মাটি নেই, বছরের বেশির ভাগ সময় জমি ডুবে থাকে পানিতে। অথচ সেই পানির ওপরই তৈরি হচ্ছে ভাসমান ক্ষেত, সেখানে ফলছে নানা ধরনের সবজি ও তৈরি হচ্ছে চারা। কচুরিপানা, শ্যাওলা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ দিয়ে তৈরি ভাসমান ধাপেই চলছে কৃষিকাজ। বরিশালের বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়া উপজেলার কয়েকটি গ্রামের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে অনুসরণ করছেন কৃষির এই অনন্য পদ্ধতি। স্থানীয়দের দাবি, বানারীপাড়ার বিশারকান্দি ইউনিয়নের উমারের পাড় গ্রামে এই ভাসমান চাষাবাদের ইতিহাস দুই শত বছরেরও বেশি পুরোনো।
ভাসমান ধাপের ওপর বেগুন, পেঁপে, লাউ, শিম, কুমড়া, টমেটো, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁচা ও বোম্বাই মরিচ, করলা, শসা ও বরবটিসহ বিভিন্ন সবজি এবং নানা ধরনের চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। দীর্ঘদিনের চর্চায় এই পদ্ধতি এখন স্থানীয় কৃষকদের কাছে অনেকটাই সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
কচুরিপানায় তৈরি ভাসমান ক্ষেত
উমারের পাড় গ্রামের কৃষক সাইফুল হাওলাদার জানান, কচুরিপানা, শ্যাওলা ও দুলালীলতা স্তরে স্তরে সাজিয়ে প্রায় দুই ফুট পুরু ভাসমান ধাপ বা বীজতলা তৈরি করা হয়। প্রতিটি ধাপের দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ৬০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় দেড় মিটার।
বরিশালে ভাসমান কৃষি
তবে এসব ধাপে সরাসরি বীজ বপন করা যায় না। এ জন্য কৃষকেরা তৈরি করেন বিশেষ ধরনের আধার, স্থানীয়ভাবে যার নাম ‘দৌল্লা’। ছোট কচুরিপানা ও দুলালীলতার সঙ্গে নারকেলের ছোবড়ার গুঁড়া ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এই দৌল্লা। এর মধ্যে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে কয়েক দিন শুকনো জায়গায় রাখা হয়।
তিন থেকে সাত দিন পর দৌল্লাগুলো ভাসমান ধাপে সারিবদ্ধভাবে বসানো হয়। এরপর পাঁচ-ছয় দিন পরপর ধাপের নিচের কচুরিপানার মূল ও শ্যাওলা তুলে দৌল্লার গোড়ায় দেওয়া হয়। একটি অঙ্কুরিত বীজ ধাপে বসানোর ২০ থেকে ২২ দিনের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ চারা হয়ে ওঠে। ধাপ তৈরির পর বীজতলায় চারা রোপণ ও পরিচর্যার কাজ মূলত পুরুষেরা করলেও দৌল্লা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন নারীরা। একটি ৫০ থেকে ৬০ মিটার দীর্ঘ ধাপ তৈরিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান কৃষকরা।
একই ধাপে বারবার চাষ
কৃষকরা জানান, একটি ভাসমান ধাপে একাধিকবার চাষ করা যায়। পানি থাকা অবস্থায় দীর্ঘদিন ধাপটি কার্যকর থাকে। একটি চাষ শেষ হওয়ার পর ধাপে আবার কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ যোগ করলে সেটি পুনরায় ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। তবে পানি শুকিয়ে গেলে এই ধাপের আর কোনও কার্যকারিতা থাকে না।
কাজে ব্যস্ত এক কৃষক
ভাসমান ধাপে উৎপাদিত সবজি ও চারা বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন জেলা শহর ছাড়াও পিরোজপুর, খুলনা, বাগেরহাট ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যায়। স্থানীয় পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এসব পণ্য কিনে নিয়ে যান। কৃষকেরা বলছেন, এ পদ্ধতিতে আশাতীত লাভ না হলেও বছরের বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকা জমি কাজে লাগিয়ে যে আয় হয়, তা দিয়ে ভালোভাবেই সংসার চালানো সম্ভব।
জলজ উদ্ভিদেরও ভাসমান হাট
ভাসমান ধাপ তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ কচুরিপানা ও বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ। এসব উপকরণও এখন স্থানীয়ভাবে কেনাবেচা হয়। কচুরিপানা, দুলালী বন, শ্যাওলা, ফ্যানা ঘাসসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ সংগ্রহ করে নৌকায় করে ধাপে কর্মরত কৃষকদের কাছে নিয়ে যান বিক্রেতারা। প্রয়োজন অনুযায়ী কৃষকেরা সেগুলো কিনে নেন। এ কারণে বিশারকান্দির খালে প্রতিদিন ভোরে বসে জলজ উদ্ভিদের এক ধরনের ভাসমান হাট।
