদ্রিক অর্থনীতি (ব্লু-ইকোনমি), লজিস্টিকস ইত্যাদি।
বিশিষ্ট যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ বুয়েট-এর প্রফেসর ড. মো. সামছুল হক ইনকিলাবকে বলেন, চীনসহ ‘পূর্বমুখী’ যোাগাযোগ অবকাঠামো সম্প্রসারণ, করিডোর প্রতিষ্ঠা এবং পরস্পর সহযোগিতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ভূ-কৌশলগত শক্তি অর্জনে সক্ষম হবে। জ্বালানি খাতের উন্নয়নসহ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ-শিল্পায়ন প্রসারের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি ও প্রতিরক্ষা কৌশলগত সক্ষমতায় বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে প্রত্যাশিত জোরালো অবস্থানে। বিশ্বসভায় আসীন হবে গুরুত্ব ও মর্যাদার আসনে।