দুই শত বছরের ঐতিহ্য
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, জন্মের পর থেকেই তাঁরা এই ভাসমান চাষাবাদ দেখে আসছেন। পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে পাওয়া জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই এখনও একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করছেন তাঁরা।
এ কাজে পরিবারের প্রায় সবাই কোনও না কোনোভাবে যুক্ত। বিশেষ করে নারীরা ভাসমান ধাপ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
চারা প্রস্তুতে ব্যস্ত কৃষাণী ও কৃষকরা
তবে কৃষকেরা অভিযোগ করেন, ভাসমান চাষাবাদের জন্য তারা কৃষি বিভাগের কাছ থেকে তেমন কোনও সহায়তা পান না। বরং কৃষি কর্মকর্তারা এসে তাদের কাছ থেকে এই পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে চান।
বানারীপাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাসনাইন জানান, বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদ হচ্ছে। তবে এ পদ্ধতির সঙ্গে কত পরিবার যুক্ত, সে বিষয়ে তাঁর কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
আগৈলঝাড়াতেও বাড়ছে ভাসমান কৃষি
একইভাবে আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের বাশাইল ও আহুতি-বাটরা গ্রামেও ভাসমান ধাপে চারা উৎপাদন ও চাষাবাদ হচ্ছে।
আগৈলঝাড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা জানান, উপজেলায় বর্তমানে প্রায় ২০০ হেক্টর ভাসমান বেডে চাষাবাদ হচ্ছে। এর সঙ্গে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার যুক্ত।
তিনি বলেন, এসব ভাসমান বেডে বাণিজ্যিকভাবে লাউ, শিম, বেগুন, ফুলকপি, ওলকপি, বরবটি, করলা, পুঁইশাক, মিষ্টি কুমড়া, ধনেপাতা, ডাঁটা, টমেটো, আদা, হলুদ, পেঁপে ও মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের চারা উৎপাদন হচ্ছে। এতে কৃষকদের আর্থিক সচ্ছলতা এসেছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত চারা ও সবজি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হচ্ছে।
অনাবাদি জমি এখন আয়ের উৎস
কৃষি কর্মকর্তা সুনীতি কুমার সাহা বলেন, আগে নিম্নাঞ্চলের কৃষকেরা বছরে একবার চাষাবাদ করতে পারতেন। বাকি সময় জমি পানিতে ডুবে থাকায় তা অনাবাদি পড়ে থাকতো। বোরো ধান কাটার পর বর্ষায় মাঠের পর মাঠ পানিতে তলিয়ে যেত। বদ্ধপানিতে জমি ভরে উঠতো আগাছা ও কচুরিপানায়।
এই অবস্থায় কৃষকেরা হাত গুটিয়ে না থেকে পানির ওপর গাছের চারা ও ফসল উৎপাদনের পথ বের করেছেন। ফলে যে জমি বছরের একটি বড় সময় কোনও কাজে আসতো না, সেই পানিকে কাজে লাগিয়েই এখন আয় করছেন তারা।
ভাসমান শস্যক্ষেত
বানারীপাড়া ও আগৈলঝাড়ার কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বরিশালের পাশাপাশি পিরোজপুরেও এ ধরনের ভাসমান চাষাবাদ হচ্ছে। ধীরে ধীরে বছরের বেশির ভাগ সময় পানিতে ডুবে থাকে, এমন অন্যান্য এলাকায়ও এই পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়ছে।
তাদের ভাষ্যমতে, ভাসমান পদ্ধতিতে চাষাবাদে কৃষকেরা যেমন উপকৃত হচ্ছেন, তেমনি পানিতে ডুবে থাকা অনাবাদি জমিকেও উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে। কৃষি বিভাগও বিভিন্ন এলাকায় এ পদ্ধতি সম্প্রসারণে কৃষকদের উৎসাহিত করছে।
পানির ওপর কৃষির নতুন সম্ভাবনা
বরিশালের ভাসমান কৃষি শুধু জমির বিকল্প হিসেবে কাজ করছে না, এটি স্থানীয় কৃষকদের শত বছরের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এক অনন্য উদাহরণ। পানিতে ডুবে থাকা জমিকে কাজে লাগিয়ে সবজি ও চারা উৎপাদনের এই পদ্ধতি একদিকে যেমন কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে জলাবদ্ধ ও নি¤œাঞ্চলে কৃষির নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
বিশেষ করে জলাবদ্ধ এলাকার কৃষকদের জন্য বরিশালের এই ভাসমান কৃষি হতে পারে মাটি ছাড়াই ফসল উৎপাদনের এক কার্যকর মডেল